তালতলায় সে একটি মানুষের জন্য কখনো কখনো কষ্টবোধ করেছে, তিনি স্বল্পবাক, নিস্পৃহ কনেপিসে। দু-একবার সে চিরোকে বলেছিল, ”এমন অবহেলা উপেক্ষার মধ্যে এভাবে বেঁচে থাকা, এমন ঘাড়গুঁজে নিজের আত্মাকে জাঁতাকলে পিষে মারা, আমি সহ্য করতে পারি না।” কনেপিসি স্কুলে বেরোবার পর একদিন তিনি ঘরে যখন মুখ নিচু করে চোখ বুজে সেতার বাজাচ্ছিলেন, অরবিন্দ তখন দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। সে শুধু দেখেছিল, এক একটা টঙ্কারের রেশ কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎপৃষ্ঠের মতো ওর দেহটি কুঁকড়ে যাচ্ছে, আত্মার গভীর থেকে একটা যন্ত্রণা বেরিয়ে আসার জন্য যেন ছটফট করছে সারা দেহে। বার করে দেবার পথ খুঁজে না পাবার খেদে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার সেতারের এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে আঙুল চালিয়ে পরবর্তী ধ্বনিটিকে গভীরভাবে শুনছেন।
একসময় হঠাৎ চমকে বাজনা বন্ধ করে তিনি তাকান। অরবিন্দকে দেখে বিস্মিত হবার পর স্মিত হেসে আবার বাজনা শুরু করার আগে অস্ফুটে বলেছিলেন, ”পুরিয়া-কল্যাণ, অসময়েই বাজাচ্ছি।”
কিছুক্ষণ পর বাজনা থামিয়ে বলেন, ”বাইরে কেন?”
”এই বেশ আছি। এসব আমি বুঝি না।” তারপর অরবিন্দ ভারি গলায় মৃদুস্বরে বলে, ”আপনি তো কনফারেন্সে বাজাতে পারেন।”
হেসে মুখ নামিয়ে উনি আঙুল দিয়ে তারগুলি মাজতে মাজতে অন্যমনস্কের মতো বলেন, ”আসরে…..না, সময় হতে অনেক বাকি।”
কনেপিসের বাকি সময় কখনোই পূর্ণ হয়নি। এর এগারো বছর পর অরবিন্দ যখন বোম্বাইয়ে এক ফিল্ম পরিচালকের তিন নম্বর সহকারী তখন ট্রামের ধাক্কায় পথেই তিনি মারা যান। তার দু-মাস আগেই উচ্চচ রক্তচাপের জন্য মারা গেছিলেন কনেপিসি। স্ত্রী মারা যাবার দিনচারেক পরেই উনি, যে মামলাটি জেতা হয়নি এবং কোনোদিনই জেতা সম্ভব ছিল না, সেই মামলার জন্য সংগৃহীত অকাট্য প্রমাণাদির স্তূপ রাস্তায় রেখে আগুন ধরিয়ে দেন।
যুক্তিনির্ভর ঠান্ডা মাথার নন্দা যাকে বিয়ে করে, তার কৈশোর পটভূমি মোটামুটি এইরকম ছিল। হাসি পাবার মতো অনেক ব্যাপারই ছিল, কিন্তু তা থেকে মজাটুকু বার করে উপভোগ করার পক্ষে অরবিন্দের বয়স ছিল অপরিণত। তাহলেও খুব পীড়াদায়ক ছিল না তার স্কুল ও কলেজের দিনগুলি। তালতলায় সে পেয়েছিল নিরাবেগ শীতল, অন্যমনস্ক সহৃদয়তা, অথচ আকাঙ্ক্ষা ছিল গভীর উষ্ণ আবেগভরা দরদের, বশীভূতকারী মনোযোগের। নন্দা তাকে যা দিতে পারে তার থেকেও বেশি কিছুর।
