অরবিন্দের আত্মীয়স্বজন সংখ্যা যথেষ্ট থাকলেও যোগাযোগ ছিল একমাত্র তার রাঙাপিসি তুষারকণা ও কনেপিসি হিমকণার সঙ্গে। ওরা দুজন তার বাবার খুড়তুতো বোন। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়সি রাঙাপিসি বিধবা, নিঃসন্তান, এবং গুটি আষ্টেক বেড়ালসহ তালতলায় একটি বাড়ি, দু’ঘর ভাড়াটে ও কিছু কোম্পানির কাগজের মালিক। একক জীবন স্বচ্ছন্দে কাটিয়ে যাবার পক্ষে যথেষ্ট। কনেপিসি একটি স্কুলে ভূগোল ও বাংলা পড়ান। চল্লিশ স্পর্শ করামাত্রই বিয়ে করেছেন। স্বামীসহ দিদির বাড়িতেই থাকেন। কনেপিসেমশাই, শোনা যায় রাজাশাহির এক জমিদার পরিবারের বংশধর। একটি সেতার ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত আর কোনো সম্পত্তি নেই। প্রতিদিন ঘণ্টাচারেক রেওয়াজ ছাড়া এমন আর কিছু করেন না যাতে অর্থাগম হতে পারে। মৃদুভাষী মানুষটি সারাদিন স্ত্রীর সঙ্গে চার-পাঁচটির বেশি বাক্য বিনিময় করেন না। শোনা যায়, বিমাতাপুত্ররা চক্রান্ত করে তাঁকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছে।
বাবা-মা মারা যাওয়ার পর অরবিন্দ বোর্ডিং ছেড়ে তালতলায় রাঙাপিসির বাড়িতে আশ্রয় পায়। সদ্য গড়ে ওঠা কলকাতার দক্ষিণ শহরতলিতে তিনকাঠা জমি এবং হাজার পনেরো টাকার ক্যাশ সার্টিফিকেট ছাড়া বাবা আর কিছু রেখে যাননি। পিসিবাড়ির চালচলন ও চিন্তাভাবনা একটু অদ্ভুত ধরনের। তার মতো নিঃসঙ্গ এবং অনুভূতিপ্রবণ ছেলে এমন এক বয়সে এখানে এসে পড়ে যখন বাইরের জগৎ মনের উপর গভীর ও স্থায়ী ছাপ ফেলতে শুরু করেছে। জীবনমাত্রেই ভালোবাসা চায়। এমনকি গাছপালাও সূর্যরশ্মির তপ্ত আদর পাবার জন্য ঊর্ধ্বে শাখা মেলে। অন্যদের থেকে এটা বেশি দরকার হয় শিশু ও কিশোরদের। নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চিন্ত দরকারি বটে কিন্তু ভালোবাসা বা আদরের প্রয়োজনকে তা মেটাতে পারে না। এর জন্য অরবিন্দের মনে যে প্রবল তৃষ্ণা, তা পিসিদের আলগা নিরুত্তাপ স্নেহ মেটাতে পারেনি। পরবর্তী জীবনে ভালোবাসা পাবার জন্য যে আকুতি ওর মধ্যে দেখা দেয়, তার কারণ, সম্ভবত বাল্যজীবনের এই অভাবটুকু।
তালতলা বাড়ির মালিক যদিও রাঙাপিসি কিন্তু তিনি থাকতেন একতলায় অরবিন্দ ও বেড়ালদের নিয়ে। বেড়ালগুলির কারুর রঙ কালো, অথবা খয়েরি কিংবা সাদা। দু-তিনটির দেহে নানাবিধ রঙের সম্মেলন থেকে অনুমান করা যায় তাদের পূর্বপুরুষদের চিত্ত কত প্রশস্ত ছিল। বাড়ির সেরা দোতলায় দক্ষিণ-পূর্বের ঘরটিতে থাকতেন কনেপিসিরা। সারা বাড়িতে একমাত্র এই ঘরটার দেয়ালেই সেতারের শব্দতরঙ্গ সুরের বিশুদ্ধতা বজায় রেখে নাকি প্রতিধ্বনিত হয়, কনেপিসির এই যুক্তির বিরুদ্ধে তার স্নেহপ্রবণ সহজেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন। দোতলায় পিছনের অংশে ভাড়াটে ছিল এক জীবনবিমার দালাল ও তার স্ত্রী এবং তিলতলায় এক অধ্যাপক দম্পতি। ভাড়াটেরা দুইবোনকে এড়িয়ে চলত।
