”কী হয়েছে ওর, মারা গেছে?”
বুলি থরথর কাঁপছে। গিরি উবু হয়ে বসে মোহনের ডান হাত তুলে নাড়ি দেখল এবং মাথা হেলিয়ে বলল, ”হ্যাঁ।”
”আঃ।”
বুলি নিজের মুখে হাত চাপা দিল চিৎকারটা চাপা দিতে। টাল সামলাতে অন্য হাত রাখল খাটের ওপর।
”দরজাটা খোলা ছিল। বাপি যাওয়ার পর আর বন্ধ করা হয়নি।”
গিরি জবাব দিল না।
”বন্ধ করে দিয়ে আসব?”
গিরি মাথা নাড়ল।
”তা হলে?”
”বুলি, আর আমাদের কিছু করার নেই। তুমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলে না একসময়ে?”
”হ্যাঁ।”
গিরি মুখ ফিরিয়ে মোহনের দিকে তাকাল। ঝুঁকে ওর বাহুতে একবার হাত বোলাল। ”বেঁচে গেল। আর কোনও বোকামি করার সুযোগ পাবে না।”
”আমরাও কি?”
গিরিকে সচেতন করে দিল বুলির স্বর। শান্ত, আবেগবর্জিত কিন্তু উদ্দেশ্যহীন। বুলির গালে ধুলো। হাত বাড়িয়ে মুছে দিতে দিতে সে বলল, ”লেগেছে খুব? চলো বাইরে বসি।”
সোফায় ওরা পাশাপাশি বসে রইল। পার্টিশনের পর্দার তলা থেকে কাবুলি জুতো পরা মোহনের মসৃণ পায়ের গোড়ালি দেখা যাচ্ছে।
”স্কুটারের শব্দও আমরা পাইনি।”
গিরি ফিকে হাসল।
”এবার কী করব আমরা? হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”
”মরে গেছে, দরকার কী।”
”পুলিশে খবর দিতে হবে?”
”দরকার কী, ওরাই খুঁজে নেবে।”
বুলি যেন কেঁপে উঠল। গিরি ওকে কাছে টানল কাঁধ ধরে। বুলি সরে এল। রাস্তায় বাসনউলির ক্লান্ত গলা জানলার কাছে ডেকে উঠল দু’বার। বুলি ফিসফিস করে বলল, ”ওর কাছে একটা স্টিলের হাতা কিনেছিলুম।”
দু’জনে গোড়ালিটার দিকে তাকিয়ে বসে রইল। জানলার পর্দা নড়তে দু’জনেই তাকাল।
”বাতাসে।”
”আজ এই প্রথম দিল।”
গিরি হাসল। বুলির হাতটা তুলে নিল হাতে।
”ভয় করছে?”
বুলি ফিকে হেসে গিরির হাত কোলের উপর টেনে আনল।
”আমরা ভাগাভাগি করে নোব।”
”না। ঠিক যা দেখেছ তাই বলবে পুলিশকে। ডান্ডাটা আমিই মেরেছি।”
”পুলিশ আসবে!”
”আসবে, আজ না হোক, কাল কিংবা পরশু।”
”আমার মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটবে। আমাদের দু’জনের জীবনেই।”
”এই রকমই কিছু, না অন্য রকম?”
”অন্য রকম। কিন্তু এখন ও-সব কথা বলে কী লাভ।”
”কথা বলতে আমারও ভালো লাগছে না।”
কিছুক্ষণ পর গিরি বলল, ”তোমার ওপরই ভরসা করে তোমাদের সংসার। তোমার থাকাটা দরকার। আমি না থাকলে রুনু অসুবিধায় পড়বে না। কাজেই ভাগাভাগির প্রশ্ন ওঠে না।
”যা কিছু করেছি, নিজের জন্য একটিও নয়। আপনিই প্রথম… আমার নিজের জন্য প্রথম।” দু’হাতে মুখ ঢাকল বুলি। তার কানা চোখটা দিয়েও জল গড়াচ্ছে।
বিকেল এল এবং ক্রমশ চলে যাচ্ছে। ওরা একই ভাবে বসে। মোহনের গোড়ালিটা ম্লান হয়ে গেছে। বেলা অবসানে নীচের তলায় ঘরের আলো দ্রুত কমে যায়।
”ওর জন্য এক একসময় মায়া হত।” বুলি ফিসফিস করে বলল। ”হয়তো আমাকে ভালোবেসেছিল।”
”অনুতাপ?”
