বুলি উঠে পার্টিশনের ভিতরে গেল এবং মোহনের হাতঘড়িটা আনল।
”পৌনে চার! সাড়ে চারটের মধ্যে আমায় কয়লাঘাটায় পৌঁছতেই হবে।”
মোহন খাড়া হয়ে বসে ঘড়িটা পরছে। গিরিকে তা হলে এবার উঠতে হবে। ইচ্ছে করছে কিছুক্ষণ থাকতে।
এতক্ষণ সে রুনুকে, দুপুরে তার অফিস পালিয়ে কোথাও যাওয়ার কথাটা ভুলেছিল। আবার একা ফ্ল্যাটে চিন্তাগুলো পিঁপড়ের মতো ছেঁকে ধরবে।
ক্রাচ বগলে দিয়ে গিরি দরজার দিকে এগোল।
”চলি রে।”
”আচ্ছা।”
বলল না আবার আসতে। চায় না তার এই ডেরাটায় ভিড় হোক। কিংবা দ্বিতীয় কোনও পুরুষ বুলির সামনে আসুক। গিরিকে পুরুষ হিসেবে মোহন ভাবে কি?
পিছনে বুলি দরজা বন্ধ করতে আসছে। দরজার উপরে ছিটকিনিটা লাগানো রয়েছে। খুলতে গিরির অসুবিধা হবে ভেবে সে পিছন থেকে হাত বাড়াল। ব্যান্ডেজ ঘেঁষে বুলির হাতটা উঠতেই, লাগার ভয়ে আপনা থেকেই গিরি অস্ফুটে ”আঃ” বলে মাথাটা সরিয়ে নিল।
”লাগল?”
বুলির ডান হাতের আঙুলগুলো গিরির বাম বাহুটা আঁকড়ে ধরল অপ্রস্তুত হয়ে। গিরি ওর একমাত্র চোখটিতে, ভয় লজ্জা বেদনা একসঙ্গে দেখতে পেল।
বুলি ধরে আছে হাতটা। গিরির মনে হল তার সারা শরীর থেকে স্নেহলোভী একটা উত্তাপ হাতের ওই জায়গাটার দিকে হামা দিয়ে এগোচ্ছে। আলতো করে সে বুলির আঙুলগুলোর ওপর ডান আঙুল রাখল।
”সামান্য। এখনও ভালো শুকোয়নি।”
মিথ্যাকথা। কিন্তু মিথ্যা বলার এত ভালো সময় কমই জীবনে আসে।
”ব্যথা দিলাম তো। আমারই দোষ।”
রুনুর মতো স্বর কিন্তু আরও অস্ফুট, কোমল, করুণায় ঘন। গিরির অনেক ভালো লাগল বুলির একটা চোখের দুঃখ, সমবেদনা। ও আমাকে অনেক বেশি বুঝবে রুনুর থেকে।
”দেখবি শরীর কেমন ঝরঝরে ফিট হয়ে যায়। ব্যথাট্যাথা একদম মিলিয়ে যাবে।”
ঘরের মধ্যে থেকে চেঁচিয়ে মোহন বলল। গিরি হাতটা তুলে ছিটকিনি খুলল।
”ব্যথা লাগেনি আমার।”
”ঠিক বলছেন!”
