মোহনকে বয়সের তুলনায় অন্তত পনেরো বছর বেশি দেখায়। এটা ও জানে বলেই খুঁতওলা মেয়ে বেছে নিয়েছে। গিরির মনে হল, সে নিজেও কি তা হলে বুড়ো হয়ে গেছে? নয়তো রুনু সম্পর্কে সে এত ভীত সন্দিগ্ধ হয় কেন!
এইসব চিন্তা আর নয়। গিরি চোখ বুজে দ্রুত মনে করে যেতে লাগল প্রতিবেশীদের, ইউনিভার্সাল গ্যারেজের লোকদের, হাসপাতালের রুগি, ডাক্তার, নার্সদের, নিজের বাপ-মা, স্কুল এবং কিছুক্ষণে মধ্যেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ঢুলতে শুরু করল।
মিনিট পনেরো পর গিরি চোখ মেলে মাথা তুলল। টিপটিপ যন্ত্রণা। আলনায় রুনুর ব্লাউজ এমনভাবে ঝুলছে, সামান্য বাতাসেই পড়ে যাবে। গুমোট গরম, বাতাসের চিহ্নমাত্র নেই। ঘরের সব কিছুই অনড় নিষ্পন্দ। ব্লাউজটার রাখা দেখে বোঝা যায় রুনু তাড়াহুড়ো করে অফিসে বেরিয়েছে। হাতাবিহীন চেলিধরনের ব্লাউজটার আর একটা জোড়া আছে, সেটা পরেই বেরিয়েছে। অন্তত ছয় ইঞ্চি পিঠ ও পেট দেখা যায়।
গিরি পছন্দ করে না খাটো ঝুলের হাতাবিহীন ব্লাউজ। দু’জনে রাস্তার বেড়াবার সময়, গিরি বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেছে এই রকম জামা পরা মেয়েদের দেখে। তবু পুজোর সময় রুনু ওই ব্লাউজ করিয়েছে।
”আমি যা-তা বলেছি দর্জিকে। করতে দেবার সময় বার বার করে বলে দিয়েছিলাম ঝুল বেশি হবে, হাতা হবে। এত দামি রুবিয়া ভয়েলের কাপড়টাই নষ্ট হল।”
গিরি বিরক্তি প্রকাশ করেছিল দর্জির অন্যমনস্কতা সম্পর্কে। কিন্তু এখন সে বিশ্বাস করে রুনুর নির্দেশেই এটা তৈরি হয়েছে। গিরি যা পছন্দ করে না সেটা পরা ওর উচিত কি অনুচিত সে প্রশ্ন উঠছে না। নিজে থেকেই ব্লাউজ দুটো তুলে রাখতে কিংবা অফিসের কাউকে দিয়ে দিতে পারত উপহার হিসাবেই। টাকা তিরিশেক খরচ হয়েছে। গিরির জন্য এটা অনায়াসেই করতে পারত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রুনু সুন্দর হয়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু শরীরের অংশ দেখিয়ে সেটা জাহির করা কিংবা পুরুষদের দৃষ্টি টেনে আনার কী এমন দরকার হল? ওকি শুধুমাত্র গিরির চাহনি বা স্পর্শে খুশি নয়? ভালোবাসা, পোশাক বা প্রসাধনের তোয়াক্কা করে না, ভালোবাসাই লাবণ্য এনে দেয়। গিরির ভালোবাসা এতই অভ্যাস মতো হয়ে গেছে যে এটাকে নিশ্চয় স্থায়ী একটা কিছু হিসাবে ও ভাবে। এটা জিইয়ে রাখার আর দরকার মনে করে না। কেন?
