বুলি পিছিয়ে যাবার কোনও ইচ্ছা প্রকাশ করল না। মুখ তুলে শুধু গিরির মুখে তাকিয়ে রইল। ভাবখানা, যা বলার বলে যাও। গিরি বাঁ হাতটা ওর কাঁধে রাখতেই ক্রাচটা টলে পড়ছিল, ডান হাতে বুলি সেটা ধরে ফেলল।
”নিজেকে তুমি কুৎসিত ভাবো কেন? তুমি সুন্দর, খুব সুন্দর।”
”স্তোক?”
”কী লাভ দিয়ে। যা মনে হচ্ছে তাই বললাম। আমরা আস্ত হতে পারি, পারি না?”
”কীভাবে? ভালোবেসে!”
সরাসরি এবং সহজ স্বরে বুলির মুখ থেকে ‘ভালোবাসা’ শব্দটা গিরিকে অপ্রতিভ করল।
”আর একজন মাঝে আছে ভুলে যাচ্ছেন কেন?”
”কে মোহন?”
”আপনার স্ত্রী।”
”থাকুক। আমাকে সম্পূর্ণ করার সাধ্য তার নেই।” গিরি কাঁধ থেকে হাতটা বুলির ঘাড় বেয়ে গালে তুলল। চোখ বুজল বুলি।
”আমি এখন আসি, তা হলে কাল?”
”হ্যাঁ। আপনার কথা আমি ভাবব?”
বনমালী সরকার লেন ধরে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে পৌঁছে গিরি রাস্তা পার হবার জন্য অপেক্ষা করছে। মোহনের স্কুটার তখন বাঁক নিল। স্কুটার থামল না। একবার গিরির দিকে তাকিয়ে সে ভ্রূ কোঁচকাল মাত্র। চোখে কালো চশমা থাকায় বোঝা গেল না ওর মনের অবস্থা। রাস্তা পার হয়ে গিরির মনে হল, বুলিও তো কালো চশমা পরতে পারে।
চারটে ডিম কমে গেল। কেন, তা বলা যাবে না রুনুকে। কিন্তু কিছু একটা বলা দরকার। পকেটমার হয়েছে… দোকানেই ভুলে ফেলে এসেছি… হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেছে… হঠাৎ ইচ্ছে করল তাই খেয়ে ফেললাম!… একটার পর একটা ভেবে গেল সে, আর অস্বস্তি বাড়তেই লাগল। রুনুকে সে বুলির কথা জানাতে চায় না।
রুনুকে কৈফিয়ত দিতে হবে যেহেতু টাকা তার। চারটে ডিমের দাম পূরণ করার ক্ষমতা গিরির নেই। সে যতটা না অসহায় বোধ করল তার থেকেও বেশি রেগে উঠল। ছোটোবেলায় পায়ের ধাক্কায় সরষের তেলের বাটি উলটে যাওয়াতে বাবা চড় মেরে বলেছিল, ”পারবি কিনে পূরণ করে দিতে?” আধ ছটাক তেল বোধহয় বাটিটায় ছিল।
গিরির মনে হল, রুনু কৈফিয়ত শুনে কিছুই বলবে না, তাকাবে মাত্র। সেটাই চড়। সাবধান হও না কেন, পয়সা যখন নিজের নয়! বিশ্বাস একটা কৈফিয়ত এখন তাকে খুঁজতে হবে। ডিমুগলো খরচ না করলেও কিছু এসে যেত না, তবে এ-জন্য তার অনুশোচনাও হচ্ছে না। বহু বছর পর একজনকে সে আসতে বলেছে।
গিরি বাজারের থলি থেকে জিনিসগুলো রান্নাঘরে গুছিয়ে রাখল। বাঁশের ধামায় আনাজ, কলা, কৌটোয় ডাল, মশলা। দশটি ডিমের ছ’টা রয়েছে। এনামেল-চটা ফুটো বাটিটায় কালকের জন্য দুটো ডিম রেখে দিয়ে ঢোঙাটা উঁচু তাকে তুলে রাখল। দরকারের আগে রুনুর চোখে যেন না পড়ে।
বুলিকে কী খেতে দেবে? বেগুনভাজা ডাল ছাড়া রান্নার মতো আর কিছু নেই। রুনু অফিসে বেরিয়ে যাবার পর চটপট এর বেশি আর কী করতে পারে সে। দই? কেনার পয়সা কোথায়? গিরি হতাশ বিরক্ত হয়ে পড়ল।
রুনুর ফিরতে দেরি হয়নি। গিরি সন্ধ্যাটা বারান্দায় কাটিয়ে ঘরে এসে শুয়ে পড়ল।
”মাথায় কি যন্ত্রণা হচ্ছে?”
