”রুনুকে বলিস ওর বাবা গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে।”
”সে কী, কবে?”
”দিন পাঁচেক আগে। পচা গন্ধ পেয়ে পাশের বাড়ির লোক পুলিশে খবর দেয়। আজই আমি শুনলুম, ও-পাড়ারই কাছাকাছি থাকে এক ফিটারের কাছে। ঘরের জিনিসপত্তর বেচেই খাচ্ছিল। শেষে বেচার মতোও কিছু ছিল না। দিন দশেক উপোস দিয়ে আর সহ্য করতে পারেনি।”
গিরির প্রথমেই মনে হয়েছিল, রুনুর ছবি দুটোও কি বেচে দিয়েছে? যে-ছবিতে ও বাবার কোলে।
ভেবেছিল শোনামাত্র রুনু কান্নায় ভেঙে পড়বে। কিন্তু এত ঘৃণা ওর মধ্যে আছে গিরি জানত না।
”ভালোই করেছে, বেঁচে গেল।”
গিরি থ’ হয়ে তাকিয়েছিল। রুনু তখনও মর্নিং কলেজের ছাত্রী, দু’বেলা রান্না করে। সারা দুপুর বাড়িতে থাকে।
”তোমাকে তো হবিষ্যি টবিষ্যি করতে হবে।”
”কিছু করব না।”
রাত্রে বুকে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল রুনু।
”আমার মা অমন হত না। শুধু বাবার জন্যই… শুধু বাবার অক্ষমতার জন্যই।”
গিরি তখন জানত না সে নিজে কিছুদিন পর অক্ষম হয়ে পড়বে। রুনু কি কারুর কানের কাছে মুখ রেখে এখন বলছে, ”আমি এমন ছিলাম না, আমি ভালোবাসতাম ওকে!”
গিরি আবার ব্যান্ডেজে আঙুল ঠেকাল।
”যন্ত্রণা হচ্ছে? দাঁড়া ট্যাবলেট দিচ্ছি।”
মোহন ক্যানভাস পার্টিশনের পর্দা সরিয়ে ভিতরে গেল। সেই সময় গিরি ঘরের ভিতরটা দেখার জন্য মুখ ফেরাল এবং চমকে পাংশু হল তার মুখ।
ভাঙা অ্যাকসেলের টুকরোটা খাটের পিছনে দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখা। খাট থেকে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাবে। আরও দেখল, সিঙ্গল বেড খাটে নতুন পালিশ, রঙিন বেডকভার, পাশাপাশি দুটো মাথার বালিশ।
গিরি ঝপ করে যেন একটা গর্তের মধ্যে পড়ে গেছে। এখানে কেন লোহাটা? কী করে এল?
তা হলে মাথায় ওটা দিয়ে কেউ মারেনি। এতদিন অযথা বাজে সন্দেহ করে এসেছে। রুনুকে তো প্রকারান্তরে জানিয়েওছে এই সন্দেহের কথা। বেচারা রুনু।
”দুটো ট্যাবলেট একসঙ্গে খা। দাঁড়া জল আনি।”
মোহন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। গিরি ঝুঁকে পর্দাটা তুলল।
সেইটেই। একদিকের মাথার ইঞ্চি খানেক ত্যারচা কাটা, লম্বায় সেই মাপেরই, কালচে। ওটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গিরির মনে হল, সে গর্তের আরও নীচে নেমে যাচ্ছে। শুধু নিজেই সে এতদিন একটা কদর্য ভয়ংকর চিন্তার চাপে নুয়ে থাকেনি, সেটা রুনুর মধ্যেও ঢুকিয়ে দিয়েছে। রুনু হয়তো অম্বরকেও বলেছে। ওরা কী ভাবছে গিরির সম্পর্কে!
