”আমি তোকে ডেকে এনেছি, সুতরাং অর্ডার যা কিছু আমিই দেব।”
অরবিন্দর চোখের পিছনে হাসিটা দেখে চিরো জ্বালা বোধ করে বলল, ”খাদ্য ভক্ষণের কোনো ইচ্ছে নেই।”
”কেন, ভুঁড়ি কমাবার জন্য?”
টেবিলে পোটাটো চিপসের প্লেটটা রেখে, ওয়েটার বিয়ার ঢালছে গ্লাসে। চিরো সেইদিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ”কীজন্য ডেকেছিস?”
পোড়া দেশলাই কাঠি দিয়ে অ্যাশ-ট্রের একটা সিগারেট খণ্ডকে খোঁচাতে খোঁচাতে আরো বলল, ”বলছি।”
চিরো দীর্ঘ চুমুক দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। ঘরটা ভরে রয়েছে। বেশিরভাগই তার মনে হল ব্যবসায়ী। এক প্রান্তে টেবিল জোড়া দিয়ে জনা-দশেক লোক ভোজনে ব্যস্ত। পাশের টেবলে বৃদ্ধ পারসি-দম্পতির সঙ্গে একটি যুবক। কথাবার্তা কমই হচ্ছে।
”নন্দাকে তোর কেমন লাগে? মানে, ওকে পছন্দ করিস?”
হঠাৎ এমন একটা প্রশ্নের জন্য চিরো বিন্দুমাত্রও তৈরি ছিল না। ”খুব ভালো লাগে। দারুণ মেয়ে। কেন? পছন্দ তো নিশ্চয়ই করি।”
অরবিন্দ মাথা নাড়াল, যেন এই উত্তরই আশা করেছিল, এই উত্তর সে নিজেও দিত। চিরো বিব্রত বোধ করল। বন্ধুর স্ত্রী সম্পর্কে যাই ভাবি না কেন, পছন্দ করি না, এ কথাটা কেউ কি বলতে পারে!
”ব্যাপারটা কী?”
”আমিও ওকে পছন্দ করি, আর সেটাই মুশকিলে ফেলেছে।”
”বহুলোকই তাদের বউকে পছন্দ করে। শুনেছি এটা নাকি সর্দিকাশির মতো জ্বালাতনে ব্যাপার। অবশ্য কিছুদিন থেকে চলে যায়।”
হাসল না অরবিন্দ। মুখটা পাশের টেবলের দিকে ফিরিয়ে বলল, ”নন্দাকে আমি ঠিক করেছি ছাড়বো, ডির্ভোস করতে চাই। চিরো, এটা তোকে বলা আমার উচিত। এটা তোর জানা দরকার। তুই আমার একমাত্র বন্ধু, আমাদের দুজনকে ছোটো থেকেই দেখছিস।”
চিরো বিয়ারের গ্লাসটা ধীরে ধীরে মুখে তুলল আচমকা ধাক্কাটা সামলাবার জন্য। কিন্তু কোনোভাবেই বিস্ময় প্রকাশ করল না। এটা তার বহুবিধ গর্বের একটি। গ্লাস খালি করে টেবিলে রাখল। নিজেই বোতল থেকে বাকি বিয়ারটুকু ঢালতে ঢালতে যথাসম্ভব সহজ স্বরে বলল, ”বটে, তা কারণটা কী?”
”কারণ আমি সুখী হতে চাই।”
”ভালো কথা, যুক্তিপূর্ণ কথা।”
অরবিন্দ ওয়েটারকে আর একটা বোতল আনতে ইশারা করল।
”মেয়েটির নাম কী?” এই বলে চিরো গ্লাসটা তুলল।
”কার নাম কী?”
চিরো হাসল। পাঁয়তারা করছে। অরো জানে তাঁর পাঁয়তারা ধরা পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটার দিকে এগোবার এটাই চিরাচরিত পদ্ধতি।
”যে মেয়েটির প্রেমে তুই পড়েছিস। দেখেছি কি?”
