ধীর গম্ভীর গলাটি চিনতে তার মুহূর্তেকও দেরি হয়নি। সে চেঁচিয়ে উঠেছিল, ”অরো!”
”চিরো, বহু বছর পর। বোম্বাই ছেড়ে এসেছি মাস ছয়েক। তোর অফিসের কাছাকাছিই আছি, এন্টালিতে। রাতে চলে আয়, খাবি। নন্দা ভালোই রান্না করে।”
”ছ মাস! এতদিন খবর দিসনি রাস্কেল! তুই আর পালটালি না।”
এইভাবে হঠাৎ আবার ওদের পুরনো বন্ধুত্ব ফিরে এল। চিরো সময় পেলেই অরবিন্দের ফ্ল্যাটে যায়। হাসি, গল্প, হইচই-এর মধ্যে কিছু সময় কাটিয়ে আসে। অরবিন্দ আর নন্দাকে তার সুখীই মনে হয়। সন্তান হয়নি। এক গুজরাতিকে অংশীদার করে এবং তারই টাকায় রেডিয়ো-বিজ্ঞাপন ব্যবসা করছে অরবিন্দ, পার্ক সার্কাসে দুটো ঘর ভাড়া নিয়ে। নাম দিয়েছে ”অ্যাভয়েস।” ফিল্ম তৈরির ইচ্ছাটাও ছাড়েনি। তবে, আপাতত তার ইচ্ছা ডকুমেন্টারি ফিল্ম দিয়ে শুরু করার। কলকাতার ভোরবেলা এবং সন্ধ্যাবেলার তুলনামূলক স্টাডিকে সে বেছে রেখেছে বিষয় হিসাবে। শুরু করতে পারছে না টাকার অভাবে। অ্যাডভয়েস ভালো পসার করতে পারেনি এখনও। সেজন্য অরবিন্দ বিব্রত ও চিন্তিত।
নন্দা চমৎকার গৃহিণী। মধ্য-তিরিশ অতিক্রান্ত তবু লাবণ্যের কণামাত্রও ঝরেনি। চিরো একদিন বলেছিল, ”নন্দা তোমাকে ইটালিয়ান মেয়ে মনে হয়।”
ভ্রূ কুঁচকে নন্দা বলে, ”আগের দিন তো বলেছিলে সুইডিশ মেয়ে মনে হয়।”
অপ্রস্তুত হবার ভান করে চিরো বলে, ”বলেছিলাম নাকি। চেহারাটা যেরকম রেখেছো, তাতো ভূগোল-টুগোল কেমন গুলিয়ে যায়।”
নন্দা জবাব দেয়, ”ভূগোল যায় যাক, ইতিহাসটা ঠিক রেখো। বিয়ে যদি করো তো বাঙালি মেয়েই কোরো, আর করলে এখনি করো। কানের পাশে চুলগুলোর রঙ পালটাচ্ছে দেখেছো কি?”
”পেকেছে! এই তো সেদিন চল্লিশ হল! দ্যাখো তো কি মুশকিল, অকালপক্বতা আমার আর ঘুচল না। অথচ বয়সে বড়ো অরোর একটা চুলও পাকেনি।”
”পাকবে কী করে, ওর তো বাল্যকাল এখনও শেষ হয়নি। তাহলে বোম্বাই থেকে কি পাততাড়ি গুটিয়ে চলে আসতে হয়?” হাসতে হাসতে নিচুস্বরে বললেও নন্দার গলায় শেষ দিকে যে তিক্ততার ছোঁয়া লেগেছিল চিরোর কানে তা ধরা পড়েছিল। অরবিন্দ তখন ঘরের এককোণে সোফায় পা গুটিয়ে, তার ডকুমেন্টারি ফিল্মের স্ক্রিপ্টে মগ্ন ছিল। কিন্তু চিরো তখন বুঝতে পারেনি এই দম্পতির ভাগ্যাকাশে শীঘ্রই একটা কালোমেঘ জমবে এবং এখনকার এই রৌদ্রোজ্জ্বল, নিবাত দিনগুলি শুধু তারই আগের অবস্থা, সে বুঝতে পারেনি এতে তারও একটা ভূমিকা থাকবে।
চিরো অফিসের কাজে ব্যস্ত, সেই সময় অরবিন্দ টেলিফোন করে ওকে ‘গ্রিন ড্র্যাগনে’ দুপুরে খেতে ডাকল।
”তোর সঙ্গে দু-একটা কথা আছে।”
”হাতে একগাদা কাজ এখন, কাল বরং যাব।”
”আমার কথাটাও জরুরি। তোর জানা দরকার।” ভরাট গলাটা দ্বিধাগ্রস্ত মনে হল চিরোর।
”কি এমন যে, জানা দরকার?”
