”পাখা দিয়ে গেছে?”
”আজ দুপুরে দিয়েছে।”
”কেমন পাখাটা, ঠিক মতো লাগিয়েছে তো?”
”রেগুলেটর ছিল না, এনে লাগাল। পাখাটা বেশ পুরনো, হাঁড়িটায় অনেকগুলো ঘুলঘুলি। তবে ভালো হাওয়া দেয়।”
”রাতে কাপড় কেচে তুমি কলঘরের মেঝেয় জল ঢেলে দাওনি!”
”বোধহয় না।”
”কিন্তু তুমি তো এ-সব ব্যাপারে খুঁতখুঁতে।”
রুনুর মুখের অভিব্যক্তি দেখার জন্য গিরি চোখ খুলল। মুখটা নামিয়ে রাখা। অপরাধীর মতো।
”পুলিশের লোকটা জানতে চাইল, কেউ আমাকে মেরেছে কি না।”
”কে মারবে? মারার মতো কে আছে?”
গিরি উত্তর না দিয়ে জানলার দিকে মুখ ফেরাল। একটা দোতে বামনা ঘুড়ি আকাশে তোলপাড় করছে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে। দ্বিতীয় কোনও ঘুড়ি দেখা যাচ্ছে না।
”আমারই দোষে হল। যদি জল ঢেলে ধুয়ে দিতুম…”
”কয়লাভাঙা লোহাটাকে সেদিন সকাল থেকে দেখিনি।”
গিরি আড়চোখে দেখল। মনে হল রুনুর মুখ থেকে যেন রক্ত শুষে নেওয়া হয়েছে।
”আমি তো খেয়াল করিনি। কয়লা তো ভেঙেই দোকান থেকে পাঠিয়ে দেয়, তাই ওটার কোনও দরকারই হয় না।”
”আমি আগের দিনও ওটা দেখেছিলাম।”
গিরি ডান হাতের দুটো আঙুল মাথার ব্যান্ডেজে ছোঁয়াল। রুনুর চোখে বিভ্রান্তি।
”লোহাটা খুঁজেছিলাম যখন তুমি বেরিয়েছিলে অম্বরের সঙ্গে, পাইনি কোথাও। অম্বরের ঘরটা অবশ্য তালা দেওয়া ছিল।”
ওরা অনেকক্ষণ কথা বলেনি।
”তুমি একটা ভয়ংকর রকমের বাজে চিন্তা করছ।”
রুনু উঠে চলে যাওয়ার পর গিরির মনে হয়েছিল, বোধহয় ঠিক কথাই বলেছে। কিন্তু ওরাও কি ভয়ংকর চিন্তার প্রভাবে এই কাজটা করেনি?
.
বালিশে থুতনি রেখে গিরি উপুড় হয়ে শুয়ে। খোলা বারান্দার দরজা দিয়ে তার দৃষ্টি, জাফরির ওপারে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পর্যন্ত। আট দিন হল সে হাসপাতাল থেকে ফিরেছে।
যে ক’দিন সে হাসপাতালে ছিল রুনু প্রতিদিন গেছে। চুপ করে বসে থাকত। গিরিও কথা বলত না। কখনও তাদের চোখাচোখি হত। দু’জনেই চোখ সরিয়ে একই সঙ্গে জানলার বাইরে তাকাত। সাধারণ কথা মাঝে মাঝে বলেছে যখন নীরবতাটা তিক্ত হয়ে পড়ত। যেমন, ”বাসে কি খুব ভিড় ছিল আজ? নার্স বলেছিল আজ ট্রাম ধর্মঘট হয়েছে।”
”না তেমন কিছু ভিড় নয়।”
কিছু পরে গিরি আবার জিজ্ঞাসা করে : ”ট্যাক্সিতে শেয়ারে যেতে পারো।”
”কী দরকার।”
কিছু নয়। কী দরকার। গিরির কাছে এ-সব কিছু নয়, এ-সবের দরকার নেই কারণ গিরি ওই জগতের কেউ নয়। ও-সব নিয়ে বলতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে বলেই দায়সারা উত্তর। ”তেমন কিছু নয়।” প্রতিদিনই যখন বাড়ি ফেরে তখন দেখে মনে হয় না কষ্টকর একটা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এল। জীবনের স্রোত থেকে যেন সরে এল। বিশেষ একটা জীবনের, যেটা অনেক উত্তেজক ঘটনাবহুল ঘরে যাপন করা তার জীবন থেকে।
রুনুকে সে জীবনে কী দিতে পেরেছে?
একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে গিরির চোখ জ্বালা করছে। বালিশে মুখ চেপে ধরল। তারা স্বামী-স্ত্রী নয় বটে, কিন্তু পুরুষ এবং নারী। বহু বছর একসঙ্গে বাস করছে, একই বিছানায় শুচ্ছে। ও ভোরে উঠে উনুন ধরায় বাসন মাজে, ঘর মোছে, চা করে অফিস যায়। ফিরে এসে ঘরের মধ্যে কাটায়। আত্মীয় নেই, প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করে না, বন্ধুদের বাড়ি যায় না। কখনও হয়তো তারা দু’জনে পথে বেরোয়, একই পথ ধরে একই বাড়ি, একই দোকান, একই দৃশ্য দেখে ফিরে আসা। ভরা যৌবনা মেয়েমানুষের পক্ষে এটা কি কোনও জীবন? তার কি কোনও অধিকার আছে রুনুকে এই সংকুচিত জীবনের গণ্ডির মধ্যে দণ্ডভোগ করতে বাধ্য করানোয়?
কিন্তু এরজন্য একটা দীর্ঘদিনের পরিচিত লোককে মেরে ফেলতে চাওয়া কেন? রুনু তো অনায়াসেই তাকে ত্যাগ করে চলে যেতে পারে। যে-কোনও লোকের সঙ্গে এমনকী অম্বরের সঙ্গেই যেতে পারে। অম্বর নিশ্চয় ওর থেকে সাত-আট বছরের ছোটো। তাতে কিছু এসে যায় না। স্থূল ধরনের রুচি, সরল এবং ভোঁতা বুদ্ধি। শুধুই শরীরের ভরে জীবনটাকে দাঁড় করিয়েছে, রুনুর মাংস ছাড়া আর কিছু ওর প্রয়োজন হবে না। রুনু পাবে দু’পাওয়ালা একটা লোক, যে ওকে খুশি রাখার জন্য ব্যস্ত হবে, আমোদ দেবে। ওকে দু’হাতে তুলে নিয়ে অন্তত এক হাত হাঁটার ক্ষমতা তো অম্বরের আছে।
দূরত্বটা কম করেই সে ধরেছে। হাসপাতাল বেড থেকে চাকা লাগানো চেয়ারে বসে লিফটে এবং একতলায় ট্যাক্সির কাছে সিঁড়ি পর্যন্ত তাকে আনা হয়েছিল। ক্রাচ দুটো নিয়ে আসার কথা রুনুর মনে ছিল না। কিন্তু অম্বরকে সঙ্গে এনেছিল। চেয়ার থেকে উঠে কারুর কাঁধে ভর করে এক পায়ে সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নামলে মাথায় ধাক্কায় লাগবে।
দু’জন ওয়ার্ড বয়কে ডেকে গিরিকে তুলে ট্যাক্সিতে বসাবার কথা যখন হচ্ছে, তখন অম্বর ওকে হাত ধরে তুলে দাঁড় করায় এবং পরমুহূর্তে পাঁজাকোলা তুলে সিঁড়ির চারটে ধাপ নেমে ট্যাক্সির দরজার কাছে এসে নামিয়ে দেয়।
বড়জোর পনেরো সেকেন্ড। গিরি নিজেকে অত্যন্ত অসহায়, পরনির্ভরশীল বোধ করেছিল। বিশেষত রুনুর সামনে এটা ঘটায়।
রুক্ষ স্বরে সে বলেছিল, ”ক্রাচ আনোনি কেন?”
পাঁচ দিন সে হাসপাতালে ছিল, পাঁচ দিন পাঁচ রাত ওরা দু’জন এই ফ্ল্যাটে ছিল। ওই পাঁচটি দিনের যে-সময়টুকু অজ্ঞান হয়ে বা ইনজেকশন দ্বারা ঘুমিয়েছে তার বাইরে জাগ্রত অবস্থাটুকু অসহনীয় হয়ে উঠেছিল শুধু এই চিন্তায়। ডাক্তার বলেছিল আরও চব্বিশ ঘণ্টা কাটিয়ে যেতে। সে রাজি হয়নি।
