অরবিন্দ ঘরে চোখ বুলিয়ে দেখল সব কিছুই তার মোটামুটি চেনা। তোষকের স্তূপের উপর দুটি বেড়াল ঘুমোচ্ছে। বাইরে থেকে আর একটি এসে ঘরে ঢুকল। অরবিন্দকে আপাদমস্তকে দেখে বেরিয়ে গেল। শুধু দেয়ালে দামি ফ্রেমে বাঁধানো রঙিন ছবিটাই নতুন। মধ্যবয়সি নাদুস-নুদুস, ঝোলা গোঁফ, ঘাড় পর্যন্ত চুল একটি লোক খালি গায়ে মেঝেয় বসে, গভীর মনোযোগে ডেস্কে ঝুঁকে লিখছে। পিছনে র্যাকে সার দিয়ে মোটা মোটা খান বারো বই : একটি দেয়াল ঘড়ি। ছবির নীচে সাদা অংশে লেখা : একদিকে স্বর্গ, ভাস্বর ভাবময় জগৎ। অন্যদিকে অস্বচ্ছ কর্মময় মর্ত্য জগৎ। একই ক্ষেত্রে স্বর্গ-মর্ত্যের মিলন অবলোকন করো, ধ্যান করো, দর্শন করো।”
অরবিন্দর বুঝতে বাকি রইল না, ইনিই রাঙাপিসির গুরুজি। ঘরের কোণে মেহগনি কাঠের কাচের পাল্লা দেওয়া বিরাট আলমারিটা ফাঁকা। রাঙাপিসি বিগ্রহের মতো ওটাকে যত্ন করেন, হাত পর্যন্ত দেন না। ওর ডাক্তার স্বামীর বইপত্র, চিকিৎসার সরঞ্জামভরা বাক্সটি, নস্যির ডিবে, ছাতা, মাফলার, চশমা ইত্যাদি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মতো আলমারিতে রাখা।
কিন্তু ফাঁকা কেন? কৌতূহলী হয়ে অরবিন্দ আলমারির কাছে আসতেই কারণটা বুঝল। বছরের পর বছর নাড়াচড়া না হওয়ায় উইপোকারা নিশ্চিন্তে তাদের চরিত্রগত অভ্যাস অনুযায়ী কাজ করে গেছে। মেঝেয় রাখা জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে সে বুঝল, খুব বেশি দিন আগে আলমারিতে উই ঢোকেনি।
একটা বই তুলে সে পাতা ওলটাল : মাসিক পত্রিকা মালঞ্চ। আর একখানা তুলল: মাইকেল গ্রন্থাবলি। বইগুলি বাঁধানো, সোনার জলে নাম লেখা। মোটা বইটি তুলে দেখল সেটি সুবল মিত্রের অভিধান, বাংলা থেকে ইংরেজি। তার নিচেই একটি লাল মলাটের বই তাকে আকর্ষণ করল : ফরেনসিক মেডিসিন অ্যানড টক্সিকোলজি।
বইটি নিয়ে অরবিন্দ, ফুঁ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে চেয়ারে বসল। বহুকাল আগে কনেপিসি তাকে একবার বলেছিল, ”জামাইবাবুর শখ ছিল নানান মিনারেলস ছাড়াও বেদে, দরবেশ, ফকির, কোবরেজ, হাকিম এদের সঙ্গেও খুব মেশামেশি করতেন।”
কথাটা এখন মনে পড়তেই অরবিন্দ একটু কৌতূহল বোধ করল। উইরা চমৎকারভাবে বইটি কেটেছে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই কিন্তু মাঝখানে গভীর কয়েকটি গর্ত এবং সেলাইয়ের কাছেও। বাইরের দিকের মার্জিনে মাঝে মাঝে পেনসিলে লেখা মন্তব্য, কিন্তু এত অস্পষ্ট যে পড়া কঠিন।
কতকগুলো বিষাক্ত অ্যাসিডের উপর সে চোখ বোলাল। হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ও তার প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে লেখার পাশে পেনসিলের লেখা-এক চামচই যথেষ্ট। দু’ঘণ্টাতেও কাবার হতে দেখেছি।
