সে চিত্রাকে বলেছিল, ”আমি সমানে-সমানে থাকতে চাই। আমি চাই না তোমার কাছে কুঁকড়ে থাকতে। আমি চাই না তুমি কোনো লোকের কাছে আমার জন্য অনুগৃহীত বোধ কর।” চিত্রা হেসে বলেছিল, ”ভালোবাসা হল তরঙ্গ, এটা স্নেহের মতোই নিম্নগামী। তুমি আমার থেকে একটু নয় নিচেই থাকলে, ক্ষতিটা কি? আমি তোমায় ভাসিয়ে দেব।”
”ভাসিয়ে নয়, ডুবিয়ে দাও। আমি সাঁতরাতে চাই না, নিচে গিয়েই আশ্রয় পেতে চাই। চিত্রা, শুধু এই অনুগ্রহটিই তোমার কাছ থেকে আমি চাই।”
অরবিন্দ আজ নাটক শুনতে শুনতে মনে মনে তৈরি হচ্ছিল নন্দার সঙ্গে হেস্তনেস্ত করতে, ছাড়াছাড়ির কথা বলতে। কিন্তু কীভাবে যে শুরু করবে ভেবে পাচ্ছে না। কলম হাতে সে যত না নাটকে কান দিয়েছে, তার থেকেও বেশি ভেবে গেছে নন্দার প্রতিক্রিয়া কী ধরনের হবে। নন্দার স্বভাব সে জানে। নিশ্চয় সহজে ছাড়বে না। কিংবা যেরকম মাথাগরম, অহঙ্কারী, স্বাধীনচেতা, তাতে তাকে ধরে রাখার জন্য কান্নাকাটি, মান-অভিমানেরও আশ্রয় নেবে না। কথা কাটাকাটি, তিক্ত অভিযোগ; হয়তো এর বেশি আর গড়াবে না।
ব্যাপারটা কীভাবে পাড়বে, অরবিন্দ দিন কয়েক ধরেই তা ভাবছে। অপ্রত্যাশিত, আচমকা নন্দার সামনে উপস্থিত করলে আঘাত পাবে। অরবিন্দ জানে, আঘাত দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। কোনোদিন কাউকে দিতে পারেনি। ডিভোর্সের কথা তোলার মতো সঙ্গত পরিস্থিতি চাই। কিন্তু সেটাই খুঁজে পাচ্ছে না সে। পরিস্থিতি তৈরি করতেও ব্যর্থ হয়েছে। ডিভোর্স হলে নন্দার চলবে কী করে, তা নিয়ে সে মাথা ঘামাচ্ছে না। বাবার কাছ থেকে নন্দা পেয়েছে বারুইপুরে আট বিঘা বাগান ও পুকুর সমেত একতলা ছোট্ট একটি বাংলো বাড়ি। পৈতৃক হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ের দু-আনা অংশ, যার থেকে প্রাপ্য টাকা ওর নামে দাদারা নিয়মিত ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়াও অরবিন্দ নিজের জমিটাও ওকে দিতে পারে যদি নন্দা টাকা দাবি করে। তবে ওর ধারণা, নন্দা কিছুই চাইবে না। অত্যন্ত তেজি, অহং-সর্বস্ব একরোখা মেয়ে সে।
নাটক শেষ হতেই নন্দা রেডিয়ো বন্ধ করে দিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আড়মোড়া ভেঙে বলল, ”কফি খাবে?”
”দাও।”
কফি নিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই নন্দা ফিরে এল। অরবিন্দ জানে, নাটকটি সম্পর্কে নন্দা এবার কিছু মন্তব্য করবে। সে অপেক্ষা করতে লাগল।
কাপে দুবার চুমুক দিয়ে নন্দা মুখ খুলল :
”রেডিয়ো নাটকগুলো এই এক দোষ, বড্ড বড়ো বড়ো সাজানো কথা বলে। যেমন অবাস্তব তেমনি বিরক্তিকর।”
”কোনটা অবাস্তব মনে হল?”
