এবং না বলে দিলেও, চিরো সেই মুহূর্তে জেনে ফেলল, চিত্রা ঘটক ‘গ্রিন ড্র্যাগনে’ এসেছে। এটা তার কাছে অপ্রত্যাশিত। তীব্র কৌতূহল নিয়ে অরবিন্দের দৃষ্টি অনুসরণ করে সে প্রথমবার চিত্রাকে দেখার জন্য মুখ ফেরাল।
অরবিন্দকে দেখেই এগিয়ে আসছে চিত্রা। কচি কলাপাতা মুর্শিদাবাদ রেশমে জড়ানো পাকা ধানের আঁটি যেন বাতাসে দুলছে। হালকা, দ্রুত পা ফেলে চিত্রা টেবলের কাছে এল। কোমল দুটি চোখে বন্ধুত্বের চাহনি। ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল চিরো, জোড় হাতে চিত্রাকে নমস্কার করতে দেখে।
”অরবিন্দের কাছে যা শুনেছি, তাতে একটুও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না আপনিই ওর চিরো।” চিত্রা হাসল।
নমস্কার ফিরিয়ে দিয়ে চিরো ওর মুখের দিকে তাকিয়ে পালটা হাসল এবং ভাবল, উল্লুকের মতো হাসলাম। চিত্রা যখন হাসে চিরোর তখন মনে হয়েছিল ওর সারা মুখ, নিথর দিঘির ওপর দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘের ছায়ার মতো। অনুভবগুলো মুখে নড়াচড়া করে।
চিরো তার পাশের চেয়ারটি টেবিল থেকে সরিয়ে ধরে রইল। চিত্রা বসল। হাতের ব্যাগটি টেবিলে রাখল। চিরো ওয়েটারকে ইশারা করল বোতল এবং গ্লাস নিয়ে যেতে। বোতল তখনও আধ ভর্তি।
”শেষ করবি না?”
”না। অনেকদিন পর তো, ভালো লাগছে না খেতে।”
ডাহা মিথ্যে কথা। চিরো তাই অরবিন্দের মুখে দিকে তাকাল। চোখের আড়ালে সেই হাসিটা জ্বলজ্বল করছে।
”আপনি যে আসবেন, একদমই আমায় অরো বলেনি।”
”বললে কী করতিস? মেক-আপ নিয়ে আসতিস?”
চিরো অপ্রতিভ বোধ করল।
না, তাহলে নন্দাকে সঙ্গে নিয়ে আসতাম, এই কথাটা বলার ইচ্ছে দমন করে সে চিত্রার দিকে একটু ঝুঁকে বলল, ”কিছু একটা আনতে বলি?”
যা আশা করেছিল সে তা হল না। অনুরোধ উপরোধ ছাড়াই সহজ স্বাভাবিক করে চিত্রা বলল, ”হ্যাঁ, আইসক্রিম। বহুদিন খাইনি।”
ক্ষীণ সুগন্ধ চিত্রার শরীর থেকে চিরো পাচ্ছে। তার মনে হল, এই সুগন্ধ ওর দেহের ভিতর থেকেই লঘু বাষ্পের মতো বেরিয়ে আসছে।
”অরো?”
অরবিন্দ মাথা নেড়ে জানালে সে খাবে না।
”ও আমাকে কখনো অরো বলতে দেয় না। একমাত্র বন্ধুটি ছাড়া আর কারুর নাকি অধিকার নেই, ওকে অরো বলার।”
”তাই নাকি!”
নন্দাও বলে। কিন্তু সে-কথা এখন প্রকাশ করা যায় না। অরো এটা লুকিয়েছে যখন লুকোনোই থাক। চিরো একবার শুধু অরবিন্দের দিকে তাকাল। চোখাচোখি হতেই অরবিন্দ মুখ নামিয়ে টেবিলে পড়ে থাকা চিপসের একটা কণাকে নখ দিয়ে ভাঙার চেষ্টা শুরু করল।
”আমারও একমাত্র বন্ধু ও। তবে চিরো নামের সর্বস্বত্বটি শুধু একজনের জন্যই সংরক্ষিত নয়। আপনার?”
