সারা ফ্ল্যাট বাড়িটা নিঝুম। মতি শুয়ে পড়েছে। অত্যন্ত ঘুমকাতুরে। অরবিন্দ খিদে বোধ করল আবার। রেফ্রিজারেটারে এক থালা ভাজা মাছ থেকে চারটে টুকরো তুলে নিয়ে সে বসার ঘরে এল। দিনেন চক্রবর্তীর পুকুরের মাছ। অবিবাহিত, ছ’ফুট দুই, দশাসই, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা-হইচই-য়ে লোক। বয়স মধ্য চল্লিশে। দুটো সিনেমা হল, গোটা পাঁচেক ট্রাক আর বাসের মালিক। বছরে একবার শিকারে বেরোত বিহারে বা ওড়িশায়। চিতার থাবায় বাঁ কাঁধ বরাবরের জন্য জখম হবার পর পশু শিকারের বদলে শুরু করেছে মাছ শিকার। কলকাতা ছেড়ে বারুইপুরে নন্দার বাগানের পাশেই বাড়ি আর পুকুর কিনে, এক জোড়া কুকুর নিয়ে বছর চারেক বসবাস করছে। লোকটিকে অরবিন্দের ভালো লাগে। সরল, জান্তব এবং বাসনায় আসক্ত শিশুর মতো। তারা ওখানে গেলেই দিনেন তাদের বাড়িতে হাজির হয়। নন্দা মাঝে মাঝে দিনেনের হুইল নিয়ে মাছ ধরতে বসে।
আঙুলে লাগা তেল চুলে মুছে নিয়ে জামা খুলে, প্যান্টের বেল্ট আলগা করতে করতে অরবিন্দর মনে এল, হিপ পকেটে মোড়কটা রয়েছে। বিব্রত বোধ করল। দু’আঙুলে ধরে সেটি বার করে তাকিয়ে রইল। ভাবল, যা লেখা রয়েছে তা কি সত্যি? করোনারি থ্রম্বসিস বলেই কি মনে হবে? কিন্তু এটার তো আর দরকার হবে না, নন্দাকে ছেড়ে সে চলে যাবেই। যেখানে সেখানে ফেলে দেওয়া ঠিক নয়, দুর্ঘটনা ঘটতে পারে ভেবে সে টেবিল থেকে স্ক্রিপ্টের খাতাটা তুলে সন্তর্পণে তার মধ্যে মোড়কটা রাখল।
শোবার ঘরটা অন্ধকার। মৃদু বেড লাইট জ্বালাবার আগে সে প্যান্ট ছেড়ে পাজামা পরে নিল। নন্দা উপুড় হয়ে দু-হাতে বালিশ জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে, যেভাবে সাঁতার না জানা মানুষ জলে কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে। গায়ের পাতলা চাদরটা হাঁটু পর্যন্ত উঠে রয়েছে। বিছানার ধারে ছোট্ট টেবিলটার উপর একটা চকোলেট, তার নিচে একটা কাগজ।
অরবিন্দ ঝুঁকে দেখল নন্দার হাতের লেখায় : ‘অরো, চকোলেটটা খেয়ো আর চিঠিটা পড়ো।’
অরবিন্দ চকোলেট মুখে পুরে চিঠি হাতে খাটে বসল। গদিটা একটু বসে যাওয়াতেই বোধহয় নন্দা নড়ে উঠে বিড়বিড় করে কী বলল।
অরবিন্দ মৃদুস্বরে বলল, ‘আমি অরো।’
নন্দা পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। চিঠিটা পড়তে শুরু করল অরবিন্দ :
অরো,
এখন ফাল্গুন মাস। আমাদের বিয়ের আর একটা বছর শেষ হবে। আর একটা বছর শুরু হবে। কী এনে দেবে আগামী বছর আমার জন্য? তোমার জন্য আমি আনব ভালোবাসা। তুমি কখনো বলোনি, কিন্তু আমি জানি যে ভালোবাসা তুমি অন্তর থেকে চাও আমি তা দিতে পারিনি। আমি চেষ্টা করি, অরো, আমি চেষ্টা করি। আমি সুখী, এই কথাটাই তোমাকে শুধু জানাতে চাই। কাল তোমার জন্য মাছের মুড়ো দিয়ে দুটো রান্না করব।
তোমার নন্দা
