ভোর রাতে ঠান্ডার মাত্রাটা বাড়ে। তাকে ধরে থাকা হাতটা ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে আসছে, মৃতা নারীর হাতের মতো কিংবা মৃত্যুর খুব কাছাকাছি এসে যাওয়া কোনো নারীর হাতের মতো।
.বহুক্ষণ আগেই থিয়েটার হল থেকে চিরো বেরিয়ে যেত, যদি না স্টেজে চিত্রা থাকত। যখনই চিত্রা চোখের সামনে এসেছে সে উত্তেজনা বোধ করেছে। ওর হাঁটা, বসা, ঘুরে দাঁড়ানো, হাত নাড়া প্রতিটি ভঙ্গিতে সে মাদকতা পাচ্ছিল। চিত্রার কণ্ঠস্বরের অনুরণনে, তার স্নায়ুকোষগুলি ভরে আছে। যখন স্টেজে চিত্রার ভূমিকা থাকে না, চোখ বন্ধ করে একটু আগে দেখা চিত্রা এবং তার অভিনয়কে মনের মধ্যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। কী নাটক অভিনীত হচ্ছে তা সে জানে না, জানার ইচ্ছাও নেই। চিৎকার করে অভিনয় হচ্ছে, ব্যতিক্রম শুধু চিত্রা। প্রগতিশীল বিষয়। বাবার অসুখ, দুর্ঘটনায় পঙ্গু ভাই, মাতাল স্বামী-দেখতে দেখতে বিরক্তিতে ভরে গেছে চিরো। পরিবারের অবিবাহিতা মেয়ে চিত্রা। ওকে কুড়ি বছরের একদিনও বেশি মনে হচ্ছে না, মুখেও তাজা সারল্য।
নাটকটি কীভাবে শেষ হবে, মাঝামাঝি সময় থেকেই চিরো সেটা বুঝে গেছে। অবশেষে সেইভাবেই সমাপ্তি ঘটল। সংসারের দুর্দশা ঘোচাতে, অর্থাৎ ভাইয়ের চাকরি, বাবার চিকিৎসা ইত্যাদির জন্য চিত্রাকে দেহ দিতে হল বৃদ্ধ ধনী ভিলেনকে।
নাটক শেষ হবার মিনিট পাঁচেক পর সিগারেটটা জুতোয় পিষে, চিরো এগোল গ্রিনরুমে যাবার জন্য। দরজায় আটকাল একজন।
”চিত্রা ঘটকের সঙ্গে দেখা করব।”
”দাঁড়ান, খবর দি! কী নাম বলব?”
চিরো ইতস্তত করে বলল, ‘বলুন, অরো দেখা করতে চায়।’
দু মিনিটের মধ্যে চিত্রাই বেরিয়ে এল ব্যস্তভাবে।
‘ওমমা, আপনি।’
‘অবাক করে দেব বলে, অরোর নামটা করেছি।’
‘সত্যিই অবাক হয়েছি। অরো কখনো আমার অভিনয় দেখতে তো আসে না।’
‘তাহলে দুটো অবাক পেলেন। দ্বিতীয়টা, আমায় দেখে।’
চিত্রা মাথা হেলাল।
‘আপনার তো এখনকার পাট চুকে গেল, চলুন পৌঁছে দিয়ে আসি।’
‘রঙচঙ তুলি আগে।’
‘কিছু তোলার নেই। একদম ন্যাচারাল মেক-আপ। তাড়াতাড়ি করুন, ভীষণ খিদে পেয়ে গেছে। আগে কোথাও গিয়ে কিছু খেয়ে নিতে হবে।’
চিত্রার বাড়ি দমদমে শ্রীপুর কলোনিতে, এ তথ্য অরোর কাছ থেকেই কথায় কথায় চিরো জেনে নিয়েছে। ঔৎসুক্য না দেখিয়ে সে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘চিত্রা থাকে কোথায়?’
‘দমদম, শ্রীপুর নামে একটা কলোনিতে। চমৎকার জায়গাটা। ছোট্ট দোতলা বাড়ি, ওর বাবাই করে গেছেন।’
‘বাবা নেই?’
‘বছর দশেক আগে মারা গেছেন, ক্যানসারে।’
‘আচ্ছা ভি আই পি রোড দিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে যেতে একটা সাইনপোস্ট দেখেছি বাঁদিকে, সেটাই কি?’
