”সেই রকম ইঙ্গিতই দিয়েছ এর আগে।”
”তোমাদের মধ্যে কোনও ব্যাপার ঘটেনি?”
রুনু দু’হাতের ভরে সামনে ঝুঁকে গিরির মুখের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, ”তুমি এইসব চিন্তা শুরু করেছ, তার মানে বুড়ো হয়ে গেছ। তোমার এই ব্যাপারটা, সন্দেহ করাটা আমার বিশ্রী লাগে। আমি ঠিকই বুঝতে পারি, কিন্তু কেন, কেন? আমার মধ্যে কী দেখলে যাতে মনে হতে পারে আমি… অন্যে আসক্ত? তোমার মন নোংরা হয়ে গেছে, আমি বলছি।”
কাঁচা পিঁয়াজ আর রাই-এর গন্ধ গিরি পাচ্ছে রুনুর মুখ থেকে।
দুপুরে সিনেমা দেখে তা হলে ওরা রেস্টুরেন্টেই গেছল। কাটলেট, চপ, মোগলাই পরটা, ফিশ ফ্রাই এ-গুলোর সঙ্গেই কাঁচা পিঁয়াজ, রাই দেয়। পনেরো বছর লুকিয়ে রেখেছিল অনেক কথা। লুকিয়ে রাখতে ও পারে।
”বোধ হয় বুড়োই হয়ে গেছি।”
গিরি স্থির করল লোহাটার কথা রুনুকে বলবে না।
সাত
অন্যদিনের মতো গিরি ভোরবেলায় বারান্দায় এসে চেয়ারে বসল।
শেষ রাতে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বাতাস স্থির। অঘোর ঘোষ স্ট্রিট ভোরে আবছা আলোয় স্যাঁতস্যাঁত করছে। চেয়ারটা ভিজেছে। নিলাম থেকে কেনা কোনও এক বনেদি বাড়ির জিনিস। অত্যন্ত ভারী। গত বছর এক দুপুরে বৃষ্টির সময় গিরি এটাকে টেনে ঘরে ঢোকাবার চেষ্টা করেছিল, পারেনি।
অফিস থেকে ফিরে রুনু চেয়ারটাকে ঘরের মধ্যে আনে। চৌকাঠ পার করার জন্য তুলতে হয়েছিল। কুঁজো হয়ে ঝুঁকে যখন তুলছিল, গিরি তখন লক্ষ করে ওর ফুলে ওঠা কাঁধের পেশি, সংকুচিত কোমর, কঠিন নিতম্ব।
রুনুর দেহে তারুণ্য লুকিয়ে আছে, গিরি কাল থেকে এটা আবার আবিষ্কার করেছে। খেলোয়াড়ের মতো মেদবিহীন মসৃণ গড়ন। গত রাত্রে রুনুকে খাটে এসে শোবার জন্য বলতে ইচ্ছে করছিল। কাল সন্ধ্যা থেকে ওকে অপরিচিত একটা মেয়ের মতো মনে হচ্ছে। ওর গতিবিধি, কণ্ঠস্বর, চাহনি অশ্লীল অভিপ্রায়গুলোকে খুঁচিয়ে উত্তেজিত করছিল।
স্বচ্ছ এবং স্থির ভোরের বাতাস দীর্ঘ গভীর শ্বাস-দ্বারা ফুসফুসে টেনে গিরি তাজা বোধ করছে। রেলিংয়ের জাফরির ফাঁক দিয়ে সে রাস্তায় তাকিয়ে। প্রতিদিনের ভোরের মতোই একটি ভোর। শান্তভাবে একটি দিন শুরু হচ্ছে।
রুনু চা করছে। অম্বর এইমাত্র কলঘর থেকে বেরোল। ওরা আর গল্প করে না। দুটি সিদ্ধ ডিম খোসা ছাড়িয়ে টেবলে রাখবে রুনু। একজোড়া কলা থাকবে তার পাশে। অম্বর যখন খাবে, রুনু তখন কাজে ব্যস্ত হয়ে শোবার ঘর থেকে রান্নাঘর যাতায়াত করবে। নিশ্চয় অম্বরের চোখ অনুসরণ করবে ওকে।
”তোমার চা।”
গিরি হাত বাড়িয়ে কাপ নিল। রুনু ব্লাউজটা বদলেছে। বাসিচুল কানের পাশে ঝুলে রয়েছে। এখনও স্নান করেনি।
”আজ বাজারে যেতে হবে।”
”তোমার মাথা এখন কেমন?”
