”শনিঠাকুরের মন্দির দেখলে আমার কেমন গা ছমছম করে। মা প্রত্যেক শনিবার, আমাদের পাড়ার শনি মন্দিরে সন্ধ্যাবেলায় গিয়ে বসে থাকত। বাবা মারা যাচ্ছেন, তখনও বসে। আমি ছুটে গিয়ে খবর দিলাম মাকে, কিছুতেই বিশ্বাস করেনি। না, মরতে পারেন না। বাজে কথা বলছিস। কী অসম্ভব যে ঠাকুরের ওপর বিশ্বাস, দেখে আমার ভয় করেছিল।”
”তোমার বোধ হয় ক্লান্তি লাগছে, ফিরবে?”
”না না, কিচ্ছু লাগছে না।”
”বগলে আর ব্যথা হয় না?”
গিরি মাথা নাড়ল। রাস্তায়, দোকানে আলো জ্বলে উঠেছে। রাস্তায় এখন প্রচণ্ড ভিড়। ফুটপাথে ক্রমশই ভাঙা, গর্ত, ঢিপি বাড়ছে। চলতে অসুবিধা হচ্ছে গিরির। ওরা সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পার হল।
”এবার গলি দিয়ে ফেরা যাক।”
”এদিকের গলি আমি ভালো চিনি না। এদিকটা কি শ্যামপুকুরের মধ্যে?”
”হ্যাঁ।”
”বাণীরা এদিকেই থাকত। খুব গরিব ছিল। আমরা দু’জনেই ভীষণ বন্ধু ছিলাম। কিন্তু কখনও বাড়ি নিয়ে যেত না। তোমার কথা ওকে সব বলতুম।”
”কী বলতে?”
”সে-সব কি মনে আছে?”
”বলো না কী বলতে?”
”কী আবার বলতুম, মেয়েরা যা বলে থাকে ওই সময় তাই।”
গিরি চুপ করে রইল। এখন রাস্তায় আলো কম, লোকের চলাচলও; এখানে একটা মাঠ ছিল, প্রতি বছর লক্ষ্মীপুজোয় জলসা হত। মাঠ খুঁজে পাচ্ছে না সে।
”বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে তোমার সঙ্গে প্রথম কথা বলার গল্পটা বাণীকে করেছিলাম।”
”সম্মেলনে নয়, বাইরে রাস্তায়। আমিই প্রথম কথা বলি।”
”তাই বলেছিলাম। বাসের জন্য অপেক্ষা করছি বাস আসছে, কিন্তু ভিড়ে উঠতে পারছি না। তুমিও উঠতে পারছিলে না…”
”এটা ঠিক বলোনি। আমি উঠে যেতে পারতাম। তোমার সঙ্গে উঠব বলেই বাস ছেড়ে দিচ্ছিলাম।”
”সেটা ও বুঝে নিয়েছিল। যে লোক রোজ খুঁজে খুঁজে আমার পাশে কি পিছনে এসে বসে, সে যে ভান করছিল, এটা যে শুনবে সেই বুঝে নেবে।”
”হেঁটে বাড়ি ফেরার কথা বলামাত্র তুমি রাজি হয়ে গেলে, এটা শুনে ও কিছু বলেনি?”
”বলামাত্র মানে!”
”তা নয় তো কী? দু’মিনিটের বেশি আমাকে বলতে হয়নি।”
”আমি ওকে বলেছিলাম, বলার সঙ্গে সঙ্গেই।”
”মেয়েরা একটা বয়সে বাহাদুরি নেবার জন্য মিথ্যে কথা বলে।”
রুনু হাসল। একটা বয়সে না সব বয়সে! ও আজও কি মিথ্যা বলে যাচ্ছে না? চোখের কোণ থেকে গিরি দেখল ওর মুখে হাসির রেশ লেগে আছে। একটু মন্থর হল সে রুনুর গোটা শরীরটা দেখার জন্য। কলেজে পড়ার সময় রুনুকে এত সুশ্রী মনে হত না। হয়তো তখনও তা ছিলও না। গিরি তাই নিয়ে মাথা ঘামায়নি। রুনু একটি মেয়ে এটাই যথেষ্ট ছিল। স্তন বা নিতম্ব আছে কি না বোঝাই যেত না। ও যে এত বদলে গেছে, এটা টের পেতে গিরির অনেক বছর সময় লেগেছে। প্রকৃতপক্ষে কয়েক মাস আগে সে আবিষ্কার করেছে। এখন আর ওকে লাজুক, অভিমানী দেখায় না। বরং ধীর সংযত, কোমল প্রকৃতির ভদ্রমহিলা রূপে ওকে ভাবা যায়।
রাস্তার আধখানা রঙিন কাপড়ে ঘিরে নিমন্ত্রিতদের জন্য চেয়ার পাতা হয়েছে। বিয়ে অথবা বউভাত। ওরা তার পাশ দিয়ে যাবার সময় বাড়িটার ভিতর দিকে তাকাল। বিয়ে। মখমলের তাকিয়া ঠেস দিয়ে একটি যুবক বসে। কপালে চন্দন, গরদের পাঞ্জাবি পরা। সামনে ফুলদানিতে তোড়া। একটি ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে। বরটি অত্যন্ত গম্ভীর হতে চাইছে ব্যক্তিত্ব ফোটাবার জন্য।”
”দেখেছ?”