”এলে বলব। একা আলাদা বসে বলতে চাই। কাল নয়, আজই।”
অরবিন্দের মন্থর কঠিন স্বরের মধ্যে চিরো জরুরি তাগিদের আভাস পেয়ে কয়েক মুহূর্ত ভেবে বলল, ”বেশ, যাব।”
”ঠিক একটায়, ঢুকেই বাঁদিকে থার্ড-টেবিলে।”
”একটা নয়, সাড়ে বারোটা।”
”না একটায়, না হলে আসার মানে হয় না।”
”ব্যাপারটা কি বলতো?”
”ফোনে বলা যায় না।”
চিরোর কৌতূহল এবার সজাগ হয়ে আড়মোড়া ভাঙল। হাতের কাজগুলো সন্ধ্যা পর্যন্ত ফেলে রাখলেও ক্ষতি নেই, এই ভেবে সে বলল, ”বেশ একটাতেই। দেখব কী তোর এমন কথা আজই না শুনলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে।”
”হ্যাঁ হয়ে যাবে। তোর কাছে না হোক আমার কাছে এটা বিরাট ব্যাপার। তোকে সব বলব, তোর মতামত নেব। তাহলে একটায়।”
.ঠিক একটাতেই চিরো তার মোটর থেকে নেমে গ্রিন ড্র্যাগনে ঢুকল। বামে তৃতীয় টেবিলে অরবিন্দ আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল, হাত তুলল। টেবিলটার দিকে এগিয়ে যাবার সময় চিরোর মনে হল, অরোর নম্র চওড়া মুখের হাসিটা আজও বদলায়নি, শরীরটা এত বছরেও সেই রকম রুগণ রয়ে গেছে, ব্রহ্মতালুর চুলগুলোও। তবে ইদানীং বাইরের লোকের সামনে আগের থেকে একটু বেশি চুপচাপ থাকে।
”অরো, তোকে দেখেই বুঝতে পারি আমি কতটা মোটা হয়েছি। তোরা স্বামী-স্ত্রী কি করে যে একই রকম চেহারা রেখেছিস! নিচু হয়ে জুতোর ফিতে বাঁধতে কষ্ট হয় বলে এখন বেশিরভাগ সময় চটি পরি।”
মুখোমুখি বসে চিরো কথা বলতে বলতে অরবিন্দের প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরিয়ে ফেলল। ধোঁয়া ছেড়ে মাথা ঘুরিয়ে পিছনে দাঁড়ানো ওয়েটারকে চোখের ইশারায় ডাকল।
”একটা বিয়ার।” এই বলে সে অরবিন্দের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। ”তোর জন্য কোক?”
”আমি এখন কিছু খাব না।”
সিগারেট প্যাকেটটা টেনে নিয়ে অরবিন্দ আঙুল দিয়ে টেবিলের ওপর ঘোরাতে লাগল। চিরো বুঝল, আরও কিছু ও যোগ করবে বাক্যটির সঙ্গে। ওর কথাবলার প্রায়-ক্লান্ত, মন্থর ভঙ্গিটার সঙ্গে ইদানীং ও যেন ইচ্ছে করেই জুড়ে দিয়েছে বাক্যের মাঝে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। যেন কিছু চিন্তা করে নিচ্ছে এবং সেই চিন্তা করার সময়টিতে সে শ্রোতার দিকে তাকাবে অদ্ভুত একটা হাসি নিয়ে। হাসিটা ঠোঁটে থাকে না, চোখেও নয়। থাকে চোখের পিছনে। ভাবখানা, যেসব কথা শুনছে তার সবটাই বোকামিতে ভরা এবং সেটা তাকে মজা দিচ্ছে। চিরোর মনে হয়, এটা ওর বানানো। সম্ভবত বোম্বাই থেকে ব্যর্থ হয়ে এবং এখন বিরক্ত গুজরাতি পার্টনারকে যথেষ্ট লাভ দেখাতে না পেরে, নিজের চারপাশে আত্মরক্ষার পাঁচিল তোলার জন্য কথা বলার এই অভ্যাসটা রপ্ত করেছে।
