এই মুহূর্তে তার মনে পড়ল মোড়কটি প্যান্টের হিপ পকেটেই রয়েছে। কাগজটায় যা লেখা ওটা সেই বিষয়ই কিনা সে জানে না। যে ধরনের কার্যকারিতার কথা লেখা হয়েছে, সত্যিই যে তেমনটি হবে কে জানে। কিন্তু যদি হয়?
যদি নন্দাকে খুন করি, অরবিন্দ অ্যাকসিলারেটরে চাপ কমিয়ে গাড়ির গতি মন্থর করে ভাবল, যদি ধরা পড়ি তাহলে সবাই আমাকে নিষ্ঠুর শয়তান বলবে। আশ্চর্য, যদি না আমি ওর মানসিক পীড়নের কথা ভাবতাম, তাহলে তো এতদিন ওকে ত্যাগ করেই চলে যেতাম। ফাঁসি যাওয়ার মতো কাজের ঝুঁকিই নিতাম না। যারা শয়তান বলবে, তারা এই দিকটা দেখবে না। ঝুঁকি না নিয়েই, আমি যা চাই তাই পেয়ে যেতে পারি যদি নিষ্ঠুর হই।
‘অদ্ভুত, ছেলেমানুষি, ওদের যুক্তি।’ অরবিন্দ কথাটা বলেই গাড়ি থামল। একটা লোক হাত তুলে রয়েছে। বোধহয় কোথাও পৌঁছে দিতে বলবে। দু-ধারে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল এখন সে কোথায়। চিন্তায় ডুবে গাড়ি চালিয়ে এসেছে। তার মনে হল, ব্যারাকপুরের পুলিশদের সদর আস্তানা সে পার হয়ে গেছে।
‘শ্যামবাজারের দিকে যাবেন কি?’
‘হ্যাঁ।’
‘সিঁথির মোড়ে নামিয়ে দেবেন?’
অরবিন্দ ঝুঁকে পাশের দরজাটা খুলে দিল।
‘বাঁচালেন!’ গাড়ি চলা শুরু হতে লোকটি বলল। ‘এত রাতে বেরোনো যে কী দুর্ভোগ! অথচ না হলেই নয়।’
অরবিন্দ আড়চোখে লোকটিকে দেখল। মাঝবয়সি। টাক পড়ে গেছে। গাল বসা। ময়লা নীল শার্ট। বাসি ঘামের গন্ধ।
সিটের ওপরই সিগারেট আর দেশলাই বাক্সটা রাখা। অরবিন্দ তুলে নিয়ে এগিয়ে ধরল, ‘খান’।’
ইতস্তত করে কৃতজ্ঞ হাসির সঙ্গে লোকটা সিগারেট বার করল। ধরাল।
এত রাতে বাইরে কেন? অরবিন্দ অনুমানের চেষ্টা করল। মাতাল নয়। চোর-ডাকাত হওয়া অসম্ভব। বেশ্যা বাড়ি থেকে ফিরছে? কিন্তু এতদূরে তাহলে কেন? সিঁথির কাছাকাছি কি ওরা নেই।
‘এত রাতে বেরিয়েছেন?’
