চিরো লক্ষ করে যাচ্ছিল অরবিন্দকে। কথা বলতে বলতে চাপা গর্বে ও শ্রদ্ধায় চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। চিত্রার জন্যই। গলা খাঁকারি দিয়ে ভারিক্কি চালে চিরো বলল, ”এই দেখেই কি তুই মুগ্ধ হয়েছিস?”
”হওয়ার এটাও একটা কারণ। মানুষের চরিত্র নানা ঘটনার মধ্য দিয়েই তো ধরা দেয়।”
”এসব ব্যাপার কিছুদিন থাকে, তারপর শেষও হয়ে যায়।”
”কিন্তু এক্ষেত্রে তা হবে না। এটা খাঁটি ব্যাপার।”
চিরো আবার মনে করার চেষ্টা করল নন্দাকে। বেচারা। কীভাবে ওকে রক্ষা করা যায়।
”ব্যাপার যখন শুরু করেছিসই তখন চালিয়ে যা। চিত্রাকে তো তুই-ইয়ে ভাবে, মানে গার্লফ্রেন্ড হিসাবে তো রাখতে পারসি। খাঁটি কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত না হওয়া পর্যন্ত এইভাবে চালা।”
”সাহেবরা যাকে বলে মিস্ট্রেস?”
চিরো সামান্য ইতস্তত করল জবাব দিতে। কয়েক বছর বিদেশে বাস করে নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে তার অনেক ধারণাই ঢিলে হয়ে গেছে। লক্ষ্যে পৌঁছতে যে-কোনো পথ ধরে চলতে তার আপত্তি নেই। চিত্রার সঙ্গে কিছুদিন প্রেমের ব্যাপার চালিয়ে অরোর যদি মোহ কেটে যায়, ক্ষতিটা কী! এইরকম ভেবে নিয়ে সে বলল, ”যদি তাই তোর মনে হয়, তাহলে মিস্ট্রেসই ধরে নে। আমি শুধু, এটাই বলতে চাই যে, নিশ্চিত হবার জন্য সময় দরকার। ব্যাপারটা গুরুতর, অরো, খুবই গুরুতর। নন্দাকে তুই প্রচণ্ড আঘাত দিতে যাচ্ছিস। তার আগে তুই চিত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নে। তোর জীবনের পক্ষেও এটা গুরুত্বপূর্ণ।
”আমি নিশ্চিত।”
”অনেক সময় ছুটেও যায়।”
”সেরকম ব্যাপার এটা নয়। সারা জীবন আমি অপেক্ষা করে আছি যার জন্য, আমার মনে হচ্ছে সেইরকম জিনিসই যেন অনুভব করছি।”
”শুনেছি, এইরকমই মনে হয় প্রথম প্রথম।”
অরবিন্দর মুখ থমথমে হয়ে উঠল। জবাব দিল না।
চিরো বিয়ারে মন দিল। ঘরের মধ্যে একটানা গুঞ্জনের মাঝে উচ্চচকণ্ঠে ছিটকে উঠছে ভোজনে ব্যস্ত টেবল থেকে। পাশের টেবলের বৃদ্ধ দম্পতি ও যুবকটি কাঠের মতো মুখ করে, প্লেটের দিকে তাকিয়ে অতি ধীরে খাদ্য চিবোচ্ছে। চিরো ভাবল, এরা কেউ টেরও পাচ্ছে না, এই টেবলে শান্ত প্রকৃতির, ভদ্র এবং নিঃস্বার্থপর একটা লোক এখন এক দাম্পত্য বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তৈরি হচ্ছে যার সঙ্গে ওর মানসিক গঠনের প্রতিটি তন্তুরই বিরোধ রয়েছে। এবং এইরকম ক্ষেত্রে চরিত্রের সঙ্গে অমিল কোনো কাজ করার জন্য যখন কেউ চিন্তায় ডুবে যায় তখন সে মানসিক আবর্তের মধ্যে পড়ে। মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াটি খুব বেশি হয় না যেহেতু তাদের চরিত্রে টানাপোড়েন সহ্য করার ক্ষমতাটা বেশি।
