”তা তো বটেই। আমার একটা চোখ, আপনার দুটো। লজ্জা তো আমার থেকে আপনার ডবল হওয়ারই কথা।”
বুলি কয়েক সেকেন্ড গাম্ভীর্য বজায় রেখে গিরির সঙ্গে হাসতে শুরু করল।
ওরা রান্নাঘরে এল। ঘরটা প্রায় ফাঁকাই। প্লাস্টিকের জালি থলিতে কয়েকটা আলু, ঢোঙায় চাল, ডাল, নুন। ঘিয়ের বোতল, আর একটা বোতলে চিনি। কনডেনসড মিল্কের কৌটো। দেখলেই বোঝা যায় এখনও গুছিয়ে বসেনি। বুলি অ্যালুমিনিয়ম বাটিতে চায়ের জল গরম করতে বসাল।
”সারাদিনই ঘরে থাকি, তাই সংসারের অনেক কাজ সময় কাটাতেই করি। অবশ্য রুনু সেটা একদমই পছন্দ করে না। কিন্তু কী করব, কিছু একটা না করে মানুষ কি শুধুই বসে বসে দিন কাটাতে পারে?”
”কিছু একটা হাতের কাজ, পুতুল তৈরি কি কাঠের শৌখিন জিনিস বানানো, তা হলে কিন্তু সময় কাটানো শক্ত হয় না।”
”আর পয়সাও আসে।” গিরির চোখ হাসিতে ঝকঝক করতে লাগল, ”আসলে আমি ভীষণ কুঁড়ে। নয়তো ইচ্ছে ছিল বাটিকের কাজ শেখার।”
”আমি জানি। শিখবেন।”
”কোথায়? এখানে?”
দু’জনের তিনটি চোখ কয়েক মুহূর্ত স্থির নিবদ্ধ থেকে আলোচনাটাকে এখানে ছেড়ে দিল।
গিরি ক্রাচে ভর দিয়ে সামনে ঈষৎ ঝুঁকে দাঁড়িয়ে, বুলি ডিম ফাটাচ্ছে একটা কাচের গ্লাসে। ঠং ঠং শব্দ হচ্ছে।
”কতদিন হয়েছে আপনার অ্যাকসিডেন্ট?”
”পনেরো বছর।”
বুলি ঘুরে তাকাল গিরির মুখের দিকে। পায়ের দিকে তাকাবে না এটা সে জানে।
”তোমার?”
”তেরো বছর। বাড়ির সকলেরই হয়েছিল। একটা ছোট ভাই ছিল, মারা গেল।”
”অসুবিধা হয় না?”
”হত, এখন হয় না। আপনার কি হয়?”
গিরি জবাব দিল না। বুলি বার্নার থেকে বাটি নামিয়ে তার মধ্যেই চায়ের পাতা দিল।
”হয়।”
বুলি আবার মুখ ফিরিয়ে তাকাল। চোখে প্রশ্ন।
”আমার এখন প্রায়ই ছুটতে ইচ্ছে করে, লাফাতে ইচ্ছে করে। পারি না বলেই অসুবিধা হয়।”
গিরি হাসতে লাগল। একটা চোখ আর একটা পা, দুটোর মধ্যে উপযোগিতার গুরুত্ব অনুযায়ী সে চোখের বিনিময়ে পা চাইবে বুলি নিশ্চয় চাইবে চোখ।
”আমি না থেমে সাতশো আটাশ পর্যন্ত একবার স্কিপ করেছি।”
”ছোটোবেলায়?”
”পাঁচ বছর আগেও। বাচ্চচাটা স্কিপিং রোপ এনেছিল। আপনি আসার একটু আগে, একশো দশের পর হাঁফ ধরল, ছেড়ে দিলুম।”
”আহ, আর একটু আগে এলেই তো ভালো হত।”
”আপনার সামনে কি তাই বলে স্কিপ করতুম নাকি!”
”আমাদের বাড়ির সামনে একটা মেয়ে আছে, শু্যটার। রাইফেল তুলে তাক প্র্যাকটিস করে একটা চোখ বন্ধ করে থাকে, চোখটা তখন ওর কোনও কাজেই আসে না, একেবারে অদরকারি হয়ে পড়ে। ভাবতে পারো?”
