”বিয়ের পর নন্দাকে প্রথম চুমু খাই ফুলশয্যার রাতে। ও চুমু খায়নি, খেতে দিয়েছিল। তখনই আমার কেমন যেন মনে হয়েছিল, ভুল করেছি বোধহয়। কিন্তু কার কাছে অভিযোগ করব? আমি নিজেই তো পছন্দ করে বিয়ে করেছি, ভেবেছিলাম, ওর মধ্য থেকে ভালোবাসা বার করে আনব। কিন্তু আজও তা পারিনি।”
অরবিন্দের স্বর থেকে অস্থিরতাটুকু কেটে গিয়ে সহজ ভঙ্গি ফিরে এসেছে। চিরো বলল, ”নন্দাকে বরফের মতো ভাবা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
”তাও নয়। নন্দা ছটফটে, উষ্ণ প্রকৃতি। কিন্তু সেটা আমার কাম্য নয় চিরো, আমি অন্য ধরনের উষ্ণতা চেয়েছি, চাই।”
”হয়তো ও তোকে ভালোবাসে, কিন্তু তুই সেটা বুঝতে পারিস না।”
”না, না, বাসে না।” অরবিন্দ মাথা নাড়ল। ইতস্তত করে বলল, ”নিছকই সেক্স, তার বেশি কিছু নয়। ও আমাকে বিয়ে করেছে শরীর আর মস্তিষ্কের প্রভাবে, হৃদয়ের তাগিদে নয়।”
হঠাৎ হেসে উঠল অরবিন্দ। যেন এতটা বলে ফেলে লজ্জা পাচ্ছে। চেয়ারে হেলান দিয়ে সে শিথিল হয়ে বসল।
চিরো ভেবে পাচ্ছে না এবার সে কি বলবে। একটি বিবাহের পুরো শরীর, ধীরে ধীরে কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে তার সামনে উন্মুক্ত হয়ে আসছে। অদ্ভুত লাগছে তার। এই নগ্নতা দেখতে অনেকেরই হয়তো ভালো লাগবে, কিন্তু তার লাগছে না, আবার অপ্রতিভও বোধ করছে না। ঠিক কেমন যে লাগছে চিরো সেটা ধরতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে একটি বৃদ্ধার দেহকে তার সামনে নগ্ন করা হচ্ছে এবং সে তাই দেখছে উদাসীনভাবে। এই বৃদ্ধার দেহ একদা সুডৌল ও সুন্দর ছিল, কিন্তু এখন জীর্ণ লোল-চর্মাবৃত।
অরবিন্দ সারা ঘরটায় চোখ বুলিয়ে বলল, ”কয়েক মাস আগে নন্দাকে বলেছিলুম, অবশ্য ঠাট্টাচ্ছলে,-‘আমি মস্ত ডিরেকটর হব, সত্যজিৎ রায়ের মতো; প্রচুর অ্যাওয়ার্ড, দেশে-বিদেশে খাতির, শ্রদ্ধা। আমাকে ঘিরে তর্ক-বিতর্ক, প্রশংসার গুঞ্জন, স্তাবকতা নিন্দা। আমি একটা কিছু হব, এই ভেবেই তো তুমি আমাকে বিয়ে করেছিলে!’ ভেবেছিলাম নন্দা কথাগুলোকে অস্বীকার করবে। কিন্তু ভালোভাবে মিথ্যাকথা ও বলতে পারে না। অস্বীকার করেনি। ”এদিক থেকে ও দারুণ সৎ।”
চিরো মাথা নেড়ে বলল, ”হ্যাঁ, সৎ। মনের জোরও আছে।”
”ও বলেছিল ‘তখন যাই ভেবে থাকি না কেন, এখন তোমাকে আমি ভালোবাসি।” আমি তা বিশ্বাসও করি। কিন্তু ওর মতো করেই ও ভালোবাসে। যখন বিয়ে করি, তখনকার থেকে এখন হয়তো বেশি ভালোবাসে। মুহূর্তের জন্য থেমে অরবিন্দ আবার বলল, ”ওর কথা শোনা মাত্রই কেমন যেন অবশ্য হয়ে গেছিল ভিতরটা। হেসে উঠেছিলাম খুব জোরে। এই নিয়ে আর কখনো আমরা কথা বলিনি।”
”জীবনে কিছু একটা নিয়েই আমাদের বাঁচতে হয়, অরো।”
কথাটা বলেই চিরো ভাবল, অর্থহীন অসাড় কথাটা বললাম কেন? শুধুই নৈঃশব্দ্য ভরাবার জন্য!