”টিপটিপ করছে।”
”আলো নিভিয়ে দোব?”
”দাও। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে, রাতে খাব না।”
আর তাদের কথা হয়নি।
আট
ভোরে বারান্দায় এসে গিরি তাকিয়ে রইল বনমালী সরকার লেনের দিকে! বুলি তাকে দেখার আগে সে হাত তুলল। ওর পরনে গতদিনের শাড়ি। হাতে একটি খাতা। থমকে পড়ে তাকাল এবং খাতাটা কানের পাশে তুলল। গিরি মাথাটা কাত করে মুখে গ্রাস তোলার ভঙ্গি করল। বুলি মাথা হেলিয়ে দিল।
বাস স্টপে দাঁড়িয়ে বুলি মাঝে মাঝে বারান্দার দিকে তাকাচ্ছে।
গিরির সারা শরীরে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে চাপা উত্তেজনা। রুনু এখুনি চা এনে দেবে। এতদূর থেকে চোখ দেখা যাচ্ছে না, মুখের গর্তগুলোও নয়। সবুজ শাড়িতে একটি অবয়ব যার সঙ্গে কুশ্রীতার কোনও সম্পর্ক গিরি দেখতে পাচ্ছে না। বুলি ওখানে একা দাঁড়িয়ে। ওর উদাসীন নির্মোহ অবস্থানের সঙ্গে অচঞ্চল থমথমে ভোরবেলা পরিপূরক হয়ে উঠেছে। তার কথা বুলি ভেবেছে হয়তো। বুকভরে বাতাস নিতে নিতে গিরির মনে হল সে বুলিকে শুষে নিচ্ছে। মৃদু একটা গন্ধে সে ভরে যাচ্ছে।
তখনই একটা দোতলা বাস এল।
”তোমার চা।”
হাতটা এগিয়ে দিল গিরি পাশে। রুনুর দিকে সে তাকাল না। দাঁড়িয়েই চা খেল। অম্বরকে যেতে দেখল বাস স্টপের দিকে। আজ ওর দেরি হয়েছে বেরোতে। লিগ শুরু হলে একদিন ময়দানে গিয়ে ওর খেলা দেখে আসবে। অবশ্যই টিকিট কেটে খেলাটা দেখবে, কাউকে না জানিয়ে।
ঘরে এসে গিরির চোখে পড়ল আলমারিতে চাবিটা লাগানো। কান পেতে বুঝল রুনু পাশের ঘরে। বালিশ থাবড়ানোর শব্দ হচ্ছে। অম্বরের বিছানা গুছিয়ে ঘর ঝাঁট দেবে।
গিরি দ্রুত আলমারির কাছে এসে চাবি ঘোরাল। পাল্লা খুলেই ঘন বেগুনি সিল্কের শাড়ির ভাঁজ তুলল। পাঁচ-ছ’টি দশ টাকার নোট আর একটি এক টাকার বান্ডিল। পিন থেকে কতকগুলো এক টাকার নোট নিয়ে আলমারি বন্ধ করে যখন খাটে এসে বসল তখনও আঙুলগুলো কাঁপছে। রুনু জানতে পারবেই, তবে দিন দশেকের আগে নয়।
অস্থিরতা কাটাবার জন্যই গিরি দাড়ি কামাতে বসল। অন্যদিনের থেকে দ্রুত শেষ করল। ক’টা টাকা নিয়েছে জানে না। পকেট থেকে বার করে গুনে দেখতেও ভয় করেছে, যদি রুনু এসে পড়ে। বারান্দায় এসে গুনল, ছ’টাকা। চারটে ডিমের দাম বাদ দিয়ে সে বাকিটায় দই-সন্দেশের কথা ভাবল।
