দীর্ঘক্ষণ থেমে থেমে কথাগুলো বলে অরবিন্দ সিগারেটের ছাই ঝাড়ল। নন্দা কোলের উপর দুটি মুঠো রেখে পায়ের দিকে তাকিয়ে বসে। একটা কথাও বলেনি। অরবিন্দ ধরে নিল, প্রবলভাবে পালটা আক্রমণ করার জন্য নন্দা তার অস্ত্র শানাচ্ছে। সেও তৈরি হয়ে আছে।
নন্দা ধীর শান্ত স্বরে বলল, ”তুমি রোম্যান্টিক আবেগপ্রবণ, আমি তা নই। তোমার অন্য কাউকে বিয়ে করা উচিত ছিল। আমি বুঝি, তুমি আর আমাকে ভালোবাস না। আমাকে তোমার ভালো লাগে, আমাকে তোমার দরকার, আমাকে ছাড়া তোমার চলবে না অথচ আমায় ভালোবাস না। আর ভালোবাস না।”
অরবিন্দ ভাবল, এইবার কথাটা শুরু করা যেতে পারে।
তারপরই সে বিষণ্ণ হতে হতে দেখল নন্দা কাঁদছে। সিধে হয়ে বসে, কোলে দু-হাত রেখে, মুখটি নামিয়ে কাঁদছে। বাচ্চচাদের মতো ঠোঁট দুটি টিপে, সারা মুখ দোমড়ানো কান্না চাপার চেষ্টায় সারা শরীর থরথর করে যাচ্ছে।
”কাঁদছি বটে কিন্তু আমি অনেক শক্ত মেয়ে অরো, অনেক শক্ত। কিন্তু তোমার দরকার নরম মেয়ে, তাই না?”
অরবিন্দ জবাব দিল না। তার মনে হচ্ছে, নন্দা কি বোকা। ভাবছে শক্ত মেয়ে কিন্তু আসলে শিশু। ভালোবাসা পেতে চায় আবার কাউকে ভালোবাসা দিতেও চায়। ওপরে ওপরে নিজেকে কঠিন বাস্তববাদী হিসেবে দেখাতে চায়। তার ঠিক নিচেই ঢাকা রয়েছে স্বার্থপরতা, লোভ, উদাসীনতা, অহঙ্কার। কিন্তু অত্যন্ত গভীরে লুকিয়ে আছে অসহায়, ভালোবাসার কাঙাল আদত শিশুটি। সব মানুষই হয়তো এরকম, হয়তো আমিও।
কান্না জড়ানো নন্দা আবার বলল, ”আমি জানি, আমার ছাড়া তোমার চলবে না।”
দেহের প্রতিটি কোষ থেকে চুঁইয়ে তৈরি হওয়া একটা তরঙ্গ ধীরে ধীরে ঘিরে ধরছে। অরবিন্দ সভয়ে লক্ষ্য করল তরঙ্গটা ফিরছে তার হৃদয়কে। ব্যস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি সে বাঁধ দিতে শুরু করল এবং উত্তেজিত হয়ে দেখতে থাকল তরঙ্গটা ক্রমশই উঠছে উপর দিকে। সে বাঁধটাকে আর একটু উঁচু করতে করতে ভাবল, তাহলে আমাকে বিয়ে করা কেন? করলেই যদি তবে তৈরি হলে না কেন, যা আমি চাই তাই দিতে? অসম্ভব, আর এভাবে দুজনে স্বামী-স্ত্রী হয়ে থাকা যায় না। চিত্রা নিঃসঙ্গ, আমাকে তার দরকার। আমারও দরকার তাকে।
নন্দা দু’হাতে মুখ ঢেকে এবার কাঁদছে। মাঝে মাঝে শ্বাস ছাড়ার শব্দ এবং দু’একটা ফোঁপানি। দুঃখটা যাতে নাটকীয় হয়ে প্রকাশ না পায়, তারই চেষ্টা করে যাচ্ছে নন্দা। অরবিন্দ আবার সভয়ে দেখল তরঙ্গটা আছড়ে পড়ছে বাঁধের উপর। ফাটল ধরছে। তরঙ্গ সরে গিয়েই আবার ফিরে আসছে প্রচণ্ড বেগে। এই তরঙ্গই কি মমতা!
ধরা গলায় নন্দা বলল, ”আমি অনেক রকমভাবে চেষ্টা করেছি অরো। কিন্তু এতই কি সহজ?”
