‘কতদিন ধরে দিদমাকে বলছি, ঝেড়েঝুড়ে জিনিসগুলো রোদে দাও, রোদে দাও। তা কথা কে শোনে। যেমনটি কত্তা রেখে গেছে তেমনটিই থাকবে। হল তো? উইয়ের পেটে যাচ্ছে তো?’
কাপটা ব্যস্ত হয়ে হাতে নিয়ে অরবিন্দ চুমুক দিল। হাতটা কেন পকেটে ঢোকালাম। এই প্রশ্নটা তখন তার মাথার মধ্যে হাতুড়ি হয়ে ঘা দিচ্ছে। তার চিন্তার আড়ালে যে ইচ্ছাটা লুকিয়ে সেটা যেন ধীরে ধীরে গুঁড়ি দিয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে আসছে। অরবিন্দ ভয়ে কাঁটা হয়ে কাপ হাতে বসে রইল। তারপর কাপটা নামিয়ে, বাসন্তীকে অবাক করে সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
কল্যাণী থেকে গাড়ি চালিয়ে একা ফিরছিল অরবিন্দ। গাড়িটা তার পার্টনার যোশীর। অ্যাডভয়েসের কাজে সে গাড়িটা ব্যবহার করতে দেয়। অরবিন্দ কাজেই গিয়েছিল কল্যাণী। সঙ্গে টেপ রেকর্ডার নাটক, যেটা অ্যাডভয়েস তৈরি করেছে ম্যাথুজ ফার্মাসিউটিক্যালসের চুলওঠা বন্ধের টনিকটির জন্য। ম্যাথুজের মার্কেটিং ম্যানেজার গৌর কুণ্ডু কলেজ সহপাঠী ছিল অরবিন্দর। কল্যাণীতে বাড়ি। হঠাৎ পা ভেঙে সে গৃহবন্দি। সে অনুমোদন না করলে বিজ্ঞাপন-নাটক বরবাদ হয়ে যাবে। অনুমোদন করলে খরচ বাদে হাজার তিনেক টাকা থাকবে। অ্যাডভয়েসের বর্তমান অবস্থায় এটা অনেক টাকা। গৌর কুণ্ডুকে খুশি রাখা এবং হাতে রাখা দরকার। ম্যাথুজ বিরাট প্রতিষ্ঠান, অনেকগুলো টয়লেট প্রডাক্ট ওরা বাজারে ছাড়তে যাচ্ছে।
গৌর কুণ্ডু দু-চারটি সামান্য সংশোধন সাপেক্ষে নাটকটিতে ছাড়পত্র দিয়েছে। অরবিন্দকে না খাইয়ে ছাড়েনি। খুশিয়াল মেজাজে সে গাড়ি চালাচ্ছে। ফেব্রুয়ারি শেষ হতে চলেছে। শীতের আমেজ রাত্রের শুকনো বাতাসে। জানালার কাচগুলো তুলে দিয়ে সে গরম রেখেছে ভিতরটা। বহুদিন পর একটা নির্দিষ্ট গতি বজায় রেখে গাড়ি চালাতে পেরে সে সুখবোধ করছে। গাড়িটাও অদ্ভুতভাবে সাড়া দিচ্ছে তার স্পর্শে। এঞ্জিনের টানা গুঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গে অরবিন্দ যেন নিজের উপর আস্থা পাচ্ছে। দুশ্চিন্তাগুলো মোলায়েম হয়ে আসছে। এইরকম সময়ে তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে, ঠিকমতো পরিপার্শ্বিক অবস্থা পেলে সে আর নন্দা আলাদা হয়ে শান্তিতে নিজেদের ইচ্ছামতো বাস করতে পারবে। হয়তো সদ্ভাব বজায় রেখেই।
রাস্তায় আলো কম। দু-পাশে বস্তি, খাটাল, কুলি ব্যারাক, রাস্তাটাই কখনো কখনো সঙ্কীর্ণ। খাটিয়ার চাদর মুড়ি দেওয়া ঘুমন্ত মানুষের উপর দিয়ে হেড লাইটের আলো পিছনে যাচ্ছে বাঁক নেবার সময়। একটা সিগারেটের দোকান খোলা আছে দেখে সে গাড়ি থামিয়ে সিগারেট কেনার সময় হঠাৎ পিছনে এসে দাঁড়াল একটা বাচ্চচা। বয়স চার হতে পারে, দশও। একটা কাপড়ে মাথা ঢেকে হাঁটু পর্যন্ত জড়ানো। গলায় গিট। শীর্ণ হাত বাড়িয়ে জুলজুলে চোখে তাকিয়ে।