অরবিন্দের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চিরো জেনে গেল, অরো গোলমালের মধ্যে পড়ে গেছে। তারই অন্যতম লক্ষণ, পোটাটো চিপসগুলো একটি একটি করে সে আঙুল দিয়ে ভেঙেছে। ভাঙা টুকরোগুলো আঙুলের ডগা দিয়ে গুঁড়িয়েছে এবং ইতিমধ্যেই সারা প্লেটটাকে গুঁড়ো চিপসে ভরিয়ে ফেলেছে। এইসব লক্ষ্য করতে করতে চিরো হঠাৎ বিরক্তবোধ করল সারা ঘরের লোকদের প্রতি।
অবশেষে অরবিন্দ বলল, ”মুশকিলটা কি জানিস। নন্দা কখনোই আমাকে ভালোবাসেনি। কোনোদিনই না।”
”স্ত্রীদের সম্পর্কে এটা কোনো নতুন আবিষ্কার নয়। কিন্তু নন্দা আর পাঁচটা মেয়ের মতোও নয়।” বিরোধিতা না করার সিদ্ধান্ত ভুলে গিয়ে চিরো বলল, ”এরকম অ্যাট্রাক উইটি, বুদ্ধিমতী, সংসারী মেয়ে তুই ক’টা পাবি? সবথেকে বড়ো কথা, মায়া-মমতা আছে ওর মধ্যে। অরো, আমি এটা বুঝছি না, এর বেশি আর কি তুই চাস?”
অরবিন্দ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। ওর চোখের পিছনে বিদ্রূপাত্মক বা বিভ্রান্তিকর হাসিটি নেই। ঝকঝক করছে এখন কৌতূহল ও উত্তেজনায়।
”কি চাস?” চিরো আবার বলল।
অরবিন্দ বুক ভরে শ্বাস টানল। যখন কথা বলল, ওর ভরাট মজা অচঞ্চল স্বরের অন্তরালে এমন একটা অসহায়তা চিরো অনুভব করল যা আগে কখনো তার কানে ধরা পড়েনি। চাকরি থেকে অবসর নেবার পর বিদায়-সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে অবসরপ্রাপ্তের গলা যেভাবে ধরে আসে, অরবিন্দের কণ্ঠে তাই ছিল।
”আমি সারাজীবন শুধু সেই রমণীর স্বপ্নই দেখেছি চিরো, যে সত্যিকারের প্রেমে আমাকে অভিভূত করেছে। হয়তো তোর মনে হবে ছেলেমানুষি। এসব কথা কাউকে আগে বলিনি। অন্তত চিত্রাকে বলার আগে নয়। হয়তো স্কুলজীবনে সবাই পিছনে লাগত বলেই মুখচোরা স্বভাব পেয়েছি। তুই তো সব জানিসই। আমাকে তখন দেখতেও ছিল হাস্যকর রকমের, অনেকেই ‘ডোনাল্ড ডাক’ বলতো। হয়তো সেজন্যই স্বপ্নটা আরও বেশি করে দেখতাম, কারণ আমার মতো চেহারার লোকের প্রেমে কোনো মেয়ে পড়বে, এটা আমি বিশ্বাস করতাম না। স্বপ্নটা সেজন্য খুবই দরকার ছিল। ছেলেমানুষি মনে হচ্ছে কি তোর?”
”মনে হচ্ছে না,” কোমলস্বরে চিরো বলল। ”এসব ব্যাপার একদমই যে বুঝি না, তা নয়।”
চিরো অন্যদিকে তাকাল। তার মুখের ওপর অরবিন্দের চাহনিটা সে অনুভব করছে। কিন্তু সে জানে, মুখের ক্ষীণতম ভুল অভিব্যক্তি, অস্ফুট একটি ভুল স্বর, অরোর মুখ বন্ধ করে দেবে। যখন কেউ তার ভালোবাসার মতো অন্তরের গভীরতম অনুভবের কথা অপরকে বলতে থাকে তখন শ্রোতাকে প্রতিটি পদক্ষেপ সাবধানে ফেলতে হয়, নিশ্বাস প্রায় বন্ধ করে। নয়তো সে শামুকের মতো গুটিয়ে ভিতরে ঢুকে যাবে।
