”এই ঝাঁ ঝাঁ রোদে বেরিয়েছেন। কী রকম ঘেমেছেন যে! ভিতরে খাটে বসুন, টেবিল-ফ্যান আছে।”
”অসুবিধে হচ্ছে না আমার।”
”আমার হচ্ছে। এমন দরদরে ঘাম দেখলে অস্বস্তি হয়।”
বুলি পার্টিশনের ওপারে গেল এবং ভোমরা ওড়ার শব্দের সঙ্গে পর্দাটা কাঁপতে শুরু করল। ”আসুন এখানে।”
ভিতর থেকেই বুলি ডাকল। ইতস্তত করে গিরি ভিতরে এল। ঘরের প্রত্যেকটা জিনিসই নতুন। পাখা, খাট, আয়না, এমনকী আলনার কাপড়গুলোও। খাটে বসেই আরাম বোধ করল। গদিটা ফোম রাবারের। মোহন অনেক খরচ করেছে। জীবন ভোগ করতে তা হলে সত্যিই বদ্ধপরিকর।
”পাখার তারটা এত ছোটো যে বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় না।”
”একটা সিলিং-ফ্যানেই ভিতরে-বাইরে হাওয়া পাওয়া যাবে।”
দু’জনেই গতকালের ঘটনা এড়িয়ে কথা বলে গেল। গিরি জানে, বুলির কাছে এ সম্পর্কে হতাশা বা অনুযোগ প্রকাশ করলে ওকে বিব্রত করা হবে। তারা দু’জনেই এটা জানে।
”পাখা কি সারারাত চালাও। সর্দি হবে কিন্তু।”
”কিছুক্ষণ পরেই বন্ধ করে দিই। হাত বাড়ালেই রেগুলেটারটা পাওয়া যায়।… আপনি বালিশটা ঘাড়ে রেখে ঠেস দিয়ে বসুন না।”
”তুমিই বা দাঁড়িয়ে কেন?”
”মাথার চোট কেমন?”
”প্রায় সেরে এসেছে।”
গিরি অসুবিধা বোধ করতে লাগল কথা চালিয়ে যেতে। বুলিও জানে একসময় প্রশ্নটা উঠবেই। হয়তো জবাব নিয়ে তৈরি হয়ে আছে।
”চুলটা এইভাবে দু’পাট করে রাখলে তোমাকে ভালো দেখায়।”
”আমাকে ভালো…!”
বুলির চোখটি অবিশ্বাস্যতায় বিস্ফারিত হল না। নিঃশব্দে হেসে উঠল মাত্র।
”সত্যি?”
”আমার তো লাগে।”
বুলির হাসি মিলিয়ে গেল।
”তুমি কালো চশমা পরতে পারো।”
”ক্লাসের একটা মেয়েও আমায় বলেছিল। তাতে কী হবে? আমাকে ভালো দেখাবে কি?”
গিরি চট করে উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। বুলি তাকিয়ে আছে।
”ওটায় চোখটা তা হলে ঢাকা পড়বে।”
”কার কাছ থেকে? চশমা পরে থাকলেও আপনি সব সময়ই মনে রাখবেন আমার একটা চোখ নেই। আর রাস্তায়, বাসে, কলেজে কে কী ভাবল তা আমি গ্রাহ্য করি না।”
”কেন করবে না।”
”তাদের কোনও দরকার নেই আমাকে। আমিই বা তাদের দরকারি ভাবব কেন?”
”আমার দরকার আছে।”
”আপনার!”
অস্ফুটে বুলি আর একটা শব্দ করল।
”কী দরকার? হাড় চামড়া ছাড়া আমার আর কিছু নেই।”
”কাছে এসো।”
বুলি ঘাড় বেঁকিয়ে বসে আছে। গিরি হাত বাড়াল। পৌঁছল না। বালিশ থেকে মাথাটা তুলে কনুইয়ে ভর রেখে কাত হয়ে সে তাকিয়ে থাকল।
”আমার কাউকে কিছু দেবার নেই, আমাকে কারুর দরকার হতে পারে না।”
”আমারও সম্বল কিছু নেই। সব আমি হারিয়েছি। আমি গর্তের মধ্যে পড়ে গেছি। আমি নিজেকে পর্যন্ত আর বিশ্বাস করতে পারছি না। তোমার কাছ থেকে কিছু নিয়ে এবার বাঁচতে হবে।”
”দুটো ভাঙা জোড়া দিয়ে একটা আস্ত? হয় কখনও? দাগ একটা রয়েই যাবে।”
বুলি সরে এল গিরির পাশে। বালিশে হেলান দিয়ে গিরি হাসল। বিছানায় বুলির হাত। তার ওপরে সে আলতো হাত রাখল।
”কী হারিয়েছেন বলছিলেন?”