এখন সে কী বলবে রুনুকে? লোহাটা পাওয়া গেছে মোহনের এই গোপন ডেরায়, তোমরা নিরপরাধ! মনের কুৎসিত চেহারাটা ওরা দেখে ফেলেছে। সেটা ঢাকতে, গোপন রাখতে দেরি হয়ে গেছে।
মোহন চুরি করে এনেছে। রুনু বা অম্বর লক্ষ করেনি। দরজার পাশেই জানলা, টুক করে তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেছে। চুরির পুরনো অভ্যাসটা মোহন ছাড়তে পারেনি। ওদের লক্ষ করা উচিত ছিল। নিশ্চয় নিজেদের রান্নার ছলে দু’জনে ব্যস্ত ছিল। কেন ব্যস্ত থাকে? শাস্তি ভোগ করুক তা হলে অপরাধী সন্দেহের পাষণভার বুকে নিয়ে।
গর্ত থেকে খানিকটা উঠে গিরি যখন নিরাপত্তার কথা ভাবছে তখনই চোখে পড়ল ঘরের দরজায় বুলি, হাতে চায়ের কাপ। ওর একমাত্র চোখটি বিস্ময়ে ভরা। গিরি অপ্রতিভ হয়ে ধরে থাকা পর্দাটা ছেড়ে ছিল। বুলির পিছনে মোহনকে দেখা গেল জলের গ্লাস হাতে।
”আগে এ-দুটো খেয়ে নে, তারপর চা।”
ট্যাবলেট দুটো জল দিয়ে পাকস্থলীতে নামিয়ে গিরি চায়ের কাপ তুলে নিল বুলির হাত থেকে। আঁচলটা বুকে পিঠে জড়িয়ে বাঁ হাতে ধরা। দেখার মতো কিছুই নেই। যথাসাধ্য সপ্রতিভ থাকার চেষ্টা ও নম্রতা ছাড়া।
”সেদিন থিয়েটার দেখতে গেছলি?”
”না। আমি আর রুনু বিকেলে বেরিয়েছিলাম।”
”রুনুও যায়নি!”
অবাক হবার কী আছে! ওর কি ধারণা রুনু খুব ফুর্তিবাজ চপল?
”দাঁড়িয়ে কেন?”
গিরি এখন ঠিক করতে পারছে না বুলিকে আপনি না তুমি বলবে। বয়সে অত্যন্ত ছোটো, কিন্তু অপরিচিত তো বটে। যদি রাস্তায়, দোকানে বা ট্রামে এই বয়সি কোনও মেয়েকে কিছু বলার দরকার হয় তা হলে কি সে ”আপনি” সম্বোধন করবে না?
আর একটা চেয়ার দেয়ালে ঠেস দেওয়া। সেটা পেতে বুলি আলতোভাবে বসল।
”গিরির কথা তো তোমায় বলেছি, খুব কাছেই থাকে।”
”এখান থেকে বেরিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে পড়লেই ওপারে তিনতলার বারান্দাটা।”
”এত কাছে!”
গলার স্বরটি গিরির ভালো লাগল। সরল কৌতূহল ঝিকমিক করছে একটা চোখে।
”আমার সম্পর্কে কী বলেছে ও?”
বুলি একবার তাকাল মোহনের দিকে।
”বলেছিলেন গিরি নামে এক বন্ধু আছে, তার একটা পা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল অনেকদিন আগে। তখন আপনারা দু’জনে একজায়গায় কাজ করতেন।”
”আর?”
”আপনার স্ত্রী চাকরি করেন, খুব সুন্দর দেখতে।”
গিরি দেখতে পাচ্ছে মোহনের মুখ। রুনু সম্পর্কে কী গল্প করেছে বুলির কাছে? নিশ্চয় বলেনি অবিবাহিত দম্পতি, পাতানো বউয়ের রোজগারে বসে বসে খায়। বন্ধুকে ছোটো করে দেখালে মোহন নিজেই গুরুত্ব হারাবে বুলির কাছে।
”আমি কিন্তু তুমি বলব।”
”নিশ্চয়, কত ছোটো আমি আপনার থেকে।”
”বাজার করে কে?”
”বুলি মাছ খায় না। বাজারের যা-কিছু আমিই এনে দিয়েছি। তিন-চার দিনের মতো। একজনের জন্য আর রেশনকার্ড করাবার দরকার কী, চাল-টাল বাজার থেকে কিনলেই হবে। গ্যাসেই রান্না হয়, বাসন মাজামাজির পাট নেই। ক’টা বাজে দেখো তো।”
