বাসটা চলে যাবার পর গিরি আবার চেয়ারে বসল। প্রতিদিনের দেখাশোনা জানা রুটিন-মাফিক ব্যাপারগুলো চারদিকে হয়ে চলেছে। সে ঘরে এল। রুনু এইমাত্র ঘর মুছে গেছে, মেঝেটা ভিজে। খাটে শুয়ে তার মনে হল আর একটু ঘুমিয়ে দিনটাকে ছোটো করে আনা যায়। সে চোখ বন্ধ করল।
ঘুমোতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হল গিরি। রুনুর অফিসে বেরোবার তোড়জোড় চোখ বুজেই সে দেখতে পেল।
”টাকা টেবিলে রেখে যাচ্ছি।”
”হুঁ।”
”দরজা বন্ধ করো।”
”যাচ্ছি।”
প্রতিদিন এই সময়ে সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। আজ আর গেল না। বাইরের দরজা ভেজিয়ে রুনু নেমে যাচ্ছে। গিরি শব্দ পেল না। আগে পেত।
ওপরতলার ছেলে দুটি স্কুলে যাচ্ছে। গিরি উঠে বসল। চার-পাঁচটা সিঁড়ির উপর থেকে ওরা গিরির ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাওয়াটায় লাফিয়ে পড়ে। প্রত্যেক তলায় ওরা এ-ভাবে লাফিয়ে পড়বে।
বারান্দায় এসে দাঁড়াল সে। রাস্তায় এখন ভিড় ব্যস্ততা শব্দ। বনমালী সরকার লেনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে বাজারে যাবার কথা ভাবল। দু’-তিন দিন ঘরে রাখা যায় এমন আনাজ সে কেনে। এ-ছাড়া অম্বরের জন্য ডিম ও কলা। রুনু পনেরো টাকা রেখে গেছে। অর্থাৎ মাছ কেনা যাবে না।
বাজারে মিনিট কুড়ির বেশি গিরি থাকে না। একসময় তার অভ্যাস ছিল বার দুয়েক বাজারটার দুই প্রান্ত ঘুরে দরদাম করে জিনিস কেনা। এখন আর তা করে না। ছক কেটে রেখেছে, সেই অনুযায়ী পরপর কিনে বেরিয়ে আসে। থলি ভরে উঠলে মুশকিল হয় একসঙ্গে ক্রাচ ও থলি ধরে চলতে।
বাজার থেকে বেরিয়েই বুলিকে তার মনে পড়ল। কৌতূহল বোধ করল, কী করছে এখন? কলেজ থেকে এতক্ষণ ফিরেছে নিশ্চয়। রান্না করে খাবে। হয়তো তারই ব্যবস্থা করছে। একবার দেখে এলে হয়!
দরজার পাল্লা দুটো ভেজানো। ইঞ্চি খানেক ফাঁক রয়েছে। গিরি দরজায় টোকা দিল।
বুলি অবাক হয়ে গেল ওকে দেখে।
”আমি ভাবলাম এইসময় কে আবার!”
”মোহন বুঝি এ-সময় আসে না?”
”না। সকালে তো কারখানায় যেতেই হয়।”
”চা খেতে এলাম। কালকের চা খুব ভালো লেগেছিল। তা-চাড়া, আসব বলেছিলাম মনে আছে।”
”ভেতরে আসুন।”
বুলি বেশ কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে। স্নান হয়ে গেছে। ভিজে চুল দু’ভাগে পাট করে আঁচড়ানো। মাথায় চুল কম। কপালের চামড়া খসখসে এবং ফ্যাকাশে। সারা শরীর হাহাকার করছে ভিটামিন ও স্নেহ পদার্থের জন্য। শাড়িটায় কোরা গন্ধ। বোধহয় মোহন কিনে দিয়েছে এখানে আসার পর।
”কী করছিলে, রান্না?”
”না। সামনের ঘরের একটা বাচ্চচা ছেলে আছে, লজেন্স দিয়ে ভাব করে ফেলেছি। কলেজ থেকে ফেরার সময় দাঁড়িয়ে থাকে আমার জন্য। ও ছিল এতক্ষণ। বারবার আসে-যায় তাই দরজা খোলাই রেখেছি। একা কি চব্বিশ ঘণ্টা কাটানো যায়।”
বুলি হাসছে। গিরিও হাসল। মোহন কি পছন্দ করবে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাব জমানো?
