”অম্বরকে চলে যেতে বলেছি। আমাদের অসুবিধে হচ্ছে, বিশেষ করে তোমার।”
বাড়ির দরজায় ওরা এসে গেছে। গিরি নীরবে সিঁড়ি দিয়ে উঠল। অত্যন্ত কৌতূহলী দোতলার লোকেরা। একটি দুটি কথা থেকেই ওরা পুরো ব্যাপারের অর্থ নিংড়ে বার করে নিতে পারে। তিনতলায় পাশের ফ্ল্যাটে তাসুড়েদের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। রুনু তালা খুলে সরে দাঁড়াল। এটা ওর অভ্যাস। অন্ধকার ফ্ল্যাটে ঢুকতে ওর ভয় করে।
গিরি দালানের আলো জ্বেলে দিয়ে শোবার ঘরে এল। অতি ক্ষীণ রামের গন্ধ ঘরে ভাসছে। বারান্দায় এসে চেয়ারে বসল। রুনু শাড়ি বদলাচ্ছে ঘরে, তারপর আলো জ্বালবে। দুপুর থেকে বোতলটা টেবিলের উপরই পড়ে আছে।
মোহন সত্যিই বদলে গেছে নয়তো অতখানি রাম ফেলে রেখে যেত না। অসৎ, মিথ্যাবাদী, লোভী লোকটা স্থিরভাবে বাকি জীবনটাকে নাড়াচাড়া করতে চায়। ওকে প্রশংসা করা উচিত। মোহন অত্যন্ত উদ্যমী। চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নেমে হাজার হাজার টাকা রোজগার করেছে। ওর এক ধরনের ধৈর্য আছে। গিরি অনুভব করল, সেটা তার ধৈর্যের থেকে সম্পূর্ণই আলাদা। হয়তো মোহনের দুটো পা আছে বলেই।
ঘরে আলো জ্বলল।
”তুমি কি এখন চা খাবে?”
”না।… কিন্তু কী অসুবিধের কথা ওকে বলেছ?”
”বলেছি, ওই ঘরটা আমাদের দরকার। মাথার যন্ত্রণায় রাত্রে তোমার ঘুমের অসুবিধা হয়। ডাক্তার বলেছে সম্পূর্ণ নির্জন ঘরে না ঘুমোলে, যন্ত্রণা সারবে না।”
”এ-সব মিথ্যে কথা।”
”আমি নিরুপায়। অম্বর অবশ্য বিশ্বাস করেনি।”
”কী বলল?”
”ও বুঝতে পেরেছে কেন আমি চলে যেতে বলেছি।”
”কী বুঝতে পেরেছে?”
কতটা চেঁচিয়ে উঠেছে, সেটা গিরি অনুমান করতে পারল রুনুর এক-পা পিছিয়ে যাওয়া থেকে। লজ্জা পেল সে।
”আমি ওর চলে যাওয়া চাই না। আমি অপেক্ষা করতে চাই সুখী হওয়ার জন্য। তুমি ওকে থাকতে বলো।”
শেষের কথাগুলো এত মৃদু হয়ে গেল, গিরি নিজেই শুনতে পেল না। ঘাড়ে রুনুর হাতের আলতো চাপ অনুভব করল।
”আমি তো যথাসাধ্য করি।”
জানি জানি, সে-জন্য তোমার কাছে কৃতজ্ঞও। কিন্তু গিরি কথাগুলো বলতে পারল না। গলায় বাতাস জমে উঠছে।
”অম্বর চলে গেলে দেড়শো টাকা কমে যাবে।”
”তবুও। আমি পারব চালিয়ে নিতে। ও আসার আগে কি চলেনি?”
