‘বাসটাস তো ওই দিয়েই যায়।’
‘আচ্ছা ভাই।’
ক্লাচ চেপে অরবিন্দ প্রথম গিয়ার দিল। কথা বলার আর কিছু নেই। শ্যামবাজারের দিকে যেতে যেতে সে এখন নিজেকে ঝরঝরে বোধ করছে। পুলিশটার সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করতে পারলে হয়তো ব্যাপারটাকে একটা জায়গায় দাঁড় করানো যেত। লোকটার গর্তে ঢোকা চোখ, তোবড়ান গাল, কর্কশ গলা, কুঁজো পিঠ দেখে মনে হয় কট্টর বাস্তববাদী। কাল্পনিক কথাবার্তার ধার ধারে না।
অরবিন্দ কথা বলতে শুরু করল পুলিশটির সঙ্গে।
‘না স্যার, বনিবনা না হলে বউকে খুন করাটা উচিত হবে না। ওসবে দরকার কী, শিক্ষিত অবস্থাপন্ন আপনি, আপনার বউও, বললেন, লেখাপড়া জানে, বাপের অনেক পয়সাও পেয়েছে। ডাইভোর্স করলেই তো ল্যাটা চুকে যায়। আজকাল তো শিক্ষিত লোকেরা এটা খুব করছে। আপনি বিয়ে করে নেবেন, বউও বিয়ে করে নেবে কিংবা চাকরি-বাকরি করবে। কিন্তু খুনের কোনো রেহাই নেই, ফাঁসি ছাড়া কোনো সাজা নেই।’
কিন্তু ওর লজ্জা ওর যন্ত্রণা থেকে আমি ওকে বাঁচাতে চাই। যে কটা দিন বাঁচত, নয় তার থেকে কটা বছর কমে যাবে, তাতে কিছু কি এসে যায়? অনন্ত সময়ের সমুদ্রে একটা জীবনকাল তো বুদ্বুদমাত্র।’
‘স্যার, অনন্ত সময় কী জিনিস তা আমি জানি না, কিন্তু খুন জিনিসটা জানি।’
‘কিন্তু এই খুনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে করুণার প্রশ্ন।’
পুলিশটি তখন সিগারেটে মস্ত টান নিয়ে ফুক-ফুক ধোঁয়া ছেড়ে বলবে, ‘খুন খুনই, আপনি তার যে নামই দিন।’
‘নিকুচি করেছে। নন্দা রক্তে-মাংসে গড়া, আশা নিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে দিন কাটায়। আমি সেই আশারই একটা অংশ, কী করে আমরা দুজন তাহলে রেহাই পাব?’
পুলিশটি অবাক হয়ে তাকাবে। তারপর বলবে, ‘আপনার কথা শুনে মনে হয়েছে, আপনার বউ যুবতী, দেখতে শুনতেও ভালো। পৃথিবীতে আরও অনেক লোক আছে যাকে তার পছন্দ হতে পারে। তাহলে খুন করার দরকারটা কী? একদমই দরকার নেই।’
‘আমাকে ছাড়াই তাহলে ওর দিব্যি চলে যাবে?’
‘খুবই আঘাত পাবেন। এসব ক্ষেত্রে মেয়েলোকদের অহঙ্কারে ঘা লাগে। ওরা স্যার, বড়ো অহঙ্কারী হয়।’
‘তাহলেও, শেষপর্যন্ত আমাকে ছাড়াই ওর চলে যাবে?’