অক্সালিক অ্যাসিড। পেনসিলে অস্পষ্ট লেখা-নার্ভাস-সিস্টেম আর হার্ট-৬০ গ্রেনই।
অরবিন্দ পাতা ওলটাতে লাগল। বেরিয়াম ক্লোরাইড…আর্সেনিক…সায়নাইড…এরপরই সে থমকে গেল পাতা উলটিয়ে।
পাতার সঙ্গে লেপটে রয়েছে সেলোফোনের একটি মোড়ক। উইয়ে কাটতে পারেনি। মোড়কটি কাগজের মতোই পাতলা অরবিন্দ সেটি তুলে উলটেপালটে দেখল। ভিতরে একটি পুরিয়া আর এক টুকরো কাগজ রয়েছে। ফুঁ দিয়ে মোড়কটি ফাঁক করে সে কাগজটি বার করল। লাল কালিতে খুদে অক্ষরে লেখা : হরিশপুরের কার্তিকের কাছ থেকে পাওয়া। কিছুতেই বলল না কোন সাপের বিষ আর কি শেকড় মিশিয়ে তৈরি করেছে। গন্ধ নেই। স্বাদ নেই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যন্ত্রণাহীন মৃত্যু। করোনারি থ্রম্বসিসের যা যা লক্ষণ হুবহু তাই। একটা দেশলাই কাঠির মাথায় যতটা ওঠে, ততটুকুতেই নাকি মানুষের উপর কাজ হয়। গোটা চারেক মানুষ নাকি মেরেছে, পোস্টমর্টেমে বিষ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কাগজটি ভাঁজ করে মোড়কের মধ্যে রেখে অরবিন্দ বইয়ের পাতা উলটিয়েই থেমে গেল। ডা. বিশ্বাসের বলা কথাটা তার মনে পড়েছে-”সবথেকে করুণাময় মৃত্যুর একটি হল করোনারি থ্রম্বসিস।”
কথাটা তিনি বলেন বছরখানেক আগে এক সন্ধ্যায়, নন্দাকে পরীক্ষা করে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়। নন্দা বুকের বাঁদিকে অসম্ভব যন্ত্রণাবোধ করায় অরবিন্দ ডেকে এনেছিল ডা. বিশ্বাসকে। তিনি অবশ্য হজমের গোলমাল ছাড়া আর কিছু খুঁজে পাননি এবং বড়ি ও কিছু উপদেশ ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থা করে দেননি। নন্দা তাতেই সেরে উঠেছিল চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ডা. বিশ্বাস হালকা চালে, ডাক্তাররা যেভাবে বলে থাকে সেইরকম ঠাট্টাচ্ছলে বলেছিলেন, ‘নন্দার অসুখটা হয়তো অ্যানাজাইনা পেকটোরিস, এটা হয় করোনারি থ্রম্বসিস থেকে।’ তারপর হো হো করে হেসে বলে ওঠেন, ‘কেমন ভয়টা দেখালাম।’
তাহলে, যদি নন্দা-কি? কী হতে পারে? অরবিন্দর চিন্তা থমকে গেল। কিন্তু নিঃসাড়ে তখুনি আবার ফিরে এল। চিন্তার পিছু নিয়ে অবশেষে সেটির শেষ প্রান্তে পৌঁছল। নন্দা যদি হঠাৎই মারা যায়, যদি সেটা করোনারি থ্রম্বসিসের মতোই মনে হয়, ডা. বিশ্বাসের নিশ্চয়ই মনে পড়বে তিনি অ্যানাজাইনা পেকটোরিসের কথাটা তুলেছিলেন…তাহলে করোনারি থ্রম্বোসিসই তিনি ধরে নেবেন। অরবিন্দ কাগজটি মোড়ক থেকে বার করে আবার পড়তে পড়তে ভ্রূ কোঁচকাল।
দরজার কাছে পায়ের শব্দ। চমকে উঠেই অরবিন্দ মোড়ক এবং কাগজ সমেত হাতটা প্যান্টের পকেটে ভরে ফেলল।
চায়ের কাপ হাতে বাসন্তী।