.চিঠিটা ভাঁজ করে পুরিয়ার আকার হতে সে খাটের নিচে ছুঁড়ে দিয়ে ভাবল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কোথাও যেতেই হবে। নয়তো দুর্বল হয়ে পড়ব।
আলো নিভিয়ে সন্তর্পণে নন্দার পাশে শুয়ে অরবিন্দ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। নন্দার ঘুম আবার ব্যাহত হল। ঘুমঘোরেই সে চাদরের মধ্য থেকে হাত বাড়িয়ে খুঁজতে লাগল অরবিন্দের হাত। অবশেষে কনুইটি পেয়ে, যেন তাই যথেষ্ট এমনভাবে আঁকড়ে ধরল এবং ঘুমিয়ে পড়ল।
অরবিন্দ শক্ত নিথর হয়ে শুয়ে। সেই পুরনো ভয়, যন্ত্রণা, এলোমেলোভাবে তাকে চেপে ধরেছে। একটু পরেই ভয় ও যন্ত্রণাটা মিলিয়ে গেল, রইল শুধু এলোমেলো বোধ। সেটা ক্রমশ মাথার মধ্যে জমাট বেঁধে একটা মার্বেলের মতো গড়াতে শুরু করল। সে চাইছে ওটা গড়াতে থাকুক। যতক্ষণ এলোমেলো থাকবে তার চিন্তা, ততক্ষণ সে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সিদ্ধান্তে না এলে কোনো কাজেও হাত দিতে পারবে না। এবং কাজে না নামলেই নিরাপদে থাকা যাবে।
কিন্তু মানসিক এলোমেলো ব্যাপারটাও এক সময় মিলিয়ে গেল, অরবিন্দ অবশ্য জানত মিলিয়ে যাবেই।
অবশেষে রূঢ় সত্যের মুখোমুখি তাকে হতে হল। নন্দা ঘুমের ভান করে তার বাহু ধরেনি। সত্যিই সে ঘুমিয়ে আছে। তার মনের চারভাগের তিনভাগ অন্তত ঘুমে মগ্ন! নিছকই সহজাত ক্রিয়াবশে নন্দা একটা করেছে। হাতড়ে হাতড়ে সে যেভাবে খুঁজে নিয়ে কনুই আঁকড়ে ধরল, তাতেই পুলিশের সঙ্গে যা কিছু কাল্পনিক যুক্তিতর্ক ফেঁদেছিল, সব অরবিন্দর মন থেকে মুছে গেল।
আগে যেখানে ছিল, তার থেকেও ভয়ঙ্কর জায়গায় সে এখন হাজির হয়েছে। আর কোনো পথ নেই। নন্দার এই হাতটাকে অনেক অনেক দূরে, ধরাছোঁয়ার বাইরে পাঠাতেই হবে। এই হাতটা ফিসফিস করে বলে যাচ্ছে-চাই, তোমাকে চাই। অরো, তুমি আমাকে যতটা কঠিন, স্বনির্ভর ভাবো আমি কিন্তু তা নই। যেমন ভাবে ভালোবাসা চাও, হয়তো সেভাবে বাসতে পারি না, কিন্তু তোমাকেই আমি চাই। তুমি যখন ফিরে আসো আমি মনে মনে ভীষণ খুশি হই। একা থাকতে আমার একটুও ভালো লাগে না। একা থাকলেই আমি কীরকম ভীতু হয়ে যাই, অসুখী বোধ করি। অরো, তুমি আমার কাছে ফিরো, আমার কাছেই থেকো। আমি যথাসাধ্য করব। আমাকে ছেড়ো না। তাহলে নিজেকে নিঃসঙ্গ বোধ করব, মনের মধ্যে শীত বাসা বাঁধবে।
অরবিন্দ কাঠের মতো শুয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে। নন্দার মুঠোয় ধরা তার হাত। সে তখন ব্যর্থ যুদ্ধটা চালিয়ে যাচ্ছে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়া মমতার সঙ্গে। একবার সে গুটিগুটি চেষ্টা করে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে। ঘুমের মধ্যেই বুঝতে পেরে নন্দা আরও জোরে আঁকড়ে ধরে। অরবিন্দ হাতটা একইভাবে রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে রইল। তখন তার মনের মধ্যে ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠতে লাগল একটি সিদ্ধান্ত, কাজটা এবার করতেই হবে।
