সম্ভবত এই বিছানায় দু’জনে শুয়েছে। গিরি বালিশ শুঁকল। রুনুর চুলের গন্ধ। উপুড় হয়ে শুঁকতে শুঁকতে বিছানাটার প্রতিটি ইঞ্চি পরীক্ষা করল। অম্বরের অস্তিত্ব না পেয়ে হতাশ হল। ওর গায়ের গন্ধটা তার জানা। হয়তো অম্বরের বিছানায় রুনুর গন্ধ পাওয়া যাবে।
ওরা স্বাধীন ছিল পাঁচটা দিন-রাত।
বিছানায় বসে আছে গিরি। রেলিংয়ের উপর দিয়ে রাস্তা দেখতে পাচ্ছে। হঠাৎ মোহনকে দেখল স্কুটারে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে। অপেক্ষা করছে গাড়ি দেখার জন্য পিছনে ঘাড় ফিরিয়ে। ডান দিকে বনমালী সরকার লেনে ঢুকবে। ও জানে না গিরি মাথায় চোট পেয়ে হাসপাতালে ছিল। জানলে নিশ্চয় দেখতে যেত। গিরির ইচ্ছা করল ওকে চিৎকার করে ডাকতে।
ক্রাচটা বগলে দিয়ে সে দ্রুত বারান্দায় এল। মোহনের স্কুটার তখন বনমালী সরকার লেনে ঢুকে পড়েছে। তা হলে এখন বুলি এখানেই থাকে!
গিরি অদ্ভুত রকমের একটা অনুভবের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। কুৎসিত ভয়ংকর চিন্তা থেকে রেহাই পাওয়া যায় কী করে। চাবি ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেডিয়ো বন্ধ করার মতো চিন্তা বন্ধ করার কোনও উপায়ের কথা বার বার ভেবেছে। কিন্তু একটা চাবিও পাওয়া সম্ভব হয়নি।
বহুবার চোখে ভেসে উঠেছে রুনুর বাবার বসার ভঙ্গি, আকাশে তাকানো চোখজোড়া। তখন লোকটির স্ত্রী হয়তো ভিতরের ঘরে প্রাইভেট কথা বলায় ব্যস্ত। রুনুর কি এমন কোনও ভিতরের ঘর আছে? চোখ বন্ধ করেও গিরি ছবি দেখা বন্ধ করতে পারেনি। বরং এই ছবির পরই ভেসে উঠেছে আর একটা-সে নিজে বসে আছে শূন্য দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে।
তা হলে বুলি এখন মোহনের ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটে রয়েছে। নয়তো মোহন এই দুপুরে কী জন্য আসবে। একটা চোখ নষ্ট হওয়া, মুখে বসন্তের আঁচড়, বয়সে মোহনের মেয়ের থেকে দু’-চার বছরের বড়, সবে কলেজে ঢুকেছে। গিরি আঁচ করার চেষ্টা করল বুলিকে কেমন দেখতে।
রোদটা বারান্দা থেকে সামনের বাড়ির দেয়ালে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বারান্দার মেঝে এখনও তেতে। গিরি ঘরের মধ্যে ফিরে এল। ঘামছে সে। পাশের ঘরে সারারাত খটখট শব্দ হচ্ছিল পাখাটা থেকে। পুরনো পাখার বুশ বেয়ারিং ক্ষয়ে গেছে নিশ্চয়। এই ঘরের জন্য একটা পাখা ভাড়া করলে মন্দ হয় না। ইচ্ছাটা সে মুহূর্তেই পরিত্যাগ করল, কেননা পাখা ভাড়ার টাকা রুনুকেই দিতে হবে। উপরন্তু দেড়শো টাকা কমে যাচ্ছে সামনে মাস থেকে। অম্বর কয়েক দিন পরই সম্ভবত চলে যাবে।
ঘাড়ের পিছনে দুটি বালিশ দিয়ে মাথাটাকে উঁচু রেখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে অনুমান করতে শুরু করল, বুলিকে কেমন দেখতে। ছিপছিপে, লম্বায় পাঁচ-চার কি পাঁচ-তিন, শ্যাম বর্ণ। একটা চোখ না থাকায় অন্যটি কোমল এবং বিষণ্ণ। নাকটি উঁচু যার ফলে পাশ থেকে অন্যদিকের চোখটি দেখা যায় না। ওর কোন চোখটা নষ্ট? বাঁ দিকের হলে ডান দিক থেকে লোকে যাতে দেখে সেইভাবে মুখ ফিরিয়ে থাকে নিশ্চয়ই। হাতের আঙুল লম্বা কিন্তু তালুটা তুলনায় ছোটো, নরম এবং রেখাগুলো গভীর। হয়তো কনুইয়ের নীচে লোমগুলো বড়ো।
