”আমরা অন্য কোথাও বাসা বদল করি…”
রুনু জবাব দিল না। রুনু হাত বুলোচ্ছে তার ঊরুতে। স্থান বদল করলে মন বদলাবে যে-সব ব্যাপারে, এটা তা নয়। সে জানে, অম্বর চলে গেলেও সন্দেহের জ্বালা থেকে রেহাই পাবে না।
”কিংবা তুমি একটা কিছু কাজ নিয়ে যদি ব্যস্ত থাকতে পারো।”
”ঠোঙা বানানো?”
”ঠাট্টা নয়। সিরিয়াসলিই বলছি। মোটরের কাজটাজ কি একদম ভুলে গেছ?”
”হ্যাঁ।”
”ভাবছিলুম, মোহনবাবুর তো কারখানা আছে, সেখানে গিয়েও যদি রোজ বসো। আবার সব মনে পড়ে যাবে।”
”অনেক কিছুই মনে পড়ে যাবে।”
ছড়ানো বাঁ পায়ের পাশে ডান হাঁটুর নীচে অদৃশ্য পায়ের ওপর গিরি চড় মারল। মেঝেয় শব্দ হতেই সে হেসে উঠল।
”শব্দটা হত না যদি মোহন কথাটা কানে নিত। ওকে তিন দিন আগে একজন মেট জানিয়েছিল লিফটে লিক করছে, ভালভ কক থেকে হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে। লিফট বিপজ্জনক জেনেও আমাকে লরিটা চেক করতে পাঠিয়েছিল তলায় ঢুকে। হয়তো আশা করেছিল অ্যাকসিডেন্ট ঘটবে-আমি মরেও যেতে পারি।”
”কেন, তোমার মনে হল কেন?”
ওরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল। শুধু অন্যের চোখের সাদা অংশটুকু ছাড়া ওরা আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তার দ্বারা বুঝতেও পারছে না, কী ভাবছে অপরে। নীরবতা অসহ্য হয়ে উঠতে গিরি অবশেষে বলল,
”তোমার প্রতি দুর্বলতা ছিল।”
গিরি সাবধানে ‘আছে’ শব্দটি এড়িয়ে গেল।
”বহুকাল আগের কথা।”
”তোমার মা চলে যাওয়ার পর দু’মাস কীভাবে তোমার চলেছিল?”
রুনু চমকাল না। স্বাভাবিক স্বরে বলল, ”ভিক্ষে করে চলেছিল।”
”এড়িয়ে যাচ্ছ প্রশ্নটা।”
”তোমার কী মনে হয়?”
”মোহনের কথাই মনে হয়।”
”তুমি তা হলে জানো।”
”কী জানি? তুমি আমায় কিছু তো বলোনি।”
”বলার মতো নয় বলেই জানায়নি। দু’মাস হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকা যায় না। তোমার কাছে হাত পাততে পারতুম, কিন্তু ওকেই বেশি পাকা লোক মনে হয়েছিল। এমন ক্ষেত্রে, বেঁচে থাকার প্রশ্নটাই বড় হয়ে ওঠে। শরীরকে শরীর দিয়েই বাঁচানো ছাড়া আমার আর কোনও উপায় ছিল না। এত বছর পর ছেঁদো কথা বলে, তর্ক করে লাভ নেই। পছন্দ-অপছন্দ বা ভালোবাসাবাসি এ-সব আমাদের মধ্যে ছিল না। মোহন টাকা দিয়েছে আমি শোধ করেছি। জানতাম যতটুকু পাওয়া যায় তার বেশি কিছু ও চাইবে না। আত্মমর্যাদার প্রশ্ন নয়, বাঁচার ব্যাপারটাই বড় ছিল।”
গিরি চমকাল না, আহত বোধ করল না। তার বহুদিনের অনুমান মিথ্যায় পর্যবসিত হয়নি। রুনুকে দু’মাস টাকা দিয়ে সাহায্য করেছে মোহন। সে দুঃখবোধ করল রুনুর জন্য। কুৎসিত, রুচিহীন, স্বার্থপর একটা লোককে দু’মাস সহ্য করতে হয়েছে, এর থেকে অত্যাচার আর কী হতে পারে!
