শুনতে শুনতে গিরি মেঝেয় চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। তুলে দেখে বুলির চোখ রাস্তায় আটকে রয়েছে। আড়ষ্ট হয়ে উঠেছে বসার ভঙ্গি। অস্ফুট একটা শব্দ বেরিয়ে এল ওর মুখ দিয়ে।
গিরি যথাসম্ভব ঝুঁকে দরজা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। এতদূর থেকে জাফরির মধ্য দিয়ে রাস্তাটা দেখা যায় না।
”আমি যাচ্ছি। আর একদিন এসে…”
বুলি ছুটল দরজার দিকে। হতভম্ব গিরি উঠে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। স্কুটারে মোহনের পিঠ দেখতে পেল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে বনমালী সরকার লেনে ঢুকছে। গিরি একইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে দেখল বুলি প্রায় ছুটেই চলেছে অঘোর ঘোষ স্ট্রিট ধরে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পার হবার জন্য একটু থামল। গিরি আশা করল, একবার অন্তত পিছনে মুখ ফেরাবে। ওর পিঠ ঘেঁষে একটা ট্যাক্সি বেরিয়ে গেল। মুখ বাড়িয়ে ড্রাইভার কিছু বলল। বুলি বনমালী লেনে ঢুকে অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত গিরি দাঁড়িয়ে দেখল।
”কেন।”
রাগে সে থরথর করে একা ঘরে কেঁপে উঠল।
রুনু যখন অফিস থেকে ফিরল তখনও সে শুয়েছিল। বুলির জন্য টেবিলে সাজিয়ে রেখেছিল ভাত-ডাল, ভাজা, দই-সন্দেশ। দুপুরেই সেগুলো হাঁড়িতে ভরে, রাস্তায় বেরিয়েছিল ভিখিরির খোঁজে। বুড়ি ভিখিরিটা অবাক চোখে প্রথমে তাকায়, তারপর বিড়বিড় করে : ”ভগবান তোমার মঙ্গল করুক বাবা, রাজা হও, ছেলে-বউ নিয়ে সুখে থাকো বাবা।”
”শুয়ে ছিলে?”
রুনু কপালে হাত দিয়ে তাপ দেখল।
”মনে হচ্ছে জ্বর-জ্বর। কিছু খাবে? হরলিকস?”
তাদের হরলিকস নেই, অম্বরের আছে।
”না।”
আর কথা না বলে গিরি শুয়ে পড়ে। ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভেঙে গেল একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখে। বারান্দায় ঝুঁকেছে দোতলার ঘরে নতুন বউটির কাপড় ছাড়া দেখার জন্য। তখন সে বোতল হয়ে বারান্দা থেকে রাস্তায় পড়ে গেল।
নিশ্চল হয়ে সে বিছানায় শুয়ে রইল কিছুক্ষণ। জলতেষ্টা পেয়েছে ডান পাশ ফিরল খাট থেকে নামার জন্য। মেঝেয় শতরঞ্চি পেতে রুনু শুয়ে আছে। সাবধানে পা ফেলার জন্য তাকিয়ে থেকে অন্ধকারের সঙ্গে চোখ সইয়ে নিল। রুনু শুয়ে নেই।
কোথায় তা হলে! একমাত্র পা-টি বেয়ে কার যেন ঠান্ডা হাত উঠছে। গিরি ভয় পেল। কোথাও কোনও শব্দ নেই, তা হলে কি সে কালা হয়ে গেছে! দরজার পর্দাগুলো তোলা। রাস্তার আলোয় সামনে বাড়ির দেয়াল অবাস্তব জগতের মনে হচ্ছে। হঠাৎ গিরির মনে হল সে গ্যারাজে একা। রুনু এখন কোথায়? পাশের ঘরে? লিফট, তার উপর আড়াই টন ট্রাক, নীচে সে দাঁড়িয়ে। গিরি ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল।
