”তুমি শুধু নিজের জন্যই ভাত কোরো। আমি এবেলাও কিছু খাব না।”
রুনু উদ্বিগ্ন চোখে তাকাল।
”শরীর এখনও খারাপ? জ্বর হয়েছে নাকি?”
”জ্বর নয়। ম্যাজম্যাজানি, গায়েও ব্যথা। ফ্লু কি না কে জানে। উপোস দেব এ-বেলাটা।”
”তা হলে আর রেঁধে কী হবে। অফিসেই খেয়ে নোব।”
রুনু যখন অফিসে বেরোল গিরি তখন স্নান সেরে চুল আঁচড়াচ্ছে। রাস্তায় যেতে যেতে রুনু পিছু ফিরে বারান্দায় তাকিয়েছিল অভ্যাসমতো। বারান্দা থেকে গিরিও হেসেছিল। সে তখন ভাবছিল অন্য কথা।
পর্দাটা সরিয়ে গিরি দাঁড়িয়ে। প্রায় আধ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছে সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে। বাড়িগুলোর ছায়ার, গাড়ি চলাচলের, পথিক সংখ্যার, শব্দের তীব্রতার পরিবর্তন লক্ষ করার মেজাজ তার নেই। বুলির জন্য সে অপেক্ষা করছে।
বুলি আসছে।
হৃৎস্পন্দনের আঘাত যে অনুভব করছে। বাঁ পায়ের হাঁটুটা দুর্বল লাগছে। সাদা শাড়ি, কালো ব্লাউজ, পিঠে ছড়ানো চুল। বারান্দায় বেরিয়ে এসে গিরি রেলিংয়ে ঝুঁকে বাড়ির দরজা দেখাল আঙুল দিয়ে। বুলি মাথা নেড়ে বোঝাল সে জানে।
বুলি ঢুকে যেতেই গিরি লাফিয়ে লাফিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খোলার জন্য এগোল। পাল্লা দুটো মেলে দিয়ে সে কান পেতে রইল। বহুদিন এইভাবে সে অফিস-ফেরত রুনুর জন্য দাঁড়িয়েছে।
চটির শব্দ উঠে আসছে। গিরি দরজার বাইরে গেল। বুলি সিঁড়ির বাঁক ঘুরে দেখতে পেল ওকে।
”তিনতলার বাইরের দিকের বারান্দা তো, আমি ঠিকই বার করে নিতুম।”
”তা নয়, তা নয়। ফ্ল্যাট খুঁজে বার করা কী এমন শক্ত ব্যাপার। তোমাদেরটা বার করলাম কী করে।”
রুনু বেরিয়ে যাবার পরই পেনসিল দিয়ে সাদা কাগজে বড়ো অক্ষরে ‘গিরিজাপতি বিশ্বাস’ লিখে সে আটাগোলা মাখিয়ে দরজায় সেঁটে দিয়েছিল। দই কিনে ফেরার সময়ও দেখেছে, ছিল। এখন নেই। ওপরের ছেলে দুটো স্কুলে যাবার সময় হয়তো খুলে নিয়েছে।
কৌতূহলী চোখে বুলি ঘর দেখছে। যতটা পারা যায় গিরি গুছিয়েছে। বিছানার চাদর বা বালিশের ওয়াড় ধবধবেই আছে। আসবাব কিছুই প্রায় নেই। দেয়ালটাই শুধু ময়লা, বহু জায়গায় বালি খসা। ভাড়া নেওয়ার পর আর কলি-ফেরানো হয়নি। গিরি খদ্দরের পাঞ্জাবি পরেছে। পকেটের ছেঁড়া জায়গাটা সেলাই করে দিয়েছে রুনু। দই ও সন্দেশ কিনে একটা আধুলি ফিরেছে, সেটা এখন পকেটে।
”তোমার দেরি হয়েছে।”
”মোটেই না। এখন সাড়ে বারোটাও বাজেনি।”
”তোমার বোধহয় দেরি করে খাওয়া অভ্যাস।”
”মর্নিং স্কুলে পড়লে এই বদ অভ্যাসটা হয়।”
বুলি পর্দা সরিয়ে বারান্দায় এল। গিরি ওর পিছনে।
”লাভলি বারান্দা তো! অনেকখানি দেখা যায় তিন দিকেই।”
”বেশির ভাগ সময় আমার এখানেই কাটে।”
বুলি রৌদ্রের তাতে দাঁড়াতে পারল না। ঘরে এসে খাটে পা ঝুলিয়ে বসল! গিরি মোড়ায়।
”কাল যখন আসছি তখন মোহন যাচ্ছে। আমাকে দেখল।”
”জিজ্ঞাসা করেছিল আপনি এসেছিলেন কি না।”
গিরি উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইল। বুলি কী বলেছে!
