ঝুঁকে দু’হাত বাড়িয়ে গিরি রেলিংয়ের জাফরি মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে, মাথাটা ঝুলিয়ে দিল। কেন নয়? সবই সম্ভব। হাঁফাচ্ছে সে। হাঁ করে আছে। গোঙানির মতো আওয়াজ বেরিয়ে এল। কীসের অসম্ভব? মাকে দেখেছে রুনু। টাকার জন্য সেই আধবুড়ি, পেটমোটা মেয়েমানুষটা লোক নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করেছে। দরকার রুনুরও আছে। ওর মজবুত নরম শরীর উচ্ছল প্রাচুর্যে ভরিয়ে নেবার দরকার কি বোধ করে না? করে নিশ্চয় করে।
রেলিংটা ধরে গিরি ঝাঁকাবার চেষ্টা করল। চোখ খুলতে পারছে না। মাথার মধ্যে নাগরদোলার ওঠা-নামা চলছে। হাতড়ে হাতড়ে ক্রাচ দুটো ধরে উঠে দাঁড়াল। এখুনি কলঘরে গিয়ে তাকে বমি করতে হবে।
অন্ধকার ঘরে রুনু খাটে শুয়ে আছে কি না দেখার জন্য গিরি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিছু দেখতে পাচ্ছে না, বুঝতে পারছে না। না থাকলে কোথায় যাবে। কলঘরে? দালানটা অন্ধকার। ওর মুখস্থ কোথায় কী আছে। বাঁ দিকে দরজা তার পাশে জুতোর র্যাক, তার পিছনে জানলা, তাতে কয়লা ভাঙার লোহাটা… ওটাকে সে আজ দেখতে পায়নি স্নান করে বেরিয়ে। চোরাই মাল। গেছে ভালোই হয়েছে।
কলঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে গিরি নিজেকে স্থির রাখার চেষ্টা করল। ভারী চোখের পাতা তুলতে গিয়েও পারল না। কেউ কি কলঘরে রয়েছে নাকি?
”কে?”
গিরি অপেক্ষা করল সাড়া পাবার জন্য। ”ধ্যাৎ!” কলঘরের দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকেই অস্পষ্টভাবে মনে হল, সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। কেউ যেন তার ক্রাচজোড়া টানছে তলা থেকে। রুনু কি? সামনে হুমড়ি খেয়ে ঝুঁকে পড়ল গিরি এবং মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারাবার আগে মুহূর্তের জন্য তার মনে হল কয়লা ভাঙা লোহাটা তার মাথায় কে যেন মারল।
পাঁচ
হাসপাতালে জ্ঞান ফিরে আসার পর যে-লোকটি তাকে প্রশ্ন করেছিল, ”আপনার কি মনে হয় কেউ আপনাকে আঘাত করেছিল?” তার মুখটি গিরি মনে করার চেষ্টা করল।
নীল বুশ শার্ট। অতি সাধারণ মুখ। দাঁতগুলোয় পানের ছাপ। দেশলাই কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছিল।
”কেন?”