গিরি বিছানা থেকে নামল। একটু চা হলে ভালো লাগবে বা গুমোট কিছুটা সহনীয় হবে। তারপর মনে হল মোহনের সঙ্গে দেখা করে এলে কেমন হয়! খুঁজে বাড়িটা বার করা এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। স্কুটারটা নিশ্চয় বাইরেই থাকবে। ওটা দেখেই বাড়িটার খোঁজ পাওয়া যাবে। বুলি নিশ্চয় রান্না করে খায়। চা ওখানেই পাওয়া যাবে।
গিরি কাচানো পাজামা-পাঞ্জাবি পরল। এটা বুলির কথা ভেবেই। পরিচ্ছন্ন হয়ে সে ওর সামনে প্রথমবার হাজির হতে চায়। আয়নায় দাড়ি দেখল। চার দিনের দাড়ি, অর্ধেকই পাকা। সাবান মাখিয়ে কামাতে গেলে দেরি হবে। জলে ভিজিয়ে ক্ষুর দিয়ে চাঁছতে শুরু করল।
তখনও মুখের চামড়ায় জ্বালা করছে যখন সে রাস্তায় নামল। রোদের ঝাঁঝে চোখ মেলে দূরে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। বাড়ির ছায়ায় বসে এক বুড়ি ভিখিরি বাটি থেকে খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। একবার মুখ তুলে তাকাল। তারপাশেই একটা ষাঁড় উদাসীন চোখে জাবর কেটে চলেছে। বাড়ির রকে মাথার নীচে ব্যাগ রেখে জুতো সারাইওয়ালা গামছায় মুখ ঢেকে ঘুমোচ্ছে। নরম পিচে টায়ারের চড়চড় শব্দ ছাড়া গিরির কানে আর কিছু ধাক্কা দিল না।
সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পার হয়ে সে বনমালী লেনে ঢুকল। তিন-চার বারের বেশি সে এই রাস্তায় ঢোকেনি। পুরনো বাড়িগুলোর মধ্যে নতুন তৈরি একটা বাড়ির দরজা ঘেঁষে মোহনের স্কুটারটা দেখতে পেল।
দরজাটা খোলা। তিনতলা বাড়ির প্রতি তলায় দুটি করে ছোটো বারান্দা। অর্থাৎ ছটি ফ্ল্যাট। এর কোনটিতে মোহনকে পাওয়া যাবে?
দরজা পেরিয়েই মিটার বক্সগুলো। তার পাশে দেওয়ালে সারি দিয়ে চারটি লেটার বক্স। একটিতেও মোহনের নাম নেই। প্রত্যেক নামের আগেই মিস্টার শব্দটি আছে। নামের নীচে ফ্ল্যাট নম্বরগুলো থেকে গিরি বুঝে গেল একতলার দুটি ফ্ল্যাটের একটিতেই মোহন থাকতে পারে।
গ্রীষ্মের দুপুরে ভুল দরজার কড়া নেড়ে ঘুমভাঙানো ঝুঁকির কাজ। দুটি দরজা একই রকমের। একটি পাল্লায় খড়িতে লেখা, ”মধুমিতা”। বিবর্ণ হয়ে গেছে নামটা, এটা হতে পারে!
পিছনে দরজা খোলার শব্দে গিরি মুখ ফেরাল। এক প্রৌঢ়া মহিলা। চশমা, সাদা শাড়ি এবং ছাতা দেখে মনে হয় পড়ানোই পেশা। তার পিছনে একটি বছর সাত-আটের মেয়ে দরজা বন্ধ করার জন্য দাঁড়িয়ে। অবাক হয়ে সে ক্রাচ দেখছে।
এই ফ্ল্যাট কিছুতেই নয়। তবু নিশ্চিন্ত হবার জন্য গিরি বিপরীতের বন্ধ দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ”নতুন ভাড়াটে?”
মেয়েটি মাথা হেলাল।
”নাম জানো?”
”না।”
”কে কে আছে?”
”একজন মেয়ে একা থাকে।”
”একটা চোখ কানা, মুখে বসন্তর দাগ?”
গুটিয়ে সেফটিপিন দিয়ে আটকানো পাজামার পায়ের দিকে কৌতূহলে তাকিয়ে থেকে মেয়েটি আবার মাথা হেলাল এবং গিরির মাথার ব্যান্ডেজে চোখ রাখল।
কড়া থাকলেও গিরি টোকা দিল। মোহন এইভাবে টোকা দিত রুনুদের বাড়ির দরজায়। সেটা মনে পড়তেই, তখুনি সে কড়া নাড়ল মৃদুভাবে। পিছন ফিরে তাকাল। মেয়েটি লক্ষ করছে তাকে।