”বললুম আসেননি।”
কেন বলল মিথ্যে কথা! সত্যিই কি ও তাই বলেছে? গিরি বিভ্রান্তির মধ্যেও আলগা একটা সুখের আমেজ পেল। বুলি তাকে গোপন করেছে, সে-ও করেছে রুনুর কাছে। কেন? অযথাই কি? একদৃষ্টে সে বুলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল এবং তার মনে হল, সত্যিই সুন্দর। দুই কাঁধের উঁচু হাড়, কবজির উপর জড়ানো শিরা, শীর্ণ বাহু, অনুন্নত বুক প্রভৃতি সত্ত্বেও, সুন্দর।
গিরির চাহনি লক্ষ করে বুলি বিব্রত হল।
”আপনারা দু’জনেই এইঘরে থাকেন?”
”হ্যাঁ, আবার কোথা থাকব! ওহ, তুমি বলছ আলাদা শুই কি না?”
”না না, ধ্যাৎ। পাশে একটা ঘর রয়েছে তাই বললুম।”
”ওটায় আমার এক দূর সম্পর্কের ভাই থাকে। ফুটবলার। দু’চারদিনের মধ্যেই চলে যাবে। ওর অসুবিধে হচ্ছে।”
”কী রকম গুমোট পড়েছে। বাইরে একদম হাওয়া নেই।”
বুলি মুখ তুলে সিলিংয়ে তাকাল।
”পাশের ঘরে পাখা আছে, ভাড়া করা। ও চলে গেলে পাখাটা রেখে দেব। তবে পর্দা তুলে রাখলে হাওয়া আসে।”
গিরি দেয়াল ধরে উঠে দাঁড়াতেই ব্যস্ত হয়ে বুলি পর্দাটা দরজার পাল্লার ওপর গুটিয়ে রেখে আবার খাটে এসে বসল।
”এখন খাবে?”
”আপনার কি খিদে পেয়েছে?”
গিরি মাথা নাড়ল।
”গল্প করার লোক পেলে আমি এক বছর না খেয়ে থাকতে পারি।”
”গল্প করার কেউ নেই আপনার?”
বুলিকে বিষণ্ণ দেখাল কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
”কারুর সঙ্গে মিশতে আমারও ভালো লাগে না, আপনার লাগে?”
গিরি মাথা নাড়ল।
”যদি পারি তা হলে দুপুরে আমি আসব। অসুবিধে হবে না তো?”
”কিন্তু দু’-চারদিনেই তুমি ক্লান্ত হয়ে যাবে।”
বুলি গম্ভীরভাবে কিছু চিন্তায় মগ্ন। ঠোঁটে একটা হাসি ফুটিফুটি করছে। মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ”না, বোধ হয় হব না।”
”কেন হবে না?”
”মনে হচ্ছে। আমার এ-রকম বহু ব্যাপারই মনে হয়। পরে দেখেছি ঠিক মিলে গেছে। আচ্ছা, কাল যে গর্তের কথা বললেন না, আমি সেটা নিয়ে ভেবেছি।”
”কেন ভাবলে? তোমার তো গর্ত হবার কোনও কারণ নেই। তুমি তো ভালোবাসার প্রত্যাশা করো না।”
”আমি কিছুরই প্রত্যাশা করি না। একসময় আমি আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলুম।”
”প্রেমিক ছিল?”
”আমার এই চেহারা হবার পর সে আর দেখা দেয়নি। ওকে আর দোষ দিই না। পরে ভেবে দেখলাম, আত্মহত্যা যদি করতেই হয় তা হলে এমনভাবে করা উচিত যাতে অন্যরা উপকৃত হয়।” বুলি স্বচ্ছকণ্ঠে হেসে উঠল। ”আমার বাবা এখন নামকাওয়াস্তে কারখানায় যায় আর মাসে আড়াইশো টাকা পায়।”
