মোহন দরজা খুলল। অত্যন্ত অবাক হয়েছে।
”তুই, এখন!”
গিরি হাসল। মোহন খালি গায়ে লুঙ্গি পরে। জিরজিরে বুক। পায়ে হাওয়াই চটি।
”পড়ে গেছলাম কলঘরে, ক’দিন হাসপাতালে ছিলাম। দেখ, খুঁজে ঠিকই বার করেছি। তোকে দেখলাম স্কুটারে ঢুকলি, তাই-”
”ভেতরে আয়,” এই কথাটা শোনার জন্য গিরি অপেক্ষা করতে লাগল। দরজার একটা পাল্লা বন্ধ রেখে মোহন দাঁড়িয়ে।
”এই দুপুরে, মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, কেউ বেরোয়!”
মোহন শুধু ভর্ৎসনাই করল না, বিরক্তিও ফোটাল গলার স্বরে।
”একা দুপুর কাটানো যে কী কষ্টকর।”
”এত বছর তা হলে কাটল কী করে? রুনু তো অনেক বছর চাকরি করছে।”
”তুই এত কাছে আস্তানা করেছিস, দেখে আর থাকতে পারলাম না।”
”আসার সময় রুনুকে যেন দেখলুম, এসপ্ল্যানেডে কে সি দাসের সামনে। রাস্তা পার হবার জন্য দাঁড়িয়ে।”
”ওখানে! এখন?”
”তাই তো দেখলুম। হাতে ব্যাগ, ডিপ খয়েরি রংয়ের শাড়ি।”
গিরির নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। মোহন ঠিকই দেখেছে। কিন্তু রুনু অফিস থেকে বেরিয়ে এখন কোথায় যাচ্ছে? সিনেমায়?”
”রুনু তো সাদা শাড়ি পরে বেরিয়েছে।”
”তা হলে অন্য কেউ।”
”চা খাওয়াতে পারবি। আসলে চা খাব বলেই তোর এখানে এলুম। নিজে হাতে তৈরি করে খেতে ইচ্ছে করল না।”
মোহন কয়েক সেকেন্ড কী ভেবে দরজার বন্ধ পাল্লাটা খুলে সরে দাঁড়াল। লম্বা এক ফালি গলি। তার একদিকেই ঘর। কলঘর, রান্নাঘর তারপর বড়ো শোবার ঘর। সেটাকে ক্যানভাসের পার্টিশনে দু’-ভাগ করা। একটি বেতের সোফা, স্টিলের ফোল্ডিং টেবিল প্লাস্টিকের রঙিন চাদরে ঢাকা। তাতে পরিপাটি রাখা বই ও খাতা, পেনসিল, কলম। দুটি স্টিলের চেয়ার। দরজা জানালায় নতুন পর্দা। পার্টিশনেও পর্দা। সেদিকে গিরি তাকাল না।
মোহন সোফায় বসে গিরিকে একদৃষ্টে দেখছে। ঘরে আর কোনও জিনিস নেই তাকাবার মতো। গিরি টেবিলে কনুই রেখে চেয়ারে বসে। মনের মধ্যে ঝাপসাভাবে রুনুকে সে দেখতে পাচ্ছে রাস্তা পার হতে। মোহন অত্যন্ত ধূর্ত, ওর চোখ ভুল দেখে না। সাদা শাড়ির কথাটা নিশ্চয় বিশ্বাস করেনি।
”বুলি।”
মোহনের মৃদু গলার ডাক ঘরের অর্ধেকও অতিক্রম করেনি, গিরি তার পিছনে পর্দা সরাবার শব্দ পেল। সে মুখ ফেরাল।
ফ্রক পরিয়ে তেরো-চোদ্দো বছরের মেয়ে বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। রুগণ, অপুষ্ট দেহ। মুখে বসন্তের ক্ষতের দাগ যে এতটা গভীর হবে সে ভাবেনি। বাঁ চোখটিতে মণি নেই তাই বন্ধ পাতা ভিতরে ঢুকে আছে। বুলিকে কখনও কোনও যুবক কামনা করবে না। এটা মোহন জানে, বুলিও হয়তো জানে। গিরি জানল।
”গিরি।”
বুলি পলকে গিরির দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা ঝোঁকাল। গিরি তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে টলে গেল এবং টেবিলটাকে ধরে সামলাল।
বুলি দু’হাত এগিয়ে ঝুঁকেছিল তাকে সাহায্য করতে এটা সে লক্ষ করল। ঠিক রুনুরই মতো। প্রথম সাক্ষাতেই গিরি কৃতজ্ঞতাবোধ দ্বারা বিব্রত হয়ে নমস্কার করবে কি করবে না দ্বিধায় পড়ে, ঠিক করল এতটুকু মেয়ের কাছে এটা বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।
”আমার কথা বুঝি ওকে বলেছিস?”