অরোর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। চিত্রার কলোনির সাইনপোস্ট চিরো যে দেখেছে, এতেই ওর সুখ। বেচারা বোকা অরো। এত সহজে ওকে ধোঁকা দেওয়া যায়।
মুখের মেক-আপ তুলে চিত্রা বেরিয়ে এল। চিরো তার গাড়ির সামনের দরজা খুলে ধরতেই চিত্রা হেসে বলল, ‘আপনি আসবেন জানলে টিকিট পাঠিয়ে দিতাম।’
‘জানিয়ে এলে, এত ভালো অভিনয় করতে পারতেন না।’
‘ভালো করেছি নাকি?’
দরজা বন্ধ করে ঘুরে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে স্টার্ট দেবার আগে চিরো বলল, ‘এবার থেকে, যেখানে আপনার অভিনয় থাকবে দেখতে যাব।’ কথাটা বলে তার মনে হল একবিন্দুও বাড়িয়ে সে বলেনি।
পার্কস্ট্রিটে ছিমছাম ছোট্ট ‘ব্লু মুন’-এ ওরা মুখোমুখি বসল। এখানে মদ পাওয়া যায় না। চিরো সেজন্যেই জায়গাটা বেছেছে। মদ এবং চরিত্রহীনতাকে মেয়েরা খুব কাছাকাছি ব্যাপার মনে করে। চিত্রার দৃষ্টি থেকে মদ যতটা দূরে সরিয়ে রাখা যায় ততই ভালো। চিরোর সম্পর্কে ধারণা গড়ে তোলার সময় অন্তত চরিত্রহীন শব্দটা ওর মনে আসবে না। যথেষ্ট ভেবেচিন্তেই চিরো ফন্দি এঁটেছে। চিত্রাকে তার ভালো লেগেছে। ইউরোপ ঘুরে আসা ছাপাখানা ব্যবসায়ী, কিছুটা উন্নাসিক চিরো নিজেই অবাক হয়ে যায়, একবার দেখাতেই কেন সে ওর প্রেমে পড়ল।
লোকেদের উপর চিত্রা সম্পর্কে যেসব প্রতিক্রিয়া হয়, চিরোর ধারণা, তার একটি হল-হয় সে মনে কোনো ছাপই ফেলে না, অথবা একটি সাক্ষাতেই এমন করে দিতে পারে যার ফলে অন্য কিছু আর ভাবা যায় না। চিত্রা ছাড়া এই কদিন চিরো আর কিছু ভাবেনি। অবশেষে সে স্থির করেছে, যেভাবেই হোক ওকে সে বিয়ে করবেই। চিরোকে তার মস্তিষ্ক জানিয়ে দিয়েছে, চিত্রা নবীনা নয়; কালিদাসের কোনো নায়িকাকেই সে রূপে হারাতে পারবে না, এমনকি অসাধারণ রসবোধেরও অধিকারিণী নয়। কিন্তু তার ইন্দ্রিয় জানিয়েছে, এ পর্যন্ত যত রমণীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে তার মধ্যে একমাত্র চিরোকেই সে মনেপ্রাণে বিয়ে করতে চাইল, অযৌক্তিক হাস্যকর মনে হলেও। সে জানে এজন্য অরোর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটবেই। পরিষ্কার বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাপার হবে। এবং চিরো তাতেও প্রস্তুত।
খাদ্য নির্বাচন নিয়ে ওরা ছেলেমানুষি করল না। চিরোই বলল, ‘চীনে খাবারই বলি। যতই খান, শরীরকে গোলমালে ফেলে না, দিব্যি হজম হয়। তাছাড়া কম খরচে অনেকটা পাওয়া যায়।’
সে ভেবেই রেখেছিল। চীনা খাবার রান্নাঘর থেকে টেবিলে আসতে অনেক সময় নেয় তাতে কিছুটা বাড়তি সঙ্গ সে পাবে। কম খরচের কথাটা ইচ্ছা করেই বলেছে। উড়নচণ্ডেকে মেয়েরা স্বামী হিসাবে পছন্দ করে না। বড়োমানুষি দেখালে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মেয়েরা কুঁকড়ে যায়। সিরিয়াস, হিসেবি লোকের মতো তাকে কথা বলতে হবে। নিজের সম্পর্কে বেশি কথা বলা বোকামি। অনেক লোক মেয়েদের মনে দাগ কাটার জন্য নিজেদের কথাই জাঁকিয়ে বলে। মেয়েদের কিছুক্ষণ ভালো লাগে শুনতে, তারপর ব্যাজার হয়।
