গিরি এগোতে শুরু করল। পুলিশ তালা ভেঙে মোহনকে বার করবে। তার এক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাবে মোহনের বাড়িতে। সেখানে থেকে গ্যারাজে, কারখানায়। বসন্তের দাগ কানা মেয়ের খোঁজ পেতে পাঁচ মিনিটও সময় লাগবে না।
তালা খুলে গিরি ফ্ল্যাটে ঢুকল। রুনু এখনও আসেনি। আলো জ্বালল না। বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এখন সে ক্লান্তি বোধ করছে। একটু গরম চা পেলে ভালো হয়। আগামীকাল চকোলেট কিনতে হবে, এটা মনে পড়তেই সে রেলিংয়ের জাফরিতে হাত বুলোল।
রুনু আসছে অফিস থেকে। অভ্যাস মতো হাত তুলতে গিয়ে সে বুঝতে পারল অন্ধকারে রুনু তাকে দেখতে পাবে না।
করুণাবশত
করুণাবশত – মতি নন্দী – উপন্যাস
অরবিন্দের বাবা-মা যখন ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা গেলেন তখন সে হাজারিবাগের কাছাকাছি একটি মিশনারি আবাসিক স্কুলের ছাত্র। ওর বাবা ছিলেন ভারত কনস্ট্রাকশন নামে এক ঠিকাদারি সংস্থার ইঞ্জিনিয়ার। সারা ভারত ঘুরে ঘুরে ব্রিজ, বাঁধ, টানেল ইত্যাদি তৈরির কাজে নিযুক্ত থাকায় ছেলেকেও বাবার সঙ্গে ঘুরতে হচ্ছিল। লেখাপড়া তার ফলে এগোচ্ছে না দেখে তিনি স্থির করলেন ছেলেকে কোনো বোর্ডিংয়ে রাখবেন। লাহোর থেকে পুনা এবং সেখান থেকে সেরাইকিলা হয়ে জাহাজের ইয়ার্ড তৈরির কাজে বিশাখাপত্তনমে আসার আগেই তিনি ছেলেকে বিহারের এই বোর্ডিং স্কুলে রেখে যান।
বয়স অনুযায়ী অরবিন্দের লেখাপড়ার ভিতটি মজবুত ছিল না, তাই দু ক্লাস নিচেই তাকে ভর্তি করা হয়। বয়সে ছোটো ক্লাসের ছেলেদের সঙ্গে সে নিজেকে খাপ খাওয়াতে অসুবিধা বোধ করে গুটিয়ে থাকত। অরবিন্দ ক্ষীণদেহী, লম্বাটে মুখ। গায়ের রং তামাটে। সুদর্শন বলতে যা বোঝায় মোটেই তা নয়। তবে বেঢপ বেমানান কিছু তার অবয়বে নেই। নাকটি টিকালো। মোটা কালো ফ্রেমের চশমা এবং আঁচড়ালেও ব্রহ্মতালুর কাছে খাড়া হয়ে থাকা একগুচ্ছ অবাধ্য চুল ও চওড়া হাঁ-মুখের জন্য ওকে খানিকটা হাস্যকর দেখাত। কেউ কেউ বলতো ‘ডোনাল্ড ডাক’।
অরবিন্দের মধ্যে আকর্ষণীয় বলতে যেটি, তা হল ওর কণ্ঠস্বর। আর শান্ত সহৃদয় আচরণ এবং পরিহাসপ্রিয়তা। ওর কণ্ঠস্বর ঘন গভীর গমগমে। অনেকটা খাদে দেবব্রত বিশ্বাসের গলার মতো। কথা বলে যেন ভেবেচিন্তে ধীরে ধীরে।
বোর্ডিংয়ে সাধারণত যা হয়ে থাকে, ছেলেরা উত্যক্ত করার পাত্র খোঁজে এবং পেয়েও যায়। অরবিন্দ প্রথম যখন আসে তখন ওকেই তারা পেয়েছিল। রোগা চেহারা, খাড়া টিকিট মতো চুল, ব্যাঙের আদলে মুখ এবং মোটা ফ্রেমের চশমা ইত্যাদি মিলিয়ে সে লাঞ্ছনার শিকার হয়ে পড়ে। বহুদিন সে ছুটির পর স্কুল ঘরে একা বসে থেকেছে, বাইরে অপেক্ষমাণ ছেলেদের ভয়ে। তবে বছরখানেকের মধ্যেই ছেলেরা ওকে রেহাই দেয় প্রধানত ওর মৃদু এবং মিষ্টি স্বভাবের জন্য।
টেনিস কোর্টের ধারে সে কখনো যায়নি, হকি বা ফুটবল খেলা দেখত দূর থেকে। আদিবাসীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিল ধনুক আর লোহার ফলা লাগানো দুটি তির। তাই নিয়ে বিকেলে সে ঘুরে বেড়াত কাছাকাছি টিলায়, ঝোপে কিংবা লরিচলার রাস্তা ধরে চলে যেত বহু দূরে।