অরবিন্দ মন্থর স্বরে বলল, ”নন্দা হল পাথর সাজানো সুন্দর একটা আংটির মতো। প্রায় নিখুঁত, শুধু একটা জিনিস ছাড়া। আংটির মাঝের বড়ো পাথরটাই নেই, যেটার স্বপ্ন আমি দেখি।”
”ওর পক্ষে যা দেওয়ার সবই তোকে দিয়েছে। যদি তোকে রোমান্টিক প্রেম না দিতে পারে, তার জন্য কি ওকে দায়ী করা যায়?” অরবিন্দ জবাব দিল না দেখে, চিরো কিছু আগে বলা নিজের কথাটাই আবার বলল, ”জীবনে কিছু একটা নিয়েই আমাদের বাঁচতে হয়। সবকিছুই আমরা পেতে পারি না।”
অরবিন্দ যখন নীরবে মাথা ঝাঁকাল, চিরো তখনই বুঝে গেল চিত্রা ঘটক, মহিলা যেমনই হোক না কেন, জিতে গেছে। হয়তো সে রঙচঙ করা সস্তা পুতুল কিংবা হয়তো পরিশীলিত সম্ভ্রান্ত কেউ; চিত্রা ঘটক যাই হোক না, আপাতত বিজয়িনী এবং নন্দা পরাজিতা।
চিরো বিষণ্ণবোধ করল নন্দার জন্য। এই ধরনের ত্রিভুজে বরাবরই ভাগ্যের মার পড়ে স্ত্রীদেরই ওপর। অন্য মহিলাটি জানে যুদ্ধ চলছে। স্ত্রী কিন্তু একদমই অজ্ঞ থাকে এ সম্পর্কে। অন্য মহিলাটি প্রস্তুত হয়ে থাকে তার যাবতীয় অস্ত্র-মনোহারি আচরণ, হাস্য, লাস্য, মান-অভিমান ইত্যাদি নিয়ে ত্রিভুজের একটি বাহুর আকাঙ্ক্ষা ও তৃষ্ণাকে তৃপ্ত করতে। কিন্তু স্ত্রী যেহেতু কিছুই জানে না, তাই আচরণে আটপৌরে থাকে নিত্যদিনেরই মতো-কখনো স্নিগ্ধ উৎফুল্ল, কখনো বিরক্তিকর, ভোঁতা, খিটখিটে। স্বামী নীরবে তাকে লক্ষ করে যায়, মনে মনে দোষ-ত্রুটিগুলোর তালিকা তৈরি করে তার সঙ্গে তুলনা করে চলে অন্য মহিলাটির গুণাবলির। একটা অন্যায় সবসময়ই স্ত্রীদের বিরুদ্ধে ঘটে থাকে।
অরবিন্দ আবার বলল, ”নন্দা কখনোই আমাকে ভালোবাসেনি।”
গ্লাসটা নামিয়ে রেখে, যথেষ্ট বয়স হয়েছে অরো, ছেলেমানুষি আচরণ মানায় না আর-এই কথাগুলো বলতে গিয়েও চিরো তখন, কিংবা পরে বা কোনোদিনই আর তা বলার সুযোগ পেল না, কেননা সে দেখল অরবিন্দ হঠাৎ সিধে হয়ে বসেছে এবং মুহূর্তের মধ্যে তার চোখে এমন এক চাহনি ভেসে উঠল, যা চিরো কখনো কোনো মানুষের মুখে দেখেনি।
চেয়ার থেকে অরবিন্দ যখন উঠে দাঁড়াল, চিরো তখন ওর রুগণ দেহ বা মাথার তালুতে খাড়া হয়ে থাকা চুলের কথাও ভুলে গেল। ভুলে গেল চওড়া হাঁ-মুখ আর পুরু চশমাসহ ওর অতি সাধারণ দর্শন শীর্ণ মুখমণ্ডল। সে শুধু দেখল তার বন্ধু অদ্ভুতভাবে রূপবান হয়ে উঠেছে আভ্যন্তরীণ কী এক আবেগের আভায়। প্রতিটি কোষ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে লাবণ্য। তার মনে হল এই আবেগ, কাম, লোভ বা আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে মুক্ত।