গিরি নিজের বুকের ওপর হাত রাখল।
”আপনি তো বেঁচে আছেন।”
”না।”
বুলি এগিয়ে এসে ঝুঁকে গিরির বুকে কান পাতল।
”দপদপ করছে।”
আলতো ওর মাথায় হাত রাখল গিরি।
”করছিল না, এইমাত্র করে উঠল।”
বুকের উপর গলিত অন্ধ চোখ আর ক্ষতে খোদলানো মুখটা বুলি চেপে ধরল। গিরি চোখ বুজল। দু’হাতে বুলির মুখটা তুলে ওর কপালে চুমু দিল। ঠোঁট দুটি সরু করে এগিয়ে দিয়ে বুলি হাসতে লাগল চোখ বন্ধ রেখে। গিরি মুখের মধ্যে বুলির ঠোঁট ভরে নিল।
খসখসানি শব্দ হল। চোখ খুলল গিরি। পর্দা সরিয়ে মোহন তাকিয়ে রয়েছে। দু’চোখ ভরে অবিশ্বাস। গিরির চোখ আটকে রইল লাল আঁচিলটায়। মুহূর্তে সেটা টকটকে হয়ে উঠল, তারপর সারা মুখ হিংস্র রাগে কুঁচকে গেল।
মোহন হাত বাড়িয়ে বুলির চুলের গোছা ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। অপ্রত্যাশিত এই আক্রমণে আর্তনাদ করে বুলি দাঁড়িয়ে উঠতেই মোহন ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। কাত হয়ে মেঝেয় পড়ে থাকা বুলির মুখের উপর মোহন ডান পা রেখে চেপে ধরল। গোঙিয়ে উঠল বুলি।
ছয়-সাত সেকেন্ডের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটল। কিছু চিন্তা করার সময় নিল না গিরি। নিছক প্রবৃত্তিবশে সে খাট থেকে হাত বাড়াল। অ্যাকসেলের ভাঙা খণ্ডটা ওর জন্যই যে অপেক্ষা করছে। দ্রুত উঠে দাঁড়াল এক পায়ে। টলে পড়ার আগেই সে বুলির মুখ পা দিয়ে মেঝেয় ঘষায় ব্যস্ত, কুঁজো হওয়া মোহনের মাথার পিছনে সজোরে লোহার ঘা মারল।
মোহন স্থির হয়ে রয়েছে। পার্টিশনে হাত রেখে গিরি মাথাটার দিকে তাকিয়ে। পাতলা চুলের মধ্যে দিয়ে নারকেল শাঁসের মতো সাদা একটা দাগ। সেটায় ক্রমশ গোলাপি রং ফুটে উঠছে। মোহন পাশে হাত বাড়াচ্ছে কিছু একটা ধরার জন্য।
একটা শ্রান্ত লোকের মতো, পর্দাটা মুঠোয় আঁকড়ে, মোহন একটু একটু করে দুমড়ে মুচড়ে মেঝেয় বসে পড়ল। পার্টিশনটাকে কাঁপিয়ে একবার ওঠার চেষ্টা করল এবং নিজের সঙ্গে কয়েক মুহূর্ত ধস্তাধস্তির পর যুক্তিগ্রাহ্যভাবে নিজের প্রাণহীন দেহটাকে শুইয়ে দিল কাত করে। বুলি উঠে বসেছে। গিরি লোহাটা তুলে দেখাল।
”আসলে এটা ইউনিভার্সাল গ্যারাজের।”
অ্যাকসেল টুকরোটা আস্তে মেঝেয় নামিয়ে রাখল। কর্কশ শব্দে গড়িয়ে সেটা মোহনের পিঠে লেগে থেমে গেল। মোহনের মুখটা পার্টিশনের দিকে ফেরানো। মাথা থেকে রক্ত কাঁধ বেয়ে মেঝেতে গড়িয়ে যাচ্ছে।