”চিত্রা, চিত্রা ঘটক। তুই ওকে দেখিসনি।”
”তোকে আর নন্দাকে যতটুকু দেখেছি, তাতে এটুকু বুঝেছি তোরা অসুখী নোস। বরং যে ক’জন দম্পতি দেখেছি তাদের মধ্যে তোদেরই সবথেকে সুখী মনে হয়েছে।”
কথা না বলে অরবিন্দ কাঠি দিয়ে সিগারেট খোঁচাতে লাগল। চিরোর মনে এই সময় কয়েকবার দপদপ করে উঠল নন্দার অবয়ব। তার আচরণ, কথা বলার ভঙ্গি, হাসির শব্দ। চমৎকার মেয়ে নন্দা, সবথেকে বড়ো গুণ বুদ্ধিমতী, হৃদয় আছে, খাটিয়ে, চনমনে। এত বছর বিয়ে হওয়া সত্ত্বেও শরীরে আকর্ষণ জিইয়ে রাখতে পেরেছে। ঠিকই বলেছি, চিরো ভাবল, ওকে নিশ্চয়ই পছন্দ করি। অরোও মিথ্যে বলেনি, এখনও পছন্দ করে। তাহলে ও অসুখী কেন! হয়তো এই চিত্রা মেয়েটি ফুরফুরে চটকদার ধরনের। তাছাড়া, দাম্পত্য জীবনের এমন একটা সময়ে অরো হাজির হয়েছে যখন স্বামীরা বদল চায়। একঘেয়েমির চড়ায় ক্ষীণ হয়ে আসা মনের গাঙে জোয়ার চায় আবার বেগবান হয়ে ওঠার আশায়। ওরা এই সময়টায় বিপজ্জনক, অরক্ষিত থাকে। মেয়েটা তাক বুঝেই ওকে ধরেছে। অরোর থেকে বহুগুণে বুদ্ধিমান, ঠান্ডা প্রকৃতির লোকেদেরও তো সে দেখেছে এই সময় টসকাতে। চিরো ঠিক করল, এখন অরোর যা মানসিক অবস্থা তাতে তর্কাতর্কির পথে গিয়ে ফল হবে না।
”দেখতে কেমন, সুন্দরী?”
”আমার কাছে তো বটেই। অন্যে হয়তো নাও মনে করতে পারে।”
যাতে কোনোরকম বিরোধিতার আভাস না ফোটে, সাবধানে সহজতা ফুটিয়ে চিরো বলল, ”যদি গভীরভাবে অনুভব করে থাকিস তাহলে যা ভালো বুঝিস তাই কর। তবে নন্দা খুব আঘাত পাবে।”
”জানি।”
দুজনেই চুপ করে রইল। ওয়েটার দ্বিতীয় বিয়ার বোতলটি এনেছে।
”কতদিন মিত্রার সঙ্গে আলাপ?”
”ওর নাম চিত্রা।”
”ও, হ্যাঁ। চিত্রা।”
”বোম্বাই যাবার আগে ফিল্ম স্টুডিয়োয় একটা-দুটো কথা হয়েছিল মাত্র। আলাপ মাস ছয়েক আগে।”
”অ্যাকট্রেস?”
”হ্যাঁ, এখন স্টেজে। অ্যামেচার গ্রুপগুলোয় করে, ভালোই করে। তাছাড়া অ্যাডভয়েসেও এখন কিছু কিছু কাজ করছে। গানেও গলা আছে।”
”ফিল্মে সুবিধে করতে পারেনি।”
”ওর প্রথম বইয়ে আমি এডিটরের অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলাম। লাঞ্চ ব্রেকে ডিরেক্টর সনৎ রায়ের পাশে বসে খাচ্ছিল চিত্রা, সেইসময় চিত্রার গায়ে হাত দিচ্ছিল ভদ্রলোক। চিত্রা একটু জোরে, রূঢ় স্বরে আপত্তি জানায় অনেকের উপস্থিতিতেই। ও ছিল নায়কের বোনের রোলে। নায়ক চড় মারবে ওকে, সেই টেকটা ছিল তার পরেই। শটটা পনেরোবার রি-টেক করাল সনৎ রায়। পনেরোবার চিত্রার গালে চড় মারল নায়ক বেশ জোরেই। চিত্রা একবারও আপত্তি করেনি, মুখে একটি যন্ত্রণার ভাঁজও পড়েনি। ডিরেক্টরের নির্দেশ মেনে সব কিছু করল। সেইদিন দেখছিলাম ওর মর্যাদাবোধ আর ব্যক্তিত্ব। সিনেমায় নামার জন্য কত মেয়ে হাঁ-হাঁ করে ঘুরছে, পর্দায় একবার মুখ দেখাবার সুযোগ পেলে শুধু গায়ে হাত কেন, অনেক কিছুই অ্যালাও করতে রাজি। চিত্রা মোটামুটি ভালো রোলই পেয়েছিল নিউকামার হিসাবে, কিন্তু ওইদিনই সে নিজের ফিল্মকেরিয়ার শেষ করে দেয়।”