‘তাই তো মনে হয়। আপনি যদি কথাটা পাড়তে পারেন স্যার, তাহলে মনে হয় না উনি বাধা দেবেন।’
শ্যামবাজার মোড়ে পৌঁছবার আগেই অরবিন্দ মনস্থির করে ফেলল। ব্যাপারটা নিয়ে সে বাড়াবাড়ি করে ফেলছে। নিজেকে হাস্যকর এবং আধাপাগলামির পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে গলাটা ফাঁসির দড়িতে পরিয়েই ফেলেছিল প্রায়। অথচ খুবই সহজে ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলা যায়। নন্দাকে ছেড়ে সে কোথাও একটা ঘর নিয়ে থাকবে, তারপর দুজনে একমত হয়ে একবছর পর ডিভোর্স। চিত্রাকে নিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করা। তারা দুজনে। শুধুই দুজনে চিরকালের জন্য। চিত্রার থেকে নন্দা অনেক শক্ত মেয়ে। আঘাত অবশ্য পাবে, কিন্তু কী আর করা যাবে। আবার ঠিক দাঁড়িয়ে যাবে, এখানকার থেকে হয়তো আরো সুখী জীবন পাবে। অরবিন্দ ভাবতে ভাবতে শিউরে উঠে আপনমনে বলল, অথচ বোকামি করে কিনা ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে যাচ্ছিলাম।
গাড়ি যখন তার ফ্ল্যাট বাড়ির দরজায় পৌঁছল, অরবিন্দ তখন ঠিক করে ফেলেছে, যা করার চটপট করতে হবে। দেরি করলে আর সে পারবে না।
.দরজা খুলে দিল মতি।
‘দিদি ফিরে এসেছে। ঘুমোচ্ছে।’
‘কখন?’
‘সন্ধের পর। দিনেনবাবু গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেলেন।’
‘কিছু আছে খাবার মতো?’
বিব্রত মুখে মতি বলল, ‘দু-তিনটে কলা আছে।’
‘থাক। শুয়ে পড়।’
‘মাছ ভাজা আছে। দিনেনবাবু প্রায় তিন কেজি একটা রুই ধরে দিদিকে দিয়েছেন।’
‘থাক।’
অরবিন্দ বসার ঘরে বসে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল। ছাই ফেলার জন্য অভ্যাসবশে অ্যাশট্রের দিকে এগিয়ে যেতে গিয়ে দেয়ালে, তার এবং নন্দার ছবিটায় চোখ পড়ল। পুরীতে সমুদ্রের ধারে এক বন্ধু তুলে দিয়েছিল। বুককেসের ওপর ঢোকরাদের তৈরি একটা হাতি, তার পিঠে শিব-দুর্গা, কার্তিক-গণেশ। বাঁকুড়ায় বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে নন্দা কিনে আনে। তার পাশে ফ্রক পরা নন্দার একটি ছবি।
জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অরবিন্দ চেষ্টা করল, স্মৃতির মধ্যে ডুব দিয়ে আবেগভরা দু-একটা রত্ন তুলে আনতে। কিন্তু একটিও উঠল না। সবই হারিয়ে গেছে। এক দম্পতি, একটা পেতল-কাঁসার হাতি, এক সুশ্রী বালিকা মাত্র তা চোখে পড়ল।
আবার সে জানালার ধারে দাঁড়াল। কোথাও একটা আস্তানা ঠিক করতে হবে, অরবিন্দ জানালা দিয়ে সিগারেটটা রাস্তায় ফেলে ভাবল, দু-চারদিনের মধ্যেই। হস্টেল, বোর্ডিং মেস যেখানে হোক, অল্প খরচের। তারপর একটা চিঠি নন্দাকে পাঠিয়ে দেওয়া। তাতে সব কিছু বুঝিয়ে লিখবে, নন্দাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দেবে। অবশ্য প্রশংসা করলে অযথা মিথ্যা হবে না। নিজের ঘাড়ে সে সব দোষ চাপাবে, নিজের গায়ে কাদা মাখাবে, নিজের দুর্বলতাকে দায়ী করবে।
কোনোরকম সমালোচনা থাকবেন না, যত ঝগড়া হয়েছে তার উল্লেখও নয়। অনুযোগ, অভিযোগ, হতাশাও নয়। নন্দাও খানিকটা এজন্য দায়ী যেহেতু সে হৃদয়ের বশবর্তী হয়ে বিয়ে করেনি, এসবেরও কোনো ইঙ্গিত থাকবে না।
চিঠিটা পাঠিয়ে দিয়ে আর সে ফিরবে না। অরবিন্দ নিজেকে ভালোভাবেই জানে। ফিরে এলেই সে দুর্বল হয়ে যাবে। যদি নন্দা কান্নাকাটি করে কিংবা মানিয়ে চলা যায় কিনা দেখার জন্য আর একটা সুযোগ দেবার জন্য মিনতি করে, তাহলে সে কঠিন হয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না। এ ঝুঁকি সে নেবে না।