”আমারও একই অবস্থা। তবে রুনু চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত পনেরো ঘণ্টা থাকে।”
”তা হলে একই অবস্থা হল কী করে?”
”কেন, মোহন এখানে বেশ কয়েক ঘণ্টা তো থাকে।”
বুলির অক্ষত চোখটা স্থির হয়ে গিরির মুখ থেকে কিছু একটা পেতে চাইছে। অশ্লীলতা? গিরি অপ্রতিভ হতে থাকল।
”বাজার করে এলেন?”
চেয়ারটা বুলি এগিয়ে দিল।
”দু’-তিন দিন অন্তর বাজারে যাই। আজ সকালে তোমায় দেখলুম বাস স্টপে।”
”কী করে? ওহ, আপনার বারান্দা থেকে তো দেখা যায়। দাঁড়ান চায়ের জল বসাই।”
বুলি বেরিয়ে যেতেই হাত বাড়িয়ে গিরি পার্টিশনের পর্দাটা তুলল। লোহাটা একই ভাবে রয়েছে। চোরের ওপর বাটপাড়ি করেছে মোহন। গিরি পর্দা আর একটু তুলল। দেয়ালের কোণে ঘেঁষা খাটের দু’পাশে এক গজের মতো জায়গা। দেয়ালের ধারে বোধ হয় আলনা আছে। শাড়ির অংশ দেখা যাচ্ছে।
চটির শব্দ হল। গিরি পর্দা নামিয়ে দিল। বুলি চটি পরে ঘরের মধ্যে। রুনু এটা পছন্দ করে না।
”বাস বড্ড দেরিতে আসে।”
”ন’ নম্বর রুটে এই রকমই। দেখলুম একটা লোক তোমার কাছে সময় জানতে চাইল, তারপর কী বলল ও যেন!”
”বলল, সাতটার মধ্যে মেটেবুরুজ পৌঁছতেই হবে, সেখান থেকে কাজ সেরে কালীঘাট। আমাকে জিজ্ঞাসা করল সময়ে পৌঁছতে পারবে কি না। আচ্ছা আমি কী করে বলি সাতটার মধ্যে পৌঁছতে পারবে কি পারবে না। খুব হাসি পাচ্ছিল। আর একজন দাঁড়িয়েছিল, সে বলল, পৌঁছতে পারবেন।”
”আর একজন ছিল নাকি, দেখিনি তো!”
”হ্যাঁ ছিল।”
বুলি উপেক্ষা করে গেল অম্বরকে। অর্থাৎ গিরির কৌতূহলকে। গিরির তা ভালো লাগল।
”তুমি রাঁধবে না?”
”আমি তো আলুভাতে-ভাত ঘি দিয়ে খাব। মিনিট পনেরোতেই হয়ে যাবে।”
”মাছ তো খাও, না, ডিম?”
”মাঝে মাঝে।”
গিরি মেঝে থেকে বাজারের থলিটা তুলে নিয়ে দুটো মুরগির ডিম বার করল।
”আমি জানি তুমি আপত্তি করবে, ঠিক কি না?”
”করবই তো।”
গিরি ডিম দুটো থলির মধ্যে রেখে দিল।
”তা হলে আর আমার খাওয়া হল না।”
”কেন?”
”অনেক দিন খাই না তাই ভেবেছিলুম ওমলেট করিয়ে খাব।”
বুলি হেসে উঠল।
”দিন তা হলে?”
”না থাক। আমি একা খাব আর তুমি দেখবে তাই কখনও হয়! চক্ষুলজ্জা আছে না?”
”আচ্ছা আচ্ছা, আমি নয় একটু খেয়ে আপনাকে লজ্জা থেকে রেহাই দেব।”
গিরি চারটে ডিম বার করল। বুলি ভ্রূকুটি করেছে।
”এইটুকুটুকু দুটো ডিমের থেকে ভাগ দিলে আমার তো কিছুই থাকবে না। চারটের কমে হয় কখনও?”
