”পঁচিশ টাকা।”
”হল না।”
”আরও বেশি?”
”মোটেই না… আঠারো টাকা জোড়া। দারুণ সস্তা নয়?”
”সত্যি!”
”ছেঁড়া আছে পকেটের কাছে। বোঝাই যায় না এত সামান্য। সেলাই করে দেব।”
”আর কী আনলে।”
”টাকা কোথায় যে আনব। অফিসে তরুণবাবু বলল কাল দুটো কিনেছে আর গোটা তিন-চার আছে। এখুনি গেলে হয়তো পাওয়া যেতে পারে।”
”তখুনি চলে গেলে?”
”অফিসের সময়ের মধ্যে বেরোই কী করে। ছুটির পর হাঁটতে হাঁটতে গেলাম, কম দূর!”
”সঙ্গে কেউ ছিল?”
”সবিতা ছিল। ও কিছু কেনেনি।”
”আর কেউ?”
”না।”
কেটলির জল ফোটার শব্দ হচ্ছে। রুনু চা করতে উঠল। গিরি পাঞ্জাবি ভাঁজ করে রাখল।
”অম্বরকে আর দেখতেই পাই না। কখন আসে কখন যে যায়। রাত্রে পাখার শব্দটায় বুঝি ও আছে।”
”একটু রাত করে ফেরে। যখন আসে কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পাও না?”
”বুঝতে পারি না। খুব আস্তে আস্তে নাড়ে বোধহয়। ও কি রাত্রে খায়?”
”মাঝে মাঝে খেয়ে আসে।”
”বাইরে মাঝে মধ্যে খাওয়া মন্দ নয়।”
গিরি অপেক্ষা করল রুনুর জবাবের জন্য। কাপে চিনি ঢালছে একমনে হয়তো ও বলবে : ”চলো-না তা হলে আজ বাইরেই খেয়ে আসি। একদিন কচুরি খেতে বেরোব বলেও তো বেরোনো হল না।”
কিন্তু রুনু একমনে চামচ নাড়ছে। গিরি অপেক্ষায়।
হয়তো বলবে ; ”আজ আর রাঁধতে ইচ্ছে করছে না।”
”তা হলে চলো বাইরে কিছু খেয়ে আসি।”
”কোথায়?”
”যেখানে কম খরচে খাওয়া যায়।”
”কচুরি! মনে পড়লেই একটা দিনের কথাও মনে পড়ে।”
চায়ের কাপ কাছে টেনে নিয়ে গিরি চুমুক দিল। রুনু টেবিলের ওধারে মুখোমুখি বসল। ওরা কথা বলছে না কিছুক্ষণ।
বোধহয় সিনেমা থেকে বেরিয়ে কোথাও বসে ওরা খেয়েছে, তাই আর বাইরে বেরিয়ে খাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ নেই। রাতে কি রুনু খাবে? লক্ষ করতে হবে।
”অনেকদিন পর ব্লাউজটা পরলে আজ।”
তাড়াতাড়ি রুনু আঁচল টেনে কাঁধ ঢাকল।
”পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে, তাই ভাবলুম…”
”তোমাকে কিন্তু ভালোই দেখায়, অনেক কমবয়সি লাগছে।”
”কত কম?”
”বছর পনেরো।”
”তার মানে কুড়ি-একুশের মেয়ের মতো?”
”হ্যাঁ, যখন এই ফ্ল্যাটে প্রথম তুমি এলে।”
”তখন আমায় কেমন দেখতে ছিল মনে আছে তোমার?”
”আছে।”
”আমি কিন্তু জানি না কিছুই। যদি ছবি থাকত তা হলে সেটা দেখে মনে করার চেষ্টা করতে পারতুম। খুব শক্ত নিজের চেহারা মনে রাখা।”
”তোমার তো তবু ছোটোবেলার ছবি ছিল, আমার তা-ও ছিল না।”
”সে-ছবি আমায় খুব কষ্ট দিত। ভাবলে আজও দেয়।”
”কেন?”