”থানা থেকে আসছি। এ-রকম কেসে আমরা স্টেটমেন্ট নিয়ে থাকি। আপনার একটা পা নেই, তার ওপর মদ খেয়েছিলেন, তবু ফর্মালিটিজ শেক…”
”না আমার কিছু বলার নেই।”
বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল গিরি। লোকটার স্বর, বসার ভঙ্গি, দাঁত খোঁচানো তার অসহ্য লাগছিল।
বিকেলে রুনু এসেছিল। একা। মুখটা শুকনো। গিরি নার্সের কাছে শুনেছিল প্রায় আটাশ ঘণ্টা পর তার জ্ঞান আসে। সকালে পুলিশের লোকটা যে-টুলে বসেছিল সেটাই টেনে নিয়ে রুনু বসে। চোখে উদ্বেগ ও স্বস্তি একের পর এক ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। রুনু আলতো করে হাত রাখল তার বুকে। ওর বসার ভঙ্গিতে করুণা, চাহনিতে মমতা।
তখন হঠাৎই গিরির মনে হয়েছিল, গত পনেরো বছরে তারা পরস্পরের এত কাছাকাছি কখনও আসেনি। এত কাছে, যার থেকে দুটি প্রাণের পক্ষে আরও বেশি সম্ভব নয়। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার হাসপাতালে রুনু তার পাশে বসল। মাঝে পনেরোটা বছর। হয়তো ও বদলায়নি।
গিরি তখন প্রতিটি সেকেন্ডে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। তার শরীর ও মন আরও তীক্ষ্ন অনুভূতি লাভ করছে, হৃৎপিণ্ড থেকে আবেগ ছিটকে পড়ছে সারা দেহে। মাথার মধ্যে যন্ত্রণাটা অসহ্য লাগছে না। মনের মধ্যে বুদবুদের মতো ফেটে পড়ছে অজস্র দ্রুত চিহ্নসমূহ-হঠাৎ ধরাপড়া কোনও কথার সুর, তীব্র গন্ধ, পলকে দেখা কোনও চাহনি, শয়নের ভঙ্গি, এমনকী রাস্তা থেকে ভেসে আসা চিৎকারও। অন্য আর এক পৃথিবীর সঙ্গে তার যোগসূত্র এইসব ছবি, গন্ধ, ধ্বনি খোদিত হয়েছে পনেরো বছর ধরে।
রুনু বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
”পুলিশের একটা লোক এসেছিল। জিজ্ঞাসা করছিল কেউ আমাকে মেরেছে কি না।” সঙ্গে সঙ্গে রুনুর হাতটা একবার আড়ষ্ট হয়ে গেছল।
”তুমি কী বললে?”
গিরি একদৃষ্টে ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিল। আতঙ্ক ছাড়া আর কিছু চোখ দুটোয় ছিল না। কৌতূহল নয় কেন? ওটাই স্বাভাবিক হত! সে অপেক্ষা করে ছিল কতক্ষণে আতঙ্কটা অপহৃত হয়। রুনুর চোখে অস্বস্তি ফুটে উঠেছিল।
”আমি কিছু বলিনি।”
অস্বস্তিটা যেন আরও বাড়ল।
”কিছু বলোনি?”
”না। বলার কিছু নেই। একটা পা নেই, তার ওপর মদ খেয়েছিলাম, পড়ে গিয়ে চোট পাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার।”
”কলঘরটা সাবান জলে হড়কানো ছিল। যখন আমি আর অম্বর তোমায় তুলছিলাম তখন ও একবার হড়কে গেছল।”
”জানলে কী করে?”
”অম্বরই শব্দ পেয়েছিল। আমাকে ডেকে তোলে।”
”তুমি ঘুমোচ্ছিলে?”
”হ্যাঁ।”
”ও কি ঘরে ঢুকে ডেকে তুলল?”
”হ্যাঁ।”
মাথার মধ্যে যন্ত্রণাটা আবার ফিরে আসছে। গিরির মনে হল সে আবার তার নিজের জগতে, অন্ধকার দমচাপা কুটুরিতে ঢুকছে। চোখ বন্ধ করে বুকে হাত রাখল। রুনু তার হাতটা আগেই তুলে নিয়েছে।
”ডাক্তার বলেছে দিন চার-পাঁচ তোমাকে এখানে থাকতে হবে। এক্স-রে করে খুলিতে ক্র্যাক পাওয়া গেছে। তবে ভয়ের কিছু নেই।”
”তুমি কি অফিস থেকে আসছ?”
”না। টেলিফোন করে জানিয়ে দিয়েছি এক সপ্তাহ যাব না।”
”একা আছ?”
গিরি চোখ খুলল না মুখের দিকে তাকাবার জন্য।
”অম্বর আছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ও চলে যাবে। আপাতত এক বন্ধুর বাড়িতে উঠবে।”
গিরি চুপ রইল।
”ওকে ক’টাদিন থাকতে বলেছি তোমার জন্যই, আমাকে সাহায্য করতে।”