গিরি হেসে উঠল শব্দ করে। প্রায় ষোলো-সতেরো বছর আগের রুনুকেই সে মনে করার চেষ্টা করছে। বুলি এখন সেই বয়সিই। নিশ্চয়ই তখনকার রুনুর মতোই হাসে ঠোঁট দুটি দু’পাশে ছড়িয়ে নাকের পাশে ভাঁজ তৈরি করে, দাঁত না দেখিয়ে। ওই বয়সি মেয়েরাই, যখন ব্যক্তিত্ব সংগ্রহ করতে শুরু করেছে, তখন তাদের মধ্যে অনেক মিল ধরা পড়ে। চলায়, চাহনিতে, বসায় এমনকি বিস্ময় বা বিরক্তি প্রকাশেও। বুলিকে মনে মনে গড়ে তুলতে গিয়ে বারবার গিরি দেখতে পেল রুনুকে। গিরিই বলেছিল, ”তোমার মা-র কাছে যাব এবার।”
”কেন?”
অসম্ভব চমকে উঠেছিল রুনু।
”কোনও দরকার নেই যাবার।”
”তা হলে কাকে বলব বিয়ের কথা? তোমার বাবা তো…”
”কাউকে বলতে হবে না। আমি নিজেই আমার গার্জেন।”
এই ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছিল। আগের ভাড়াটেদের ফেলে যাওয়া ছেঁড়া কাগজ, ঝুড়ি, ভাঙাচোরা জিনিসগুলো তখন ছড়ানো। বিনা সেলামিতে মোহনই ফ্ল্যাটটা পাইয়ে দিয়েছিল। তিন মাসের ভাড়া অগ্রিম দিয়ে রুনুকে দেখাতে এনেছিল সে।
দিন চারেক পরই সন্ধ্যাবেলা কড়ানাড়া শুনে গিরি দরজা খুলে দেখে রুনু। কাঁধে ঝোলা ভরতি বই, হাতে ছোটো সুটকেস।
”চলে এলাম।”
”মানে!”
”এখানেই থাকব আজ থেকে।”
সেইদিন থেকে ওরা একসঙ্গে বাস করছে। নিজের গার্জেন যে ও নিজেই সেটা আজও গিরি ভুলতে পারে না। বিয়ের কথা ওরা তোলেনি, তার দরকারও বোধ করেনি। এতই ওরা স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল।
কিন্তু বুলির পক্ষে এটা সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই রুনুর মতো শুধুই ভালোবেসে মোহনের সঙ্গে সে পরিবার ছেড়ে বাস করতে আসেনি। গিরি তখন যুবক, অবিবাহিত, মোহনের এই সুবিধা নেই। হয়তো টাকা দিয়ে ঘাটতিটা ঢেকে নিয়েছে। বুলির বাবার মাইনে বাড়িয়ে দিয়েছে হয়তো।
অত্যন্ত চতুর। মোহন ঝোঁকের মাথায় কখনও কখনও কিছু কাজ করেছে সেটা ব্যবসা সংক্রান্ত, কিন্তু জীবন সংক্রান্ত ব্যাপারে অতি কৃপণ, সাবধানী।
”মিসেস মজুমদারের কাছেও আমি ও-সব পকেটে নিয়ে যাই।”
বুলি যদি কুদর্শনা না হত, মোহন ওকে নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি কিছুতেই করত না। কেউ ওর দিকে তাকাবে না, কারুর সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কও গড়ার প্রশ্নই উঠবে না। মোহন নিশ্চিন্ত। এই রকম একটা ভাবনা রুনু সম্পর্কেও গিরির মাথায় মাসখানেক আগে এসেছিল। কুদর্শনা বা বিকলাঙ্গ হয়ে যাক কিংবা হঠাৎ বৃদ্ধা হয়ে যাক রুনু। তা হলে সব লোক গিরির দিকেই তাকাবে সমবেদনার দৃষ্টিতে, পুরুষদের ক্ষুধার্ত চাহনি চাইবে না রুনুর শরীর।