চিররঞ্জন হামবুর্গে এক বিরাট ছাপা ও প্রকাশনা সংক্রান্ত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিশ থাকে দু’বছর। তারপর আরও দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করে যন্ত্র ও ব্যবসায়ের জটিল ব্যাপারগুলি জেনে নিয়ে দেশে ফেরে। বিদেশে থাকাকালে অরবিন্দের সঙ্গে তার চিঠি লেখালেখি ছিল। চিঠি মারফতই সে জানতে পারে অরবিন্দ ও নন্দার মধ্যে প্রণয় সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু বিস্মিত হয়েছিল বিয়ের খবর দেওয়া চিঠি পেয়ে। নন্দার মতো রসিকা, বুদ্ধিমতী, আকর্ষণীয় মেয়ে কী খুঁজে পেল ওই কিম্ভূতমুখো অরবিন্দের মধ্যে? শান্ত, রুচিশীল, মুগ্ধ ব্যবহার এবং একটি সুরেলা গভীর গলা, এছাড়া আর কিছুই তো ওর নেই! পড়াশুনোয় মাঝারি, অর্থ-সম্পদে আরও মাঝারি-পৈতৃক একখণ্ড জমি ও কিছু টাকা। বিস্ময়কে সংযত করে চিরো লেখে ”আরও, আমি খুশি হয়েছি নন্দার মতো একটি ভালো মেয়েকে বিয়ে করেছিস বলে। নন্দাকে অনেকদিন ধরেই, যখন ও ক্লাস সেভেনে বুবুর সঙ্গে পড়ত তখন থেকেই জানি। ওরা অবস্থাপন্ন। এখন কিছুটা সচ্ছল থাকার মতো রোজগারের কথা তো তাকে ভাবতে হবে।”
অরবিন্দ জবাব দিয়েছিল : বিয়েটা যে কেন করছি তা আমি নিজেই ভালোভাবে বুঝতে পারছি না। হঠাৎ এক সন্ধ্যায় আমরা আউট্রাম ঘাটে বসে কথা বলতে বলতে বিয়ের প্রস্তাব দিই। নন্দা একটু ইতস্তত করে রাজি হয়ে গেল। কেন যে বললাম, কেন যে রাজি হল, জানি না। চিরো, আমি বোধহয় ভুল করছি। কিন্তু শোধরাবার এখন আর উপায় নেই। নন্দা হয়তো আমাকে পছন্দ করে কিন্তু ভালোবাসে না। প্যাশনেট কথাটার ভদ্রগোছের বাংলা নেই, থাকলে বলতাম নন্দা তাই। ওর বোধ বা অনুভূতি শুধু দেহের উপর টলমল করে, চুঁইয়ে ভিতরে যায় না। ভাবার মতো এটাই হচ্ছে পয়েন্ট। ও জীবন্ত হয় শুধু রক্তমাংসের ব্যাপারগুলোয় আর এটাই হয়তো আমার সমস্যা হবে। সচ্ছ্বল থাকা বা না থাকা আমার সমস্যা নয়। বোম্বাই ফিল্ম মহলে একবার সেঁধোতে পারলে টাকার অভাব হবে না। আমি এখনও জানি না, কতটা কুরুচি অশিক্ষা নির্বুদ্ধিতা এজন্য অর্জন করতে হবে। না পারলে কলকাতায় ফিরে আসব। কিছু টাকা আর জমিটা তো রয়েছেই।”
অরবিন্দকে পাঁচ বছর পর কলকাতায় ফিরে আসতে হয়। বোম্বাইয়ে সে ব্যর্থ হয়েছিল। দুটি ছোটো ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি করা ছাড়া কিছু তার দ্বারা সম্ভব হয়নি।
চিররঞ্জন বিদেশ থেকে যখন কলকাতায় ফেরে, অরবিন্দ ও নন্দা তখন বোম্বাইয়ে। ফিরে প্রেস এবং ব্যবসার কাজে সে এত মগ্ন হয়ে যায় যে, বছর চারেক অরবিন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেনি। চিঠি এলে দায়সারা জবাব দিয়েছে বা দেয়নি। বোম্বাই থেকেই চিঠি আসা কবে যেন বন্ধ হয়ে যায়। যাতে কাজের সঙ্গে দিনরাত ওতঃপ্রোত থাকতে পারে তাই বাগবাজারের বাড়ি ছেড়ে সে ফ্ল্যাট নিয়েছে পার্ক সার্কাসে তার নতুন প্রেসবাড়ির কাছাকাছি। কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে চিরো যখন হাঁফ ছাড়ার সময় পায় তখনই একদিন তার অফিসে ফোন বেজে ওঠে।