”কী জানি! বোধহয়।”
”তালাচাবিটা নাও।”
গিরি উঠে দাঁড়াল।
”আমরা চলে যাব?”
”হ্যাঁ। এখন তুমি বাড়িতেই যাও। যা হোক একটা কিছু ওদের বোলো। তোমার কি নেবার আছে নিয়ে নাও।”
”কী লাভ।”
”তবু তিন-চারটে দিন পাবে।”
বুলি মাথা নাড়ল।
গিরি জানলা দুটো বন্ধ করে ছিটকিনি দিল।
তালা লাগিয়ে চাবিটা হাতে নিয়ে বুলি ইতস্তত করছে।
”কোথাও ফেলে দিয়ো, যাবার পথে।”
বাড়ির দরজার পাশে স্কুটারটা রাখা। ওরা তাকাল না। রাস্তায় বেরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর দিকে এগোতেই ঝিয়ের কোলে বাপিকে আসতে দেখল। সে কৌতূহলে গিরির ক্রাচ এবং চলা লক্ষ করছে। বুলির দিকে তাকালই না। তাকে অতিক্রম করে যাবার পর বুলি পিছনে মুখ ফিরিয়ে একবার তাকাল।
”চকোলেটের কথা বলতে ভুলে গেল।”
”আমাকে দেখতে গিয়েই।”
সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর বাস স্টপে ওরা দাঁড়াল। বুলি দক্ষিণ দিকে যাবে।
”কাল আমার জন্য বেচারা অপেক্ষা করবে, ভাবতে খারাপ লাগছে।”
”আমি এসে ওকে চকোলেট দিয়ে যাব।”
”ঠিক।”
গিরি মাথা কাত করল। আধুলিটা এখনও আছে।
ওদের মধ্যে আর একটিও কথা এর পর হয়নি। অপেক্ষমাণদের থেকে একটু তফাতে রাস্তার যতদূর দেখা যায়, সেই পর্যন্ত দৃষ্টি মেলে দু’জনে দাঁড়িয়ে থাকে বাসের জন্য। দূরে বাস দেখে বুলি কয়েক পা এগিয়ে যায়। গিরি দাঁড়িয়েই থাকে। ভিড় রয়েছে বাসে। ওঠার লোকও অনেক। ঠেলাঠেলির মধ্যে বুলির হাতটা সে দেখতে পেল হাতল ধরেছে। পাদানিতে উঠল। গিরির দিকে তাকাতে চেষ্টা করছে। পিছন থেকে অধৈর্য ঠেলায় তাকে ভিতরে পাঠিয়ে একটা লোক পাদানিতে উঠে দাঁড়াল।
বাসটা গিরির সামনে দিয়ে চলে গেল। বুলিকে দেখতে পেল না। উত্তর থেকে একটা বাস এসে বিপরীতে দাঁড়াল। দরজায় মানুষ ঝুলছে, বাসটা হেলে রয়েছে। অফিস ফেরত ভিড়। রুনু কি এই বাস থেকে নামবে, নাকি এসে গেছে! কিংবা সেদিনের মতো দেরি করে ফিরবে।
সাবধানে দু’ধারে তাকিয়ে সে রাস্তা পার হল। অঘোর ঘোষ স্ট্রিটে ঢুকতে গিয়ে সে তার বারান্দার দিকে তাকিয়ে একবার দাঁড়াল। এখনও দিন চার বা পাঁচ ওখানে বসার সুযোগ পাবে। মোহন পচে গন্ধ ছড়ালে পাশের ফ্ল্যাটের লোকেরাই পুলিশ ডাকবে। অবশ্য তালা বন্ধ দরজার সঙ্গে স্কুটারটা যুক্ত করে আগেই সন্দেহ করবে। ওরাই পুলিশকে বলে দেবে, একটা খোঁড়া লোকের সঙ্গে তারা মেয়েটাকে চলে যেতে দেখেছে। খোঁড়া লোকটাকে এ অঞ্চলে অনেকেই দেখেছে ওপারে তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে।