এত রাত্রে ভিক্ষে করছে? অরবিন্দ ঘড়িতে দেখল বারোটা পঁচিশ। তারপর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। বাচ্চচাটার মুখ নির্বিকার। ভিক্ষা চাওয়ার আবেদন নেই চোখে। শীতের জন্য কাতরতা নেই মুখে। সব কিছুই অভ্যাসের ব্যাপার।
সিগারেটওলার দেওয়া খুচরো পয়সা যা পেয়েছে, অরবিন্দ বাচ্চচাটার হাতে দিল। এক মুঠো দশ পয়সা। এই প্রথম ওর মুখে ভাবান্তর ঘটল। অবিশ্বাসভরে পয়সাগুলো ও অরবিন্দর মুখ বার কয়েক দেখে পিছু ফিরে গুটি গুটি এগিয়ে গেল। আবছা অন্ধকারের মধ্যে অরবিন্দ দেখল, একটা বন্ধ হোটেলের উনুনের ধারে, রাস্তায় জড়াজড়ি করে চার-পাঁচটি ছেলেমেয়ে নিয়ে একটি স্ত্রীলোক ঘুমোচ্ছে। বাচ্চচাটি সেখানে গিয়ে উবু হয়ে বসে স্ত্রীলোকটিকে নাড়া দিতে লাগল।
মোটরে উঠে স্টার্ট দিল অরবিন্দ। যাবার সময় দেখল স্ত্রীলোকটি, হয়তো মা বাচ্চচাকে চটাস করে পিঠে চড় মারল। রাস্তার কাচ্চচাবাচ্চচা নিয়ে ভিখিরিনি শুয়ে, এটা এমন কিছু হৃদয়বিদারক ব্যাপার নয়। বহুবার শেষ রাত্রে সে ডকুমেন্টারির জন্য রসদ খুঁজতে বেরিয়ে কলকাতার পথে পথে এ ধরনের দৃশ্য দেখেছে। প্রাত্যহিক মলমূত্র ত্যাগের মতোই এটা মনে না রাখার ব্যাপার। কিন্তু এত রাত্রে বাচ্চচাটার ভিক্ষা চাওয়া তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। হয়তো ঘুম আসছিল না কোনো কারণে। কী কারণে? ভিখিরি বাচ্চচার আবার কারণ কী? হতে পারে, খিদেতে ঘুম আসেনি। খিদে একটা অমোঘ ঘটনা। অরবিন্দর মনে হল, ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করা বা দুঃখবোধ করাটা অনর্থক। এ ধরনের দুঃখের কাছাকাছি এলেই করুণায় আক্রান্ত হতে হবে, যন্ত্রণা শুরু হবে।
মানুষের স্বভাবই যন্ত্রণার কারণটিকে সরিয়ে দেওয়া। যদি তা না পারে, তাহলে এর আওতা থেকে পীড়িত মানুষটিকে দূরে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করবে। কিন্তু এটা যদি মনের যন্ত্রণা হয়, যদি বিশ্বাস করে সমর্পিত হৃদয়ে আচমকা ছুরি খাওয়ার যন্ত্রণা হয়? অরবিন্দ ভাবল, এই ধরনের যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় নেই। বহু ব্যাপারে করুণাবশত খুনের কথা শোনা যায়। কিন্তু এই ধরনের পীড়ন থেকে মুক্তির জন্য একটি হাতও কি কেউ বাড়িয়েছে? অন্তত যন্ত্রণার পীড়ন থেকে রেহাই দেবার জন্য কেউ কি হত্যা করেছে?
‘করেছে কি কেউ?’ অরবিন্দ চেঁচিয়েই বলল, ‘কে বলতে পারে?’। কেউ না। অন্যের হৃদয়ের মধ্যে কি ঘটছে তা কি দেখা যায়?’