”ভালোই। বেলায় বাজারে ভিড় থাকে না, ধাক্কা লাগার ভয় নেই।”
”টাকা রেখে যাব।”
চা খেয়ে গিরি কাপটা মেঝেয় নামিয়ে রাখল। অম্বর মাঠে যাবে এখন। সামনের হপ্তা থেকেই লিগ শুরু হচ্ছে। তখন প্র্যাকটিস বন্ধ হবে। সকালে মাঠে যাবে না, ভাত এখানেই খাবে। ভিতর থেকে কথাবার্তার শব্দ আসছে না। ওরা বোধ হয় চুক্তি করে ফেলেছে গিরির সন্দেহ উদ্রেকের মতো কিছুই করবে না।
সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পর্যন্ত রাস্তাটা জাফরির একটা ফাঁক দিয়ে গিরি দেখতে পাচ্ছে। ওপারে বাস স্টপে একটি মেয়ে এসে দাঁড়াল। ছাপা সবুজ শাড়ির তলার অংশ দেখা যাচ্ছে। সে কুঁজো হল মেয়েটিকে দেখার জন্য।
বুলি!
হাতে খাতা বা বই ছাড়া আর কিছু নেই। এত দূর থেকে ওর কানা চোখটি দেখা যায় না। কলেজে যাচ্ছে। স্টপে আর কোনও লোক নেই। উত্তরে মুখ করে বাসের জন্য তাকিয়ে। ও হয়তো ভুলে গেছে রাস্তার ওপারে তিনতলার বারান্দায় গিরি থাকে। নয়তো কৌতূহলভরে দু’-একবার অন্তত তাকাত।
গিরি উঠে দাঁড়াল।
অম্বর এগোচ্ছে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর দিকে। লাল গেঞ্জিটার বদলে আজ হলুদ নকশার বুশ-শার্ট। দ্রুত পা ফেলা।
বুলি একবার মুখ ফিরিয়ে বাস স্টপে এসে দাঁড়ানো নতুন লোকটিকে দেখল। অম্বর ওর হাত দশেক তফাতে দাঁড়াল। দেখল বুলিকে। পকেট থেকে খুচরো পয়সা বার করে গুনল এবং দ্বিতীয়বার বুলির দিকে তাকাল, গিরি জানে এই দ্বিতীয়বার তাকানোটা কোনও মেয়ের দিকে নয়, বুলির কুরূপতার দিকে। এটার জন্য অন্তত দু’বার বুলির দিকে তাকাতে হয়।
সাধারণত যতক্ষণ তাকানো উচিত অম্বর তার থেকে বেশিক্ষণই তাকিয়েছে। বুলি আস্তে আস্তে দক্ষিণ দিকে মুখটা ফিরিয়ে নিল। হাত ঘড়িতে সময় দেখার জন্য মুখটি নামিয়ে রাখল। গিরির কষ্ট হচ্ছে বুলির এই করুণ অবস্থার জন্য। সে নিজে জানে কত অসহায় লাগে এই সময়টায়।
হয়তো বুলি অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই রকম চাহনির সঙ্গে। তবু একটি যুবকের চোখ থেকে মুখ সরিয়ে নিতে হচ্ছে এই বয়সি মেয়েকে, গিরি নিজেই আহত বোধ করল। বুলি জানে তার মুখে ওরা কী দেখে।
ক্রাচ দুটো রেলিংয়ে হেলান দিয়ে রেখে এক পায়ে দাঁড়িয়ে গিরি দু’হাত ওপরে তুলল। আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিতে। বুলির চোখ যদি এদিকে ফেরে। কিন্তু ও আবার উত্তরে তাকিয়ে রয়েছে। অম্বর আর ওর দিকে তাকায়নি। বুলি নিশ্চয়ই জানে, কেন তাকাচ্ছে না।
আর একটি লোক এসেছে। মাঝবয়সি, হাতে রেশনব্যাগ, খুবই অস্থির। বুলির কাছে সময় জানতে চাইল। জানার পর বিরক্তমুখে কিছু বলল। বুলি জবাব দিল। তারপরই একসঙ্গে তিনজন উত্তরে তাকিয়ে দু-তিন পা এগোল।