দিদির বাড়িতে কনেপিসি তাঁর স্বামীকে নিয়ে থাকতেন বিনাভাড়ায়। ‘স্বামীকে নিয়ে’ বলাই যুক্তিযুক্ত, কেননা স্ত্রীকে নিয়ে থাকার মতো সাহস ও ব্যক্তিত্ব ভদ্রলোকের ছিল না। বাড়ির ট্যাক্স বা ইলেকট্রিক বিলের অংশ বহনের মতো সামান্য ব্যাপারেও কনেপিসি মাথা ঘামাতেন না। এর কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, অদূর ভবিষ্যতে তাঁর স্বামী জমিদারির মালিক হবেন এবং বাকি জীবনটা তারা সবাইকে নিয়ে সুখে কাটিয়ে দেবেন। এই বিশ্বাসটি তিনি বড়ো বোনের মধ্যেও সঞ্চার করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু সেই জমিদারি এবং তাঁর মালিক হওয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট কাজ-স্বামীর বিমাতা ও তার পুত্রদের বিরুদ্ধে একটি মামলা রুজু করা ও সেটি জেতা। দুই বোনের মধ্যে এই অজাত অথচ আসন্ন মামলাটি নিয়ে প্রতিদিনই শলাপরামর্শ হত। একের পর এক উকিলের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে দুজনেরই ধারণা হয়েছিল ঈশ্বর তাদের ধৈর্য পরীক্ষা করছেন। পাশ করলেই একটি ভালো উকিল, অর্থাৎ যার টাকার খাকতি নেই এমন একজনকে পেয়ে যাবে।
অরবিন্দকে ওরা মামলার গূঢ় ব্যাপারগুলি বোঝাবার চেষ্টা করতেন। মৃদু, শান্ত স্বভাবের অরবিন্দ চুপ করে শুনত আর মাঝে মাঝে মাথা নাড়ত। তাকে শুনতে হত কী কী সাক্ষ্য, দলিল ইত্যাদি দ্বারা জজকে জলের মতো বুঝিয়ে দেওয়া যাবে কী গভীর জঘন্য ভয়ঙ্কর চক্রান্ত হয়েছে কনেপিসেকে জমিদারি থেকে বঞ্চিত করার জন্য। তাকে শুনতে হত, বৈধ ও অবৈধ বিয়ের পার্থক্য, অনেক কিছু দেখেছে ও শুনেছে এমন পুরোনো চাকর এবং কুলপুরোহিতের কথা, অনেক কিছু জানে এমন নায়েবের কথা এবং ওরা সবাই নাকি সাক্ষী দিয়ে বলতে রাজি এটা বা ওটা ঘটেনি বা ঘটেছিল। বাগবাজারে চিরোদের বাড়িতে গিয়ে প্রায়ই তার দিনের বেশিরভাগ সময় কাটানোর এটাও একটা বড়ো কারণ। তার বিরক্তি, ক্ষোভ, অনিচ্ছা বা মানসিক কথা কাউকে সে বলতে পারত না এবং পরবর্তী জীবনেও পারেনি শুধু একমাত্র বন্ধু চিরোকে ছাড়া।
অথচ মানুষ হিসেবে পিসিরা অনাড়ম্বর, সহৃদয় ও নির্বিরোধী। কিন্তু ইহলৌকিক নানা ব্যাপারে তারা এতই মগ্ন ছিলেন যে, পিতৃমাতৃহীন একটি কিশোরের যে ধরনের মমতাভরা ভালোবাসা পাওয়া দরকার তা দেবার মতো সময় ওদের ছিল না। কোম্পানির কাগজ, বেড়াল, ভাড়াটে এবং মামলার তোড়জোড় নিয়ে পিসিরা এতই ব্যস্ত থাকতেন যে, অরবিন্দের জন্য হৃদয়ের গহনে বাৎসল্যের মায়াময় কক্ষটির দরজা খোলার কথা তারা ভেবে উঠতে পারেননি। চিররঞ্জন পশ্চিম জার্মানি রওনা হবার আগে পর্যন্ত, অরবিন্দ যখন তাদের বাড়িতে যেত তখনই চিরোর বোনের বন্ধু নন্দার সঙ্গে তার সঙ্গে পরিচয় এবং পরে বিয়ে হয়। তখনই সে ঠিক করে বিরাট ফিল্ম ডিরেক্টর হবে। শিল্প ছাড়া কারুর কাছেই আত্মসমর্পণ করবে না এবং টালিগঞ্জের স্টুডিয়োগুলিতে যাতায়াত শুরু করে কলেজ যাওয়া বন্ধ করে।