ক্রাচের জন্য হাত বাড়িয়েও হাতটা ফিরিয়ে নিল। শব্দ হবে। হামা দিয়ে সে বারান্দায় এল। চেয়ারটা ছাড়া আর কিছু নেই। মাটি শুঁকে এগোনো কুকুরের মতো ঝুঁকে গিরি এগোল অম্বরের ঘরের দরজার দিকে। প্রাণ বাঁচানোর ব্যাপারে মানুষে-জানোয়ারে কোনও পার্থক্য নাকি থাকে না। রুনুই প্রাণ, প্রাণই রুনু। এখন রুনু ছাড়া তার চেতনায় কোনও কিছুই অস্তিত্ব নেই।
দরজাটা বন্ধ। মুখটা এগিয়ে দিয়ে সে দরজায় কান পাতল। ঠিক এইভাবেই সে রুনুদের বাড়ির ভিতরের ঘরে দরজায় একদিন কান পেতেছিল। তখন দু’পায়ে ভর দিয়ে সে দাঁড়াত।
ভিতরে কি কথা বলল কেউ? একটা অস্পষ্ট ধ্বনি যেন ভেসে আসছে অম্বরের ঘরের মধ্য থেকে। ধীরে ধীরে তার মাথাটা ঝুঁকে পড়ল। কঙালটা মেঝেয় রেখে দু’হাতের ভর থেকে দেহটা নামিয়ে দিল। এইভাবে সামনের বাড়ির লোকটাকে একদিন সে যোগব্যায়াম করতে দেখেছে। দরজার তলার ফাঁক দিয়ে ধ্বনিটা দীর্ঘ হয়ে তীব্র হয়ে বেরিয়ে এসে একটা চিৎকারের আকৃতি নিল।
”বিশ্বাসবাবু, বিশ্বাসবাবু, শুয়ে পড়ুন।”
গিরি সেই নির্দেশ শুনেই উপুড় হয়ে বারান্দায় শুয়ে পড়ল।
”এইবার কি আমি বেঁচে যাব!”
উপুড় হয়ে হাঁফাতে লাগল গিরি। এখন বুঝতে পারছে, গভীর গর্তের তলদেশে সে পড়ে রয়েছে। এখান থেকে তার আর উদ্ধার নেই। বাঁচার কোনও উপায় নেই। সে দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত।
ভোরে সে চেয়ারে বসে জাফরির মধ্য দিয়ে তাকিয়ে। বুলি বাস স্টপে দাঁড়িয়ে। বারান্দার দিকে বারবার তাকাচ্ছে।
”তোমার চা।”
নেবার সময় একবার রুনুর মুখের দিকে তাকাল। কোনও তফাত নেই অন্যান্য দিনের থেকে।
”তুমি কি কাল রাতে বাথরুমে গেছলে?”
”হ্যাঁ।”
চা খেতে খেতে সে দেখল বুলিকে। উঠে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ার ইচ্ছে তার হচ্ছে না। বাস এল এবং বুলিকে নিয়ে চলে গেল। অম্বরের দ্রুত চলাও সে দেখল।
নয়
দরজাটা আজও খোলা।
টোকা না দিয়ে গিরি ভিতরে ঢুকল। বুলি কথা বলছে। কচি গলায় পালটা প্রশ্ন হচ্ছে।
গিরিকে দেখে বুলি দাঁড়িয়ে উঠল সোফা থেকে। লাজুক হাসল। খালি গায়ে জাঙিয়া পরা বছর তিন বয়সি হৃষ্টপুষ্ট ছেলেটি অবাক হয়ে তাকিয়ে।
”তোমার নতুন বন্ধু?”
”হ্যাঁ। কাল বলেছিল চকোলেট আনতে, এনেছি লজেন্স। তাই এতক্ষণ ক্ষমাপ্রার্থনা করছিলুম। কিন্তু মন গলাতে পারছি না। মোড়ের দোকান থেকে এখুনি কেন এনে দিচ্ছি না, এটাই ওর অভিযোগ।”
”বেশ সুন্দর দেখতে।”
বুলি আদরভরা চোখে বাচ্চচাটার দিকে তাকাল।
বাইরে থেকে নারীকণ্ঠের ”বাপী” ডাক শুনেই ছেলেটি তড়াক করে সোফা থেকে নেমে ছুটে বেরিয়ে গেল।
”মাকে ভীষণ ভয় পায়।”
”সব বাচ্চচাই পায়। আমিও পেতাম।”