”হ্যাঁ।”
আর কিছু বলার দরকার নেই। দৃশ্যটা দু’জনেই মনের মধ্যে ধরে রেখেছে। ওরা স্মৃতির অজস্র খোপের একটার মধ্যে দৃশ্যটাকে ভরে রাখল। পরে যদি দরকার হয়, আজকের সন্ধ্যার কথা যদি মনে করতে হয় তা হলে খোপ থেকে এটা বার করলেই সব মনে পড়ে যাবে। প্রতিদিনের এ-রকম অজস্র টুকরো অপ্রয়োজনীয় কথা, ইঙ্গিত, ভঙ্গি, গিরির স্মৃতিতে ভরা আছে।
রুনুর বাবার রকে বসে থাকা ভঙ্গির থেকে বেশি মনে আছে আকাশে তাকিয়ে থাকা চোখ দুটো। পৃথিবীটার কোনও অস্তিত্ব চোখে ছিল না। মৃত মানুষের চোখ, গিরি একমাত্র নিজের বাবার ছাড়া আর দেখেনি। রুনুর মার শুয়ে থাকার ভঙ্গি। পিছনের ছবিটা। দুটো এক সঙ্গে তার মনে তিক্ত একটা গাছের বীজ বপন করে দিয়ে গেছে।
অস্বস্তি ভরে গিরি মনের মধ্যে খোপটা বন্ধ করতে চাইল।
”বড্ড জোরে হাঁটছ।”
”কই!”
”তুমি কী ভাবছ এখন?”
”বিশেষ কোনও একটা কিছু নয়। আচ্ছা, আমরা একবারই বিয়েবাড়ির নেমন্তন্ন খেয়েছি, মনে আছে? তোমাদের গ্যারেজের এক মেকানিকের মেয়ের বিয়ে ছিল। আমার ভীষণ দাঁতের যন্ত্রণা হচ্ছিল। যাব না বলেছিলুম, তুমি জোর করে নিয়ে গেছলে।”
”তুমি তখন অত্যন্ত একগুঁয়ে ছিলে। জোর ফলাতে।”
”এখন জোর ফলাই না? আজও তো একগুঁয়েমি করলাম থিয়েটারে না গিয়ে।”
”গেলে না কেন? অম্বর পাস এনেছে বলে?”
”এ-কথা কেন বললে?”
”মনে হল। আজকাল প্রায়ই অনেক কিছু মনে হয়। তুমি কিন্তু ঘামছ, চলো এবার ফিরি।”
কথা না বলে ওরা এগোতে লাগল। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে অঘোর ঘোষ স্ট্রিটে ঢুকতে গিয়ে গিরি থমকে দাঁড়াল। রাস্তার ওপারে বনমালী সরকার লেনের দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে চলতে লাগল।
”দাঁড়িয়ে পড়েছিলে কেন?”
”এমনিই।”
”তুমি সুখী হবার চেষ্টা করো।”
”চেষ্টা করে হওয়া যায় না।”
”আমাকে বিশ্বাস করতে তো পারো।”
গিরি মুখ তুলে তাকাল। রুনুর মুখে কোনও হালকা ব্যাপার নেই। চোখে বিষণ্ণ, অনুনয়ের চাহনি। কিন্তু গিরি নিজেকে হঠাৎ হালকা ঝরঝরে বোধ করল। এই কথাটা শোনার ইচ্ছা অনেকদিন ধরেই মনে জমে উঠেছিল।