”গিরি চা খেতে এসেছে, হবে?”
”হ্যাঁ করে দিচ্ছি।”
”আমাকেও দিয়ো।”
বুলি ঘর থেকে ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে গেল। ভ্রূ কুঁচকে মোহন ওর বেরিয়ে যাওয়া দেখল।
”এখন এসে তোর অসুবিধা করলাম।”
”না, কী আর অসুবিধে। বুলি এই সময়টায় পড়ে।”
মিথ্যে কথা, পড়ার কোনও চিহ্ন টেবিলে নেই। নিশ্চয় দু’জনেই শুয়েছিল পার্টিশনের ওপারে। চা খেয়েই চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিল গিরি।
”একা পড়ে?”
”আমার কি পড়াবার মতো বিদ্যে আছে! অনেক এম এ বি এ পাশ মেয়ে তো টিউশনি করে দুপুরে, তাদেরই কাউকে রাখার কথা বলেছি।”
”ছেলে মাস্টারই ভালো পড়ায় শুনেছি।”
মোহন আঙুলের নখ চোখের সামনে ধরে মনোযোগে দেখতে দেখতে বলল, ”হুঁ।”
বিনা পয়সায় পেলেও পুরুষ মাস্টার রাখবে না। মোহন চায় না, বুলির মনে বয়সোচিত এমন কোনও আকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন ঝলক দিক, যা পয়সা বা স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে মেটানো যাবে না। এই ভাবে ব্যাপারটা দেখতে গিয়ে গিরি অস্বস্তিতে পড়ল। রুনু সম্পর্কেও তো সে এই রকমই ভাবে। রুনু কি এখন সিনেমা হলে অম্বরের পাশে বসে ইংরেজি ফিল্ম দেখছে। ইংরেজি ছবিতে চুমু, জড়িয়ে ধরা, কাপড় খুলে বিছানায় যাওয়া এ-সব তো সামান্য ব্যাপার। ইংরেজি কথা দু’জনেই বোঝে না, ওরা যাবে শুধু দেখতে।
মাথাটা টিপ টিপ করছে। গিরি ব্যান্ডেজে আঙুল ছোঁয়াল। রুনুর আকাঙ্ক্ষা যে কত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, এটাই তার প্রমাণ।
”কী করে পড়লি? হাসপাতালে পর্যন্ত যেতে হল!”
”তোর জন্য এটা হয়েছে। বোতলটা রেখে এলি, লোভ সামলাতে পারলাম না। ঢক ঢক শেষ করে রাত্রে কলঘরে গিয়ে পড়লুম কলটার উপরে। মাথায় এমন গর্ত হয়েছে যে ডাক্তারেরা মনে করেছিল যেন কেউ ডান্ডা দিয়ে মেরেছে।”
”ও-ভাবে খাওয়াটা উচিত হয়নি। অনেক দিন পরে তো।”
”রুমু কেমন আছে?”
”ভালোই। এখনও স্কুলে যাওয়া বারণ, তবে বাড়ির মধ্যে হাঁটা-চলা করে। হপ্তাখানেক পর আর একটা কার্ডিওগ্রাম করতে হবে। …তুই বুলির কথা কাউকে বলেছিস নাকি?”
”রুনুকে? নাঃ।”
”বলাবলি না হওয়াই ভালো।”
”রাতে থাকিস?”
”না।”
”এই বাড়ির কি পাড়ার লোকেরা কৌতূহল দেখাবে কিন্তু।”
মোহন হাসল। ও-সব ওর জানা আছে। রুনুদের বাড়ি সম্পর্কে পাড়ার লোক হাসাহাসি করত। কেউ কথা বলত না। প্রতিবেশীদের সম্পর্কে রুনুর আড়ষ্টতা আজও কাটেনি। ওর মা যে হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে গেল! মোহনই একদিন ইউনিভার্সালে রুনুর বাবার খবর দেয়।
