”হবে।” নন্দা মুঠো থেকে লবঙ্গ বেছে দাঁত কাটতে কাটতে বলল, ”এসব দেয়াটেয়া শেষ পর্যন্ত তো সার্থকতা পায় একটি জায়গাতেই-বিছানায়।”
”সেক্স?”
”তাছাড়া আর কী!”
অরবিন্দ চুপ করে গেল। নন্দার মুখ থেকে এ ধরনের কথা সে আগে কখনো শোনেনি। তার ইচ্ছা করল তর্ক করতে, ওকে বোঝাতে যে এটা জীবনে হতাশ ব্যর্থ-হওয়া মানুষদের মতো চিন্তা। কিন্তু বিরক্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার কথা বলতে তার ইচ্ছা হল না।
অনেকক্ষণ ওরা কথা না বলে রইল। তারপর হঠাৎ ফিসফিস করে নন্দা বলল, ”অরো, আমি কিন্তু তোমায় ভালোবাসি।”
”বাসো নাকি?” অরবিন্দ তিক্ততা চেপে বলল, ”হয়তো বাসো।”
”লোকেরা যে যেমন, আমি ঠিক সেই ভাবেই তাদের দেখি। তাদের গুণগুলোই শুধু নয়, দোষগুলোও দেখি, তাই কাউকেই আমার আহামরি মনে হয় না। এটা কি আমার ত্রুটি?”
”এত বাস্তববোধের ভার নিয়ে তুমি কুঁজো হয়ে গেছ নন্দা। কিছুটা স্বপ্ন কিছুটা কল্পনা নিয়ে না থাকলে জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে।”
”স্বপ্ন মানুষকে ঝিমিয়ে দেয় আরও, মৌতাতের মতো। বাস্তব থেকে যে সত্য উঠে আসে তাতেই আমি বিশ্বাসী। নিজের বোধবুদ্ধির কাছে অনুগত থাকা খুবই কঠিন ব্যাপার, তবু আমি তাই থাকতে চাই।”
”মনে হয় তুমি থাকতে পেরেছ।”
অরবিন্দ খাতা বন্ধ করে উঠে পড়ল। সারাক্ষণ হিজিবিজি কাটা ছাড়া আর কিছু সে করেনি। তেষ্টা পেয়েছে তার। জল দেবার জন্য চাকরকে না ডেকে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ফ্রিজের পাল্লা খুলতেই ঠান্ডা ঝলক মুখে এসে লাগামাত্র অরবিন্দ সচকিত হল।
এই হচ্ছে সময়। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়ে ওঠার জন্য সেটা বোধহয় এইবার এসেছে। সাবধানে এখন কথা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে সম্পর্ক ছেদের দিকে। মন থেকে এখন আবেগ ছেঁটে ফেলতে হবে, মায়া মমতা হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে হবে। ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল অরবিন্দের মুখ। চোখ-কান থেকে হলকা বেরোচ্ছে। মুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে সে ঘরে ফিরে এল।
নন্দা অপেক্ষা করছিল। অরবিন্দ ঘরে ঢোকামাত্র বলল, ”তোমার অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করা উচিত ছিল, অরো। তোমাকে যেভাবে ভালোবাসি, তাকে তুমি ভালোবাসা বলবে না। আমার থেকে আরও নরম, আরও ভীরু প্রকৃতির কাউকে বিয়ে করলে তুমি সুখী হতে। তুমি যা আশা করো, আমি তা পূরণ করতে পারি না, চেষ্টা করেও পারি না। এটাই আমাদের বিয়ের ট্র্যাজেডি। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি চেষ্টা করি ভালো স্ত্রী হতে।”
”সেটা ঠিক। তুমি যে ভালো স্ত্রী তাতে সন্দেহ নেই।”