‘বন্ধু মারা গেল। কাল ভোরেই কাজে বেরোতে হবে, শ্মশান থেকেই চলে এলুম। ছোটোবেলার বন্ধু।’
চোর-ছ্যাচোর, ডাকাত, মাতাল, বেশ্যাসক্ত এবং শোকগ্রস্ত, সবাই প্রায় একই রকম দেখতে, একই জামাকাপড় পরে, সিগারেট দিলে একইভাবে টানে। অরবিন্দ মুখ খুলল, ”শুনে খারাপ লাগছে মনটা। ছেলেবেলার বন্ধুরা প্রাণের কাছের মানুষ হয়।”
লোকটি সিগারেটে লম্বা টান দিল। সামনের কাচে অরবিন্দ লাল আভা দেখতে পেল।
লোকটি বলল, ‘মরে অবশ্য বেঁচেছে। পাঁচ মাস ধরে ক্যানসারে কষ্ট পাচ্ছিল। ভালোই হল। দুদিন আগে আর পরে, এই তো ব্যাপার। আমাদের সবাইকে তো একদিন যেতেই হবে।’
‘গোড়ায় ধরা পড়েনি। পড়লে তক্ষুনি অপারেশন করিয়ে নিলে হয়তো আর কিছুদিন বাঁচতে পারত। ডাক্তার বলেছিল, খুব একটা লাভ অবশ্য তাতে হত না। যাক, রেহাই পেয়ে গেল। বাঁচার জ্বালা-যন্ত্রণাও তো কম নয়। তা থেকে রেহাই পেল।’
চিরকালের মামুলি কথা, সান্ত্বনা। অরবিন্দের মনে হল, তবু কখনো কখনো সময় বিশেষে এগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা রয়ে যায়। আমাদের সবাইকেই একদিন যেতে হবে। রেহাই পেয়ে গেল। কৌটোয় ভরা কথাগুলো যেন তাকে সাজানো রয়েছে। দরকার হলেই পেড়ে নাও। সরল, অশিক্ষিত মন যখনই কষ্ট পাবে, তখনি কৌটো থেকে বার করে খেয়ে নাও বা মালিশ করো। অমনি জুড়িয়ে যাবে।
অরবিন্দ বলল, ‘আমরা কেউই চিরকাল বাঁচব না।’
‘খাঁটি কথা।’ লোকটি শেষটান দিয়ে সিগারেটটা ফেলার জন্য জানালার কাচ নামাতে ব্যস্ত হল।
‘সবকিছু চুকেবুকে বন্ধুটি তাহলে রেহাই পেল।’
‘হ্যাঁ। তবে ডাক্তারের কাছে গোড়াতেই ওর যাওয়া উচিত ছিল। কটা দিন তবু তো বাঁচত। ওই সামনের দোকানটার কাছে দাঁড় করাবেন।’
অরবিন্দ গাড়ি থামাল। লোকটি নেমে নমস্কার করতেই একবার মাথাটি ঝুঁকিয়ে সে গাড়ি ছেড়ে দিল।
ঠিকই বলেছে লোকটা, রেহাই পেয়ে গেল। যন্ত্রণা ভোগ সম্পর্কে এভাবে চিন্তা না করলে, এমন মনোভাব না নিলে, শেষে পাগল হয়ে যেতে হবে। একমাত্র নরক ছাড়া বোধহয় যন্ত্রণাটা আর কোথাও চিরস্থায়ী নয়, অবশ্য নরক বলে যদি কিছু থাকে। সব কিছুর শেষেই কোনোভাবে আছে শাস্তি, যন্ত্রণা থেকে রেহাই, ভয় থেকেও। শেষ হওয়া, চুকে যাওয়া এবং একটা কোথাও পৌঁছনো, চিরকালের জন্য। এই পৃথিবীর যাবতীয় আর্তনাদ, যন্ত্রণা, ভয়ের সঙ্গে মোকাবিলার একটিই পথ-শেষ করে দাও। অন্য কোনো চিন্তার পথে গেলে কপালে হাত দিয়ে গোঙানো ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না।
চিড়িয়ামোড়ে এক কনস্টেবলকে একাকী দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে দেখে হঠাৎ অরবিন্দর ইচ্ছা হল, স্বাভাবিক মানুষের দুঃখভারহীন, নিরুদ্বিগ্ন, জোরালো এমন এক কণ্ঠস্বর শুনতে যা তাকে এখনকার এই ফাটকাবাজ, কুচক্রী চিন্তার জগৎ থেকে টেনে বার করে নিয়ে যাবে।
গাড়ি থামিয়ে সে জানালার কাচ নামিয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘পাতিপুকুর কোন রাস্তা দিয়ে যাব।’
কনস্টেবল তাড়াতাড়ি সিগারেট ফেলে এগিয়ে এল।
‘আপনি এদিক দিয়েও যেতে পারেন। পুবের রাস্তাটি দেখিয়ে সে হাত তুলল। ‘সোজা যাবেন স্যার। দমদম স্টেশন ছাড়িয়ে, মতিঝিল ছাড়িয়ে নাগেরবাজার, ডানদিকে বেঁকবেন। আর পাইকপাড়া ঘুরেও যেতে পারেন স্যার। সোজা গিয়ে টালা। ব্রিজের আগেই বাঁদিকে রাজা মণীন্দ্র রোড…’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ও রাস্তাটা চিনি। আচ্ছা খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে শুনেছিলাম?’