রুনু চলে গেল বারান্দা ছেড়ে। গিরি একদৃষ্টে রেলিংয়ের জাফরির মধ্য দিয়ে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অবসন্ন বোধ করল। আবার তার মনে পড়ল টেবিলের উপর আধ ভর্তি বোতলটা রয়েছে।
হাত বাড়িয়ে পর্দা সরাল। রুনু ঘরে নেই। দরজার কাছেই টেবিলটা। গিরি ক্রাচের সাহায্য ছাড়াই দেয়াল ধরে হালকা লাফে ঘরে এল। দ্রুত বোতলটা তুলে নিয়ে আবার বারান্দায় ফিরে চেয়ারে বসল। দালান থেকে রুনু বলল-
”তুমি কি এখন খাবে? তা হলে গরম করি।”
”না, একদম খিদে নেই। ঢাকা দিয়ে টেবিলে রেখে দাও।”
”আমারও খিদে নেই। আমি শুয়ে পড়ছি, ক্লান্তি লাগছে।”
গিরি ছিপির প্যাঁচ খুলে, বোতল থেকেই মুখে ঢালল। গন্ধে, ঝাঁঝে গুলিয়ে উঠল পেট। বহু বছর পর আবার। স্বাদটা, ভুলেই গেছে প্রায়। ঠোঁট চেপে, বেরিয়ে আসতে চাওয়া রামকে আবার পাকস্থলীতে ফিরিয়ে আনার জন্য সে চোখ বুজে নিশ্বাস বন্ধ করল। মিনিট দুয়েক পর সে অনুভব করল তার শরীরের মধ্যে সেই বিস্মৃতপ্রায় উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে। আর এক ঢোঁক খেয়ে বোতলটা চেয়ারের নীচে রাখল।
কলঘরে কাপড় থোবানোর শব্দ হচ্ছে। নিজের ব্লাউজই নয়, অম্বরের রুমাল, গেঞ্জিও কাচছে। গিরি হাতটা নাকে ধরে পিয়াজের সামান্য গন্ধ পেল। উপরের বারান্দায় গুনগুন সুর। পাগলি গান গাইছে। একতলায় লন্ড্রির রোলার শাটার বন্ধ করার কর্কশ শব্দ উঠেই অঘোর ঘোষ স্ট্রিটকে আবার নৈঃশব্দ্যে ডুবিয়ে দিল।
গিরি বোতলটা তুলে নিয়ে কোলে দুই ঊরুর মধ্যে রাখল। মাথার মধ্যে ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ, চোখে ঝাপসা লাগছে। বনমালী সরকার লেনের মুখ, বাস স্টপে দাঁড়ানো কয়েকটি লোক মাঝে মাঝে দৃষ্টি থেকে ছিটকে যাচ্ছে। গুম হয়ে সে বসে থেকে, বিরক্ত বেপরোয়ার মতো বোতলটা মুখে তুলে ধরে বাকিটুকু ঢেলে নিল।
প্রায় আধঘণ্টা পর তার মনে হল অম্বর হেঁটে আসছে। দেখার জন্য একপায়ে দাঁড়িয়েই আবার বসে পড়ল। রুনু আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে। দরজাটায় হয়তো খিল দেওয়া। উঠে এসে কড়া নাড়লে পর দেখা যাবে। চেয়ারে হেলান দিয়ে সে অন্ধকার বারান্দায় চোখ বুজল। নিশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে, বুকে টান লাগছে। এত বছর পর এ-ভাবে ঢকঢক করে গেলা ঠিক হয়নি। গিরি মাথা নাড়তে লাগল।
পাশের ঘরে আলো জ্বলল। বারান্দার দরজা খুলে অম্বর বেরিয়ে এসে রেলিং ধরে একবার দাঁড়িয়েই আবার ঘুরে ঢুকে গেল। খোলা দরজা দিয়ে আলো পড়েছে বারান্দায়, জংধরা ময়লা রেলিংয়ে। জাফরিতে।
গিরি চোখ খুলে একবার মেঝেয় আলোটার দিকে তাকিয়েই আবার মাথা ঝুঁকিয়ে দিল বুকের ওপর। মাথার মধ্যে প্রচণ্ড ঘূর্ণি। পাকস্থলী থেকে একটা চাপ ঠেলে উঠছে গলা পর্যন্ত।
দরজাটা কি খোলাই ছিল? কিন্তু চুরি হবার পর থেকে সন্ধ্যা হলেই রুনু খিল দিয়ে রাখে। দরজার কড়া কি নেড়েছিল? গিরি মাথাটাকে ঠেলে ঠেলে তুলে সিধে করল। শুনতে পাইনি তো। রুনু কি দরজার কাচে অপেক্ষা করছিল? সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেয়েই খুলে দিয়েছে। তারপর?