মমতা, মমতা, মমতা। শিকারি টিকটিকির মুখের কাছে আরশুলা। পা ভাঙা কুকুরের আর্তনাদ। হঠাৎ অজানা অমঙ্গল আশঙ্কায় কেঁপে উঠে অরবিন্দ দেখল তরঙ্গটা বাঁধ ছাপিয়ে প্রবল বেগে নামছে তার দিকে। হিংস্র আক্রোশে সেই বিপুল শক্তির সঙ্গে সে কিছুক্ষণ লড়াই করে হাল ছেড়ে দিল। থইথই জলে ভাসতে ভাসতে সে জেনে গেল, হার হয়ে গেছে।
চেয়ার থেকে উঠে মন্থরভাবে সে নন্দার পাশে এসে বসল এবং বাহুর বেড়ে তাকে বুকের কাছে টানল। ঠিক এই সময়ই অরবিন্দর মনে প্রথম চিন্তাটা আসে-নন্দাকে মেরে ফেলা ছাড়া তার কাছে মুক্তির আর কোনো পথ খোলা নেই।
.ঘুম ভাঙতে দেরি হল আজ। নন্দা বিছানায় নেই। হাত বাড়িয়ে ড্রেসিংটেবল থেকে ঘড়িটা তুলে অরবিন্দ সময় দেখল। এইবার চা নিয়ে ঘরে আসবে নন্দা নিখুঁত গৃহিণী অনবদ্য স্ত্রী। কিন্তু মতিকে কাপ হাতে আসতে দেখে সে ভ্রূ কোঁচকাল।
”দিদি তো ভোরেই বারুইপুর গেছে।”
”কখন ফিরবে?”
”রাতে, নয় তো কাল প্রথম ট্রেনে। কি রাঁধব এবেলা?”
”নিরামিষ্যি। মসুরি ডাল, পেঁয়াজ রসুন দিবি আর করলা ভাজা। আমড়ার টক, পোস্ত দিয়ে, ব্যস। ওবেলা আমি কল্যাণী যাব, রাতে খাব না।”
চা খেতে খেতে অরবিন্দ হালকা ঝকঝকে বোধ করল। নন্দা না থাকলেই আলস্যের মিঠে আমেজে গড়াতে পারে, দাড়ি না কামালেও চলে; পরিষ্কার শার্ট, ঝকঝকে জুতো না পরার জন্য ভ্রূকুটি নেই। বিয়ের আগের জীবনের স্বাদ খানিকটা যেন পাওয়া যায়। হঠাৎ তার মনে পড়ল রাঙাপিসিকে। বহুদিন যাওয়া হয়নি। একবার গিয়ে দেখে এলে হয় বুড়ি কেমন আছে।
বাড়িটা একই রকম রয়েছে। তিন বছর অন্তর কলি ফেরানোর, মেরামত করানোর অভ্যাসটা রাঙাপিসি বজায় রেখেছে। দু’ঘর ভাড়াটে আজও রয়েছে, তবে বিমার দালালের বদলে এখন এক সহকারি অফিসার। দোতলায় কনেপিসির ঘরটায় এখন রাঙাপিসি থাকে। অরবিন্দরা একতলায় যে ঘরটায় থাকত এখন সেটার অর্ধেক জুড়ে আসবাব আর পুরনো জিনিসপত্র স্তূপ হয়ে রয়েছে। বাড়িতে রাজমিস্ত্রিরা কাজ করছে।
বাসন্তীর মা বছর পাঁচেক আগে মারা গেছে, তার জায়গায় এখন কাজ করছে বিধবা প্রৌঢ়া বাসন্তী। অরবিন্দকে দেখে সে অবাক হল, খুশিও।
”কতদিন পরে গো। বোসো, চা করে দি। দিদমা তো বেইরেছে, গেছে তার গুরুজির কাছে।”
”কখন আসবে?”
”এইবার আসার সময় হল। কী ঝঞ্ঝাট যে এই মিস্তিরিগুনোকে নিয়ে হয়। খালি ফাঁকি আর ফাঁকি। রান্নাবান্নাও করব আবার ওদের পেছনে খ্যাচ খ্যাচও করতে হবে। একটু নজর আলগা দিয়েছ কি বিড়ি ফুঁকতে নেগে যাবে। তার ওপর কে চোর কে ছ্যাঁচোর তার ঠিক আছে না কি। দ্যাখো না ঘর ভর্তি জিনিস কীভাবে আলগা রয়েছে। তোমার আমার কাছে মূল্যবান না হোক, দিদমার কাছে তো বটে। সবই তো ওর স্বামীর। তুমি বসো, আমি যাব আর আসব।”