কথাটা বলেই অরবিন্দের মনে হল, এটা এই মুহূর্তে স্বীকার করে কি ভালো করলাম? কিন্তু কথাটা সত্যি। নন্দা অত্যন্ত ভালো গৃহিণী। দুঃসময়ে পাশে থেকে ভরসা জুগিয়েছে, সান্ত্বনা দিয়েছে বন্ধুর মতো, যত্নে কোনো ত্রুটি নেই। আজ দ্বিতীয়বার অরবিন্দর মনে হল, নন্দা চমৎকার একটা আংটি, কিন্তু আমার জন্য মধ্যিখানের পাথরটিই তাতে নেই। অন্য লোকে তা নিয়ে মাথা ঘামাবে না হয়তো, কিন্তু ওর পোড়াকপাল। আমি এই নিয়ে মাথা ঘামাই।
”আমি ব্যর্থ হয়েছি অরো,” নন্দা বাঁ হাতে চুলগুলোকে কানের ওপর থেকে সরাতে সরাতে চোখ বন্ধ করে বলল, ”আমি যে পারিনি সেটা আমার দোষে নয়। পারিনি এই কারণে যে, তুমি যা চাও তা আমি দিইনি।”
এইবার ঘা দেবার সময় এসেছে। অরবিন্দ ভাবল, এইবার কি ওকে বলব? ওর জিভের ডগায় কথাগুলো জমে উঠেছে, অথচ বলার সময় বেরিয়ে এল অন্য কথা।
”যে লোক হৃদয়ের আবেগে চালিত হয় তাকে যদি অতি বাস্তববাদী মেয়ে বিয়ে করে তাহলে ব্যর্থতা আসবেই। দোষ যতটা তোমার ততটা আমারও। কিন্তু তুমি সত্যিই আমার জন্য অনেক সয়েছ, করেছও।”
নন্দা চোখ বড়ো করে অরবিন্দর দিকে তাকাল। অবিশ্বাস করছে না কিন্তু অবাক হচ্ছে। মুখে পাতলা হাসি। কামিজের গলার বোতামটা নিয়ে টানাটানি করছে।
”কিন্তু স্বামীদের জন্য যারা অনেক করে তাদের বিরাট মাশুলও গুনতে হয়।”
বোতাম ছেড়ে দিয়ে নন্দা বলল, ”মানে?”
”যাকগে এসব কথা।” অরবিন্দ সিগারেট প্যাকেটের জন্য হাত বাড়াতেই নন্দা ঝুঁকে সেটা ঠেলে দিল। অরবিন্দ টের পেল নন্দা ব্রেসিয়ার পরেনি।
অরবিন্দর প্রথম ধোঁয়া ছাড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে নন্দা বলল, ”কি মাশুল?”
”বাদ দাও।”
”না বলো।”
”মেয়েদের কি মনে হয় জানো? কাঁকড়ার গর্তে ল্যাজ ঢুকিয়ে বসে থাকা শেয়ালের মতো। পুরুষরা হল কাঁকড়া। ল্যাজটা কামড়াতেই শেয়াল গর্ত থেকে তাকে তুলে এনে খোলা ভেঙে শাঁসটা গিলে ফেলে। যতদিনে না স্বামীটিকে মনের মতো করে বানিয়ে নিতে পারছে, স্ত্রীরা ততদিন অনুরোধ-উপরোধ, মান-অভিমান, ঘ্যান-ঘ্যানানি, ঝগড়া করে করে, দিনের পর দিন চাপ দিয়ে দিয়ে এমন একটা আকারে স্বামীকে এনে ফেলে, যখন আপন পরিশ্রমের ফল দেখে সে মুগ্ধ হয় আর উপভোগ করে। কিন্তু স্ত্রীরা ভুলে যায় এর জন্য তাকে দাম চোকাতেও হবে। পুরুষের ব্যক্তিত্বের কঠিন খোলাটি ভেঙে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলে তার আত্মরক্ষার ক্ষমতাটাই নষ্ট হয়; যে-কোনো সময় বিপদে পড়ে যাবেই। স্বামী তখন যদি অন্য মেয়ের কবজায় পড়ে, স্ত্রীর তখন আকাশ থেকে পড়া, হা-হুতাশ করা ছাড়া আর গতি থাকবে না। যে জিনিস সে খেটেখুটে তৈরি করল, সেটা তখন ভোগ করবে অন্য মেয়ে। এটা যে খুবই দুঃখের ব্যাপার তাতে সন্দেহ নেই।”