”দেবী খেতাবটি দয়া করে জুড়বেন না। তবে আমারও একটা ডাকনাম আছে কিন্তু বাড়ির লোক ছাড়া আর কেউ ডাকলে লজ্জায় পড়ে যাব।”
”নামটা জানতে পারি।”
”বোঁচন।”
চিত্রা হেসে উঠল। চোখের কোণে হাসির কুঞ্চন তিরতিরে ঢেউয়ের মতো। চিরো ভাবল, কত ওর বয়স? বড়োজোর বত্রিশ। মুখের প্রসাধন এত সূক্ষ্ম যে বোঝাই যায় না। বসনের রঙে নীরবতা; ফিকে কমলা ব্লাউজের হাতায়, গলায় ও কোমরে রুচির ভ্রূকুটি। ছোট্ট মাথায় সুগড়নটি পরিস্ফুট হয়েছে টেনে খোঁপা বাঁধার জন্য। চোয়াল ঈষৎ চৌকো, ঠোঁট দুটি পূর্ণ। ওর সমগ্রতার মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিত্ব এবং তাঁকে জুড়ে আলাদা স্নিগ্ধতা। চিরো অনুভব করল, তার মধ্যে কিছু একটা ঘটতে শুরু করেছে এবং সেটা অনুচিত।
”তোমার আজ সন্ধ্যায় কোথায় যেন রিহার্সাল আছে না?” অরবিন্দ বলল।
”হুঁ, ভবানীপুরে।” চামচে আইসক্রিম তুলে মুখে দেবার আগে থেমে ও বলল।
আগ্রহ বা কৌতূহল কোনোভাবেই প্রকাশ না পায়, এমন স্বরে চিরো বলল, ”কবে অভিনয়, কোথায়?”
”এগারোই মার্চ, স্টারে। খুব কাঁচা নাটক, ডিরেকটরও তাই।”
চিরো তারিখটা মুখস্থ করে রাখল।
.
ওদের দুজনকে অ্যাডভয়েসে নামিয়ে দিয়ে অফিসে ফেরার পথে চিরোর চোখে ভেসে উঠতে লাগল, চিত্রাকে দেখামাত্র হঠাৎ কান্তিময় হয়ে ওঠা অরবিন্দের মুখ। কিন্তু এই কান্তি তো সারাক্ষণ ওর মুখে মাখানো থাকে না। হঠাৎই জেগে উঠেছে এবং শুধুমাত্র চিত্রাকে দেখেই। কিন্তু চিত্রার লাবণ্য? চিরোর মনে হতে লাগল, নিয়ত ওর ভিতরেই বাস করছে।
চিত্রা! মিষ্টি, সুন্দর। চিরো শব্দ তিনটি বারবার মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করল!
.সেদিন রাতে অরবিন্দ ও নন্দা রেডিয়োর নাটক শুনছিল। ঘরটা আধো অন্ধকার, শুধু অরবিন্দর ঘাড়ের কাছে টেবিলল্যাম্পটা জ্বলছে। ডকুমেন্টারি ফিল্মের স্ক্রিপ্টের খাতাটা নিয়ে পরিবর্তন-পরিবর্ধনে নিযুক্ত অবস্থাতেই সে মাঝে মাঝে নাটকটিতে কান পেতে যাচ্ছিল। নন্দা বুকে বালিশ রেখে ডিভানে উপুড় হয়ে শুয়ে।
টাকা জোগাড় হলেই অরবিন্দ শুটিং শুরু করবে, কিন্তু টাকার পাত্তা নেই। জমিটা পড়ে আছে। বাড়ি করতে পারবে কিনা জানে না। জমিটা বন্ধক দেবারও কথা ভেবেছিল। কয়েক মাস আগে চিত্রাকে সে বলে, কলকাতার দুই বেলাকে বিষয় করে ছবি তোলার ইচ্ছাটা তার বহুদিনের। অর্থাভাবে পারছে না। কিছুদিন পর চিত্রা তাকে একটি লোকের সঙ্গে দেখা করতে বলে। লোকটি অর্থবান, খ্যাতিলোভী, অপেশাদার একটি নাটুকে দল করেছে স্বরচিত নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য। চিত্রা তার নাটকে অভিনয় করে।
অরবিন্দ লোকটির কাছে যায়নি। যে-কোনো লোকের কাছে গিয়ে সে হাত পাততে রাজি, কিন্তু নন্দার, চিরোর বা চিত্রা দ্বারা সংগৃহীত কারুর কাছ থেকে নয়। তার ধারণা, সবথেকে কাছের মানুষদের সঙ্গে তার সম্পর্ক এর পরে আর অটুট থাকতে পারে না। অনুগ্রহ নিলেই, দাতা কয়েক ধাপ ওপরে উঠে যায়। গ্রহণকারীর মতো কৃতজ্ঞতায় আবিল হয়ে আসে।