”ওগুলো সাময়িক। খাটে শুয়ে কি মনে হয় পায়ের তখন কোনও কাজ আছে? কিন্তু আমরা তো সারাক্ষণ শুয়েই থাকি না।”
বুলি কড়াই চাপিয়ে ঘি দিল। গলে যেতেই সাঁড়াশিতে ধরে কড়াইটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ঘি-টা মাখিয়ে দিতে লাগল।
”বেগুনের বোঁটা থাকলে চট করে মাখিয়ে দেওয়া যেত।”
”আমিও ঠিক তাই ভাবছিলাম।”
”তোমরা বাঙাল, না?”
”হুঁ, তবে দেশের কিছুই মনে নেই। আপনি মনে করতে পারেন বাচ্চচা বয়সের কথা?”
গিরি পারে। কিন্তু সেগুলো কষ্টের যন্ত্রণার স্মৃতি, দারিদ্র্য এবং গঞ্জনার। মাথা নেড়ে বলল, ”না, মনে পড়ে না।”
”আমার দু’-একটা মনে পড়ে। তবে দেশের নয়। রিফিউজি হয়ে আসি যখন বছর ছয়েক বয়স। মা ঠিক ঝিয়ের কাজ করত। আমি সঙ্গে থাকতাম, হেল্পার।”
”সাঁড়াশিটা দাও, চা অনেকক্ষণ ভিজছে। কড়া চা আর বিষ একই জিনিস।”
গিরি একটু বেশি ব্যস্ত হয়েই কথাগুলো বলল। বুলির বাল্যস্মৃতি সে শুনতে চায় না। এ-সব কথাবার্তা এখন অর্থহীন। বুলি নীরবে সাঁড়াশিটা এগিয়ে দিল।
ডান ক্রাচটা দেয়ালে হেলান দিয়ে রেখে বাম ক্রাচে ভর দিয়ে গিরি বাটিটা সাঁড়াশিতে ধরে কাপে লিকার ঢালতে শুরু করল। বুলি একবার দেখল মাত্র।
”তুমি তো পাথরের চোখ লাগিয়ে নিতে পারো!”
”উনিও সে কথা বলেছেন।”
উনি! গিরির অদ্ভুত লাগল শব্দটা। বুলি অন্যের সামনে কী বলে মোহনকে সম্বোধন করে? মোহনদা! মোহনকাকা! মোহনমামা!
”ওতে কোনও লাভ হবে না আমার। মুখের অবস্থাটা দেখেছেন। মানুষ সব থেকে ভালোবাসে নিজের মুখটাকেই তো? প্রত্যেকেই সুন্দর বা সুন্দরী মনে করে নিজেকে আয়নার সামনে। নিজেকে আমায় ভয় করে, বীভৎস মনে হয়।”
স্বরে কোনও রকম আবেগ নেই, কাঠিন্যও নেই। মুহূর্তের জন্য গিরি রুনুর বাবার বসার ভঙ্গিটা দেখতে পেল। সে অনুভব করল তার হাতটা আড়ষ্ট হয়ে গেছে।
”নিজেকে তুমি ভালোবাস না?” গিরি যথেষ্ট সংকোচ এবং ভয় নিয়ে প্রশ্নটা করল। বুলি তার একমাত্র দৃষ্টি পূর্ণভাবে নিক্ষেপ করল গিরির মুখে।
”না। কোনও কারণ আছে কি? একটা আস্ত সুন্দর জিনিসকেই মানুষ চায়, খুব স্বাভাবিক। আমি আস্ত নই, সুতরাং আমাকে কেউ চাইবে বা ভালোবাসবে, তাই কি মনে করব?” বুলির হাসিটা স্বতঃস্ফূর্ত ঠোঁটের উপর দিয়ে ভেসে গেল। ”ভালোবাসা কোনওদিনই পাব না, দেবও না।”
হঠাৎ সন্ত্রস্তের মতো বুলি থেমে গিয়ে তার চাহনিকে গুটিয়ে আনল। ভয় পেয়েছে? গিরির মনে হল, ‘দেবও না’ কথাটা যদি মোহনের কানে যায় সেইজন্যেই। মেয়েটা নিজেকে ভালোবাসে না। ও অন্যকে ভালোবাসবে কী করে! অথচ মোহনের ধারণা, তাকে নাকি ভালোবাসে। গিরি মনে মনে হেসে উঠল।
”তা হলে তুমি এখানে এলে কেন?”