হত্যায় বিরাগ ছিল অরবিন্দর। একটা অদ্ভুত ব্যাপার ওর চরিত্রে আছে। শিকারি টিকটিকি গুঁড়ি দিয়ে অন্যমনস্ক আরশুলার দিকে এগোচ্ছে দেখে একদিন সে হাতের কাছে পাওয়া বইটা ছুঁড়ে আরশুলাটাকে হুঁশিয়ার করে দেয়। বইটি ছিল ওর সহপাঠী এবং একই ঘরের বাসিন্দা চিররঞ্জনের, যাকে সে চিরো বলে ডাকে। চিরো ছাড়া আজ পর্যন্ত আর কেউ তার দ্বিতীয় বন্ধু নেই। বইটার সেলাই ছিঁড়ে, পাতাগুলি আলগা হয়ে গেছিল। বারবার ক্ষমা চেয়ে অরবিন্দ বলে, ”মরাটা তো কোনো ব্যাপার নয়, কীভাবে মরছে, কেমনভাবে মরছে সেটাই হল আসল কথা। টিকটিকিটার মুখের মধ্যে আধখানা ধড় ঢোকানো আরশুলাটা ছটফট করবে আর একটু একটু করে ভিতর ঢুকবে, এটা অসহ্য।”
বোর্ডিংয়ের উচ্ছিষ্টে পালিত গুটি দশেক কুকুরের মধ্যে একটির পিছনের পায়ের উপর দিয়ে একদিন লরি চলে যায়। নিজেকে হিঁচড়ে পথের ধারে এনে কুকুরটি করুণ আর্তনাদ করতে থাকে। তখন স্কুল চলছিল। ক্লাসঘর থেকে অরবিন্দ ঘটনাটি ঘটতে দেখেই চিৎকার করে উঠে দু’হাতে চোখ ঢাকে তারপর ছুটে বেরিয়ে যায়।
রাত্রে সে চিরোকে বলে, ”কুকুরটা মরে গেলে আমার কিছুই হত না, কিন্তু ওই যন্ত্রণাভোগ করতে করতে মরা।” একবার কুকুরগুলোর একটা পাগল হয়ে একটি ছেলেকে কামড়িয়ে ছুটোছুটি শুরু করে। অরবিন্দ তির-ধনুক নিয়ে বেরিয়ে মিনিট তিনেকের মধ্যে, যাওয়ার মতোই স্বাভাবিক মুখ নিয়ে ফিরে আসে। একটি তিরেই কুকুরটির গলা সে ফুঁড়ে দিয়েছিল। কখনোই সে দীর্ঘ সময় নিয়ে দ্বিধাভরে তির ছুঁড়ত না। তার কাছে যুক্তিসংগত মনে হলেই ধনুকের ছিলে টানত এবং হত্যার জন্যই। তার চরিত্রের গভীরে মমতা ও ত্রূ«রতা অচঞ্চলভাবে থেকেছে, একে অপরকে না খুঁচিয়ে।
এখানেই ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং অল্পদিনেই অন্তরঙ্গতা হয় চিররঞ্জনের। বয়সে অরবিন্দের থেকে এক বছরের ছোটো, হকি এবং ফুটবলে দক্ষ, এই ছেলেটি মেজাজে ও আচরণে কিঞ্চিৎ বিস্ফোরক। চলনে ও বাচনে যতটা সপ্রতিভ, পড়াশুনায় তার অর্ধেকও নয়। চোখা নাক-মুখ, ঘন অবিন্যস্ত একরাশ চুল, সাজানো ঝকঝকে দাঁত-এ সবই সাধারণ হয়ে যেত, যদি না ওর গায়ের রঙ চা-এর ঘন লিকারের মতো হত। বিপক্ষের হকি স্টিক ওর কপালে ও চিবুকে যে আঁচড়গুলি রেখে গেছে, অকারণ হাসিতে সেগুলি যখন নড়াচড়া করে, যে-কোনো অনুভূতিপ্রবণের পক্ষেই তখন শিহরণের আলতো ছোঁয়া এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। চিরোর বাবা কলকাতায় বিরাট এক প্রেসের মালিক। সরকারি কাজগুলি একচেটিয়া তারই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ অর্থ তাকে ব্যবসাটি বড়ো করে তুলতে উদ্যোগী করে। স্থির করেন নতুন নতুন মেসিন বিদেশ থেকে আনিয়ে প্রেসটিকে আধুনিক করবেন ও পত্রপত্রিকা প্রকাশে উদ্যোগী হবেন। চিরোকে ইউরোপে কাজ শিখতে পাঠাবেন ভেবে প্রথমে পাঠান এই বোর্ডিং স্কুলে ইংরেজি শেখার জন্য।