”ও রোজ আসত?”
”প্রায়ই।”
”থাকত?”
”রাতে? … মাঝে মাঝে থেকেছে।”
এত অসংকোচ স্বীকারোক্তি গিরি আশা করেনি।
”আমার সম্পর্কে কিছু বলত?”
”চাইত না তোমার সঙ্গে মেলামেশা করি।”
”কেন!”
রুনু হাসল, ”ও জানত তোমার আমার মধ্যে গভীর কিছু একটা আছে। সেইটাই ও নিজে চাইত।” রুনু আবার হাসল।
”আশ্চর্য, এ-সব কিছুই জানতাম না। তখন রোজই আমাদের দেখা হত কিন্তু তোমায় দেখে কিছুই বুঝতে পারতাম না। মোহনের সঙ্গেই তো তুমি থেকে যেতে পারতে।”
”সম্ভব নয়। ও লোকটা অন্যের জীবন দখল করে, জীবন পেতে চায়। কিছুদিন ধার দেওয়া যায়, চিরকাল কি সম্ভব?”
”আমিও তো তোমার কাছে জীবন ধার করে এখন বাঁচছি।”
”ও-কথা বোলো না। দুটো একরকম নয়। এখনই আমি বুঝতে পারছি কিছু একটা করছি। একটা উদ্দেশ্য কিংবা একটা দায়িত্ব যাই বলি না কেন, পালন করছি। তৃপ্তি পাই, খাটুনিকে বিরক্তিকর মনে হয় না। আমার জীবনের সব থেকে সুখের সময় এখনই বোধ হয়।”
”যা-সব বললে, তাতে তোমার ভয় করছে না? মনে হয়নি কি, আমি রেগে যাব, ঘেন্না করব তোমাকে?”
”বলার সুযোগ পেলে আগেই ওই ব্যাপারটা বলতাম। আমি তো জানি তুমি আমায় কত ভালোবাস।”
রুনু ঘুরে বসে গিরির বুকে হাতের পাঁচ আঙুলই স্পর্শ করল। অনুভবটা আজ দ্বিতীয়বার সে পেল। বুলি যখন ছুঁয়েছিল, সেটা প্রথমবার এত অসংকোচে তারা কখনও কথা বলেনি।
”আমারও একটা কথা বলার আছে। একদিন দুপুরে তোমার মার কাছে…”
”জানি।”
গিরি প্রশ্ন করল না কার কাছে ও শুনেছে। মোহন ছাড়া আর কেউ বলার নেই। হঠাৎ একটা ক্রোধ তাকে ঝাঁকুনি দিয়েই রগের কাছে কেন্দ্রীভূত হল। সেখান থেকে তার সারা দেহে একটা তরঙ্গ কেঁপে কেঁপে বয়ে গেল বার কয়েক। প্রাণপণে সে নিজেকে সংযত করে রাগ থেকে নিজেকে মুক্ত করল। বহুকাল ঘরের কোণে রাখা সিন্দুক সরিয়ে নিলে মেঝেয় তার পায়ের দাগ রয়ে যায়। বুকের মধ্যে গিরি দাগ দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু বুকটা বড় লাগছে, ফাঁকা বোধ করছে।
হঠাৎ সেই ফাঁকা জায়গাটায় একটা লোহাকে সে দেখতে পেল। দেয়ালে হেলান দেওয়া, খাট থেকে হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। রুনুকে এটার কথা জানানো যায়। ওর বুক থেকে পাষাণভার তুলে নিয়ে ওকে সে মুক্তি দিতে পারে।
”লোহাটা অম্বরের ঘরে আছে কি না দেখেছ?”
”লোহা! কোন লোহা?”
রুনুর বিস্মিত ত্রস্ত স্বরে গিরি মায়া বোধ করল। বুক থেকে হাতটা আস্তে তুলে নিল।
”তোমার কি ধারণা…”
গিরি মনে মনে হাসল। বলুক কী বলবে।
”অম্বর তোমার মাথায় মেরেছে? কেন মারবে?”
”আমি কি তাই বলেছি? তুমি অযথা সন্দেহ করছ। আমাকে মেরে ফেলবে কেউ এটা চিন্তাই করতে পারি না।”