খালি চায়ের কাপ টেবিলে নামিয়ে রুনু হাতটাও কাপের পাশে রেখে দিয়েছে। গিরি তার ওপর নিজের হাত রাখল। রুনু চোখ নামিয়ে নিরুত্তর রইল।
”আমি তোমার দুটো ছবিই দেখেছি।”
গিরি ভেবেছিল রুনুর চোখ সন্দিগ্ধ হবে। দুটো ছবি তাদের পক্ষেই দেখা সম্ভব যারা ভিতরের ঘরে গেছে। সে-ঘরে একটি উদ্দেশ্যেই বাইরের লোক যায়।
হঠাৎ ম্লান, ক্লান্ত দেখাল রুনুকে। ওর দিকে তাকিয়ে থেকে গিরি নিজেও ক্লান্তিবোধ করল। হয়তো রুনু জানে, গিরি এক দুপুরে গিয়েছিল ভিতরের ঘরে।
একটা ভোঁতা যন্ত্রণা গিরির মাথার মধ্যে ফেঁপে উঠছে। তার ইচ্ছে করছে সেটার মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে দিতে। আর ইচ্ছে করছে রুনুর সঙ্গে কথা বলতে। মনের মধ্যে যত ধোঁয়াটে সন্দেহ, কুৎসিত ধারণা দমবন্ধ করছে, যখন তখন কুরে খাচ্ছে, সেগুলো গলগলিয়ে বার করে দিয়ে হালকা হতে।
একটা সুযোগের অপেক্ষা সে অনেকদিন ধরে করছে। কথা বলে মনটাকে হালকা করার সুযোগ। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হত বোঝা নামানো মানেই রুনুর মনের ওপর বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। ব্যাপারটা নিছকই স্বার্থপরতা হবে।
”চলো বারান্দায় গিয়ে বসি।”
একটি মাত্র চেয়ার। দু’জনে মেঝেয় বসল। পর্দার তলা দিয়ে ঘরের আলো বারান্দায় পড়েছে। রুনু তার গোড়ালিতে আঙুল ঘষছে চেয়ারে ঠেস দিয়ে। রেলিংয়ে পিঠ দিয়ে গিরি।
”তোমার আর ব্যথা করে রাত্রে?”
ঘুমের মধ্যে নড়াচড়ায় গিরির মাথায় লেগে যেতে পারে, তাই রুনু এখন মেঝেয় শোয়।
”দিনেরবেলায় করে।”
”দুপুরে ঘুমোও?”
”না।”
”তা হলে কী করো, বসে বসে শুধু ভাবো?”
”হ্যাঁ।”
”কী ভাবো? আমার কথা?”
”হ্যাঁ, তোমার কথা। তোমাকে সুখী করতে না পারার কথা।”
”আমি সুখী নই, এটা বুঝলে কী করে?”
”নিজের দিকে তাকিয়ে। কিছু কিছু ব্যাপার আছে যা ভাবতে ভালো লাগে। নিজেকে শক্তিমান বিচক্ষণ স্বাবলম্বী এইসব, আমাকে ছাড়া পৃথিবীতে তোমার কোনও ভরসা নেই, কোনও প্রয়োজন নেই, অবলম্বন নেই।”
রুনু কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। হাত বাড়িয়ে গিরির বাম ঊরুর ‘পরে রাখল। মাথা নাড়ল গিরি।
”আমি কিন্তু সুখী।”
”আমি সম্পূর্ণ তোমার উপর নির্ভর করে বেঁচে আছি।”
”দিনরাত কি তুমি এই চিন্তাই করো?”
গিরি ইতস্তত করল।
”একা থাকলে মানুষ চিন্তা করবেই। যখন তুমি বেরিয়ে যাও কেমন অদ্ভুত একটা অস্বস্তি, ভয় আমাকে পেয়ে বসে।”
”আমি তা হলে চাকরি ছেড়ে দেব?”
”না না না, এটা পাগলের মতো কথা হল। খাওয়া পরার কথা বাদ দিলেও তুমি তো আর আমার মতো অঙ্গহীন নও। তোমার শরীরের, মনের জন্যই এই ছোট্ট জায়গায় বন্দি হয়ে থেকে কী লাভ?”
”তা হলে…”
”দাঁড়াও শেষ করতে দাও আমাকে।”
নিজেকে গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করে গিরি বুঝল সম্ভব নয়। আবেগ তাকে মথিত করছে।
”আমি বেঁচে আছি তোমারই হাতে… তুমি বাইরে যাও, সেটা অন্য জগৎ… যখন ফিরে আস সেই জগতের রূপ রস গন্ধ মনে মাখিয়ে নিয়ে। আমরা দু’জনে দু’রকম মন নিয়ে বাঁচছি। আমি আমার এই খুদে জগতে বসে নানা দুঃস্বপ্ন গড়ছি আর তার মাঝেই চাইছি, আন্তরিকভাবেই, তোমাকে ভালোবাসতে। কী যে কঠিন ব্যাপার একা এ-ভাবে সময় কাটানো। মাঝে মাঝে তোমার বাবাকে মনে পড়ে। একা চুপচাপ বসে আকাশে তাকিয়ে দিন কাটাতে সত্যিই ক্ষমতার দরকার।”