”হ্যাঁ।”
বুলি দরজা বন্ধ করছে। একটা পাল্লা ভেজিয়েছে। একটা চোখ আর ক্ষতভরা একদিকের গাল গিরি দেখতে পাচ্ছে।
”আবার আসব।”
অনুমতি নয়, প্রশ্ন নয়, ঘোষণাও নয়। একটা সিদ্ধান্ত জ্ঞাপনের মতো গিরি বলল।
বুলি মাথা হেলিয়ে দরজা বন্ধ করল।
ছয়
রুনু ফিরল সন্ধ্যা নামার পর।
বারান্দায় অন্যদিনের মতো গিরি আজও অপেক্ষা করছিল চেয়ারে বসে। জাফরির ফাঁক দিয়ে সে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর দিকে তাকিয়ে একটার পর একটা বাসকে উত্তরে যেতে দেখলেই ভেবেছে, এইটায় রুনু আছে। অফিস থেকে ফেরার বাস অঘোর ঘোষ স্ট্রিট থেকে পঞ্চাশ গজ উত্তরে থামে।
এত দেরি আর কখনও হয়নি। গিরির হিসাব কষাই আছে। লামসডেন অ্যান্ড মেহরোত্রা থেকে বেরোবে পাঁচটা দশ বা পনেরোয়, লালদিঘিতে আসতে মিনিট পাঁচেক। বাস পাওয়া এবং উঠতে পারার সময়ের হিসাব করাটাই হয় মুশকিলের। তবে পৌনে ছ’টা নাগাদ প্রায় প্রতিদিনই রুনু ফেরে।
বাস বা ট্রাম বন্ধ থাকলে হেঁটে ফেরে। তাতে আরও পঁয়তাল্লিশ মিনিট বেশি লাগে। ছ’টার পর রুনু বাইরে থেকেছে, গিরির মনে পড়ে না।
মোহন ঠিকই দেখেছে। আজ রুনুর দেরি হওয়ারই কথা। যদি সিনেমায় গিয়ে থাকে,তা হলে ওরা পাঁচটা কুড়ি বা সাড়ে পাঁচটায় হল থেকে বেরুবে। তবু ছ’টার মধ্যেই ফেরা সম্ভব। ছ’টা বেজে গেছে। তা হলে ওরা কোনও রেস্টুরেন্টে ঢুকেছে। সেখানে কম করেও আধ ঘণ্টা। সাড়ে ছ’টায় ফিরতে পারে।
রুনু ফিরল প্রায় সাতটায়।
তার আগে গিরি একবার চা তৈরি করে খেয়েছে। তখন সে মোহন এবং বুলির কথা ভেবেছিল। তার ভালো লাগছিল বুলিকে। অতটুকু মেয়ের পক্ষে বিপজ্জনক কাজই, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসা। মোহন নিশ্চয় এমন কোনও চাপ তৈরি করেছে যে-জন্য বুলি ওর সঙ্গে বসবাসে বাধ্য হয়েছে। মোহনকে ভালোবাসার প্রশ্ন ওঠেই না।
মোহনই খাটের পাশে লোহাটা রেখেছে। ওখানে রাখার কী দরকার? কেউ আক্রমণ করলেই হাত বাড়িয়ে যাতে পায়। কে আক্রমণ করবে কাকে ওর ভয়? ওর বউ, বুলির বাবা নাকি বুলিকেই ভয়!
কলেজে বা মোহনের সঙ্গে থাকার সময় ছাড়া বুলি কীভাবে সময় কাটাত? বই পড়ে? সম্ভব কি পড়ার বই নিয়ে বসে থাকা! গিরির নিজের কথা মনে পড়ল। পনেরো বছর এই ফ্ল্যাটে সে কাটাচ্ছে। দিনে একবার হয়তো বেরোয়। দু’-তিন দিন রাস্তায় পা পড়েনি এমনও হয়েছে।
দ্বিতীয়বার সে চা তৈরির জন্য কেটলিতে জল ভরছে তখন দরজায় কড়া নাড়ল।
রুনু এসেছে। প্রতিদিনের মতো একই ভঙ্গিতে শব্দটা হয়েছে।
”যাই।”
প্রতিদিনের মতো গিরি সাড়া দিল। রুনুর হাতে প্যাকেট। দরজায় খিল দেবে রুনু। তাই দিল।
”চায়ের জল বসাচ্ছিলাম।”
”আমারও দিয়ো।”
রুনু ঘরে গেল কাপড় বদলাতে। অন্যান্য দিনের থেকে আজ চঞ্চল দেখাচ্ছে। লাবণ্য যেন অনেক বেড়ে গেছে। জ্বলজ্বল করছে চোখ মুখ।
চায়ের কেটলি বসিয়ে গিরি অপেক্ষা করতে লাগল টেবিলে। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে রুনু এল।
”কী আছে?”
রুনু শুধু হাসল দড়ির গিঁট খুলতে খুলতে।
”তোমার পাঞ্জাবি একজোড়া, খদ্দরের।”
গিরি উৎসাহভরে ঝুঁকে পড়ল।
”কোথায় কিনলে?”
”খাদি গ্রামোদ্যোগের রিডাকশনে। কত দাম নিয়েছে বলো তো?”
পাঞ্জাবি দুটো হাতে নিয়ে কাপড় পরীক্ষা করার ছলে গিরি দামের টিকিট দেখে নিল। এত দেরি করে ফেরার কারণ পাঞ্জাবি কিনতে যাওয়া নয়। এই দিয়ে অজুহাত তৈরি নেহাতই ছেলেমানুষি হবে। ও নিজে থেকেই বলুক কেন দেরি হল, দুপুরে বেরিয়েছিল কেন।