”আগাগোড়াই। প্রেম মানেই যেন নিজেকে বিকিয়ে সর্বস্ব সমর্পণ করে বসে থাকতে হবে। কেন রে বাবা! এমন হয়তো ঘটে, লাখে বড়োজোর একটা। তাই বলে, পতি দেবতাকে ধ্যান-জ্ঞান করে, নিজের মর্যাদা, ব্যক্তির অস্তিত্ব পর্যন্ত জলাঞ্জলি দিয়ে ভালোবাসার জন্য মেয়েদের এই কাঙ্গালেপনা, এসব ন্যাকামি বাংলা নাটকেই হয়।”
জবাব না দিয়ে অরবিন্দ কফিতে চুমুক দিল। সে জানে, এগুলো বহুবার বলা নন্দার খুবই প্রিয় কথা। বিনা প্রেমে বিয়ে করার সপক্ষে এইসব যুক্তি ভেবেচিন্তে সে তৈরি করে রেখেছে। নিজেকে ও বিশ্বাস করাতে চায়, অন্যেরাও বোধহয় তার মতো শুধু মস্তিষ্ক আর যুক্তিতে চালিত হয়েই বিয়ে করে। ভেবেছিল অরবিন্দ ফিল্মজগতে দিকপাল হবে। কিন্তু হয়নি। আসলে নন্দারই তো উচিত ছিল তাকে ছেড়ে যাওয়া। কিন্তু বদলে শুধু যুক্তি তৈরি করে গেছে এই আশ্বাসটুকু পাবার জন্য যে, তারই মতো নিরাবেগ জীবন নিশ্চয় অন্য লোকেরাও যাপন করে।
”অরো, তোমারও কি মনে হয়নি। আসলে সাজানো কথা এসবই আত্মপ্রবঞ্চনা।”
”না।” অরবিন্দ তার ভরাট স্বরকে আরও ভরাট করল কঠোর শোনাবার জন্য। ”প্রেমে আমি বিশ্বাস করি। আস্থা রাখি।”
নন্দা খালি কাপ টেবিলে রাখার জন্য ঝুঁকল। টেবিল ল্যাম্পের মৃদু আলো আটকা পড়ল ওর চুলের ঝালরে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য নন্দার আবছা মুখটিকে কোমল করুণ এবং তরুণ মনে হল অরবিন্দের। তারপরেই সে আরও ভরাট স্বরে বলল, ”তুমি তোমার মতো করে ভেবেছ, যেহেতু এখনও তেমন লোকের দেখা পাওনি।”
”কিংবা হয়তো আমি অন্য মেয়েদের ধাতে গড়া নই।” এত মৃদু স্বরে নন্দা কথাগুলো বলল, যে অসহায়ের মতো শোনাল।
”সর্বস্ব দিয়ে নিবেদনের যেসব কথা লোকে বলে যাকে বলা হয় প্রেম, আমি এটা কিছুতেই অনুভব করতে পারি না। আজ পর্যন্ত কোনো লোকের জন্যই এরকম কিছু বোধ করিনি।”
”কারণটা তো বললাম, সেরকম লোকের সঙ্গে তোমার এখনও দেখা হয়নি, তাই। দেখা হলে ঠিকই অনুভব করতে।”
”অসম্ভব।” নন্দা মশলার কৌটোটা নেবার জন্য ঝুঁকতে যেতেই অরবিন্দ চোখ সরিয়ে নিল। ”দেবতার মতো পুজো করা, ভয়ভক্তি করা, গদগদ হয়ে কথা বলা এসব আমার ধাতে নেই। পুরুষদের সঙ্গে ঝরঝরে সহজ সম্পর্ক, বন্ধুত্বের মতো টান, শারীরিক ঘনিষ্ঠতা যদি হয়তো হল, এর বেশি আর কিছু আমার বোধগম্য হয় না।”
অরবিন্দ বলল, ”প্রেম যখন হৃদয়ে আসে, তখন পুরুষ বা রমণী কী চায় জান? দিতে চায়, নিজেকে উজাড় করে দিতে চায়, বাঁচিয়ে রাখতে চায়, লালন করতে চায় তার প্রেমকে। সবার ওপরে থাকে সমর্পণের ইচ্ছা।”
”কী জানি। এসব হয়তো পি সি সরকারই দেখাতে পারে।”
”ম্যাজিক! হ্যাঁ, ম্যাজিকেরই মতো। এক ঝলক চাহনি, একটু চাহনি, ঠোঁটের কাঁপন, মাথাটা হেলিয়ে রাখা, হাতের আঙুলের নড়াচড়া, এর প্রত্যেকটাই প্রেমকে জাগিয়ে তুলতে পারে। ম্যাজিকেরই মতো, কিন্তু খুবই সাধারণ ম্যাজিক।”
