”ইলেকট্রিকের দোকানে যাব ভেবেছিলুম।”
”এখনই যাবে না ফেরার সময়?”
”বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”
দুটি দোকানের একটি খোলা। কাউন্টারের ওধারে মালিকের চেয়ারটি শূন্য। এধারে দুটি মিস্ত্রিগোছের লোক গল্পে ব্যস্ত। তাদেরই একজন জিজ্ঞাসু চোখে গিরির দিকে তাকাল।
”পাখা ভাড়া পাওয়া যাবে? সিলিং ফ্যান।”
”একটু অপেক্ষা করুন, মালিক একশো টাকার নোট ভাঙাতে গেছে।”
লোক দুটি গল্প করছে। গিরি দাঁড়িয়ে রইল।
”বাচ্চচাটাই ছিল পাখার তলায়, অথচ একদম আঁচড় লাগেনি। মায়ের মাথাটাই থেঁতলে গেছে।”
”আজেবাজে নতুন ছেলে দিয়ে এইসব পাখা লাগানোর কাজ করলে এইরকমই হয়। সহজ কাজ, কিন্তু দ্যাখো একটা লোকের জীবন চলে গেল সামান্য ভুলে। একটা পেরেকও যদি বুদ্ধি করে গর্তে ঢুকিয়ে রাখত তা হলে লোহাটা সরত না, পাখাটাও পড়ত না। পুরনো আমলের পাখায় এই এক ফ্যাচাং। এখনকার পাখা ধরো আর ঝুলিয়ে দাও।” গিরি কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল শুনতে শুনতে। জিজ্ঞাসা করল, ”পাখা খুলে পড়ে গেছে?”
”লাগিয়ে দিয়েছে, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পড়েছে। তলায় বাচ্চচা নিয়ে মা শুয়েছিল, সেকেলে ক্লাইড ফ্যানের অন্তত দশ কিলো ওজনের হাঁড়িটা একেবারে মায়ের মাথায়।”
লোকটি দু’হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরল।
”কী করে হল?”
”বরাতে ছিল তাই হল। পাখাটা ঝোলে যে লোহাটার ভরে সেটা সরে গেলেই পাখা পড়বে। যাতে না সরে সে-জন্য পিন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। আর নড়াচড়া করতে পারে না। পিন ঢোকাতে ভুলে গেছল, কি হয়তো ছিল না। এইভাবেই তো আজেবাজে দোকানের মিস্ত্রিরা কাজ করে।”
মালিকও এসে গেছে।
”পাখা ভাড়া পাওয়া যাবে, সিলিং ফ্যান?”
”কবে চাই?”
”আজ বা কাল।”
”কাল দুপুরে লোক যাবে। মাসে দশ টাকা ভাড়া।”
”ঠিক আছে, বাড়ির ঠিকানাটা লিখে নিন।”
লোকটি হাত তুলে বলল, ”জানি। আপনাদের দোতলার ফ্ল্যাটে দিন দশ আগেই তো পাখা দিলুম। আপনি তো তিনতলায় থাকেন।”
ইতস্তত করে রুনু বলল, ”একজন ভালো লোক পাঠাবেন।”
”না না, কোনও ভয় নেই। এইসব ঘটনা লাখে একটা হয়।”
হাসি মুখেই লোকটি কঠিন চোখে লোক দুটির দিকে তাকাল। দুটো কাজ একসঙ্গে সম্পন্ন করতে হাসতে ও ধমকাতে।
”কী হচ্ছে, মুখটা অমন কচ্ছ কেন?
গিরি দু’ধারে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ”তুমি লক্ষ করোনি লোকটা কেমন করল?”
”শুনতে বিচ্ছিরি লাগছিল।”
রাস্তা পার হয়ে ওরা উত্তর দিকে এগোতে থাকল। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর মাঝখানে কালী মন্দির। তার পুবের রাস্তাটাকে দেখিয়ে গিরি বলল, ”এটাকে ছোটোবেলায় আমরা রাজা রাস্তা বলতাম। রাস্তার দু’ধারেই শোভাবাজার রাজবাড়ি। পুজোয় এখানে মেলা বসত।”
”এখন আর বসে না বোধ হয়।”
”একটা দুটো নাগরদোলা হয়তো বসে। ছবি তোলার দোকানগুলো আর কোথাও বোধহয় বসে না। এখন বড্ড বেশি ছবির দোকান হয়ে গেছে, ক্যামেরাও লোকের হাতে হাতে।”
”আমাদের একটাও ছবি নেই।”
”তোমার ছোটোবেলার ছবি?”
রুনু মাথা নাড়ল। ছিল, ভিতরের ঘরে মায়ের কোলেচড়া ছবি। গিরি সেটার উল্লেখ করতে পারল না। রাজা রাস্তার দিকে মুখ ফিরিয়ে সে চলতে লাগল।
একবার পুজোর সময় সে ম্যাজিকওলার তাঁবুতে ঢুকেছিল দু’পয়সার টিকিট কেটে। স্টেজের সামনে শতরঞ্চিতে বসেছিল। ম্যাজিক চলার মধ্যেই সে দেখল এক মাঝবয়সি স্ত্রীলোক তাঁবুতে ঢুকে দর্শকদের পাশ দিয়ে স্টেজের কাছে এসে জুতো খুলছে। স্টেজ থেকেই ম্যাজিসিয়ান খেলা দেখাতে দেখাতে বলল, ”দেরি হল যে?”
স্ত্রীলোকটির মুখে রং মাখা। চুলটা ফাঁপিয়ে কান ঢেকে রাখা, কানে মস্ত কানপাশা। জুতো খুলতে খুলতে লাজুক হাসল মাত্র। স্টেজের পাশের পর্দাটা তুলে ভিতরে ঢুকল আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্টেজে ঢুকে নাচতে শুরু করল। মিনিট তিন-চার নেচেই সে আবার স্টেজের পাশে চলে গেল। গিরি ছেঁড়া পর্দাটার মধ্য দিয়ে তখন দেখল স্ত্রীলোকটি সিগারেট খাচ্ছে।
একটা মাঠ ছিল তার পিছনে পুকুর। বিরাট বাড়িটা দেখে তার মনে পড়ল, ছোটোবেলায় কর্পোরেশনের অবৈতনিক স্কুলে পড়ার সময়, সে এই মাঠে আসত। পুকুরে রাজহাঁস চরত। ফুটবল খেলা হত মাঠে। গোলের পিছনে দাঁড়াতে তার ভালো লাগত। একবার প্রচণ্ড শট তার মাথায় লেগে মাঠে বল ফিরে যায়। লোকেরা হো হো করে হেসে উঠেছিল। গিরির মাথা ঝনঝন করছিল অনেকক্ষণ।
বিশেষ কিছু কথা ওরা বলল না। মন্থর গতিতে হাঁটতে হাঁটতে ওরা সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর সঙ্গেই বাঁক নিল পুবে শ্যামবাজারের দিকে। কাঠগোলায় একটা আলনা তৈরি হচ্ছে। রুনু দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ”একটা মিটসেফ আমাদের দরকার।”
এরপর তারা শ্যামস্কোয়্যার পার হয়ে গেল। রুনুর কলেজের সামনে আসতেই গিরি বলল, ”তোমার জন্য প্রথম দিন দাঁড়িয়েছিলাম এই বাস স্টপে, তখন একটা মেয়ে এসে আমার নাম জিজ্ঞাসা করেছিল।”
”বাণীকে পাঠিয়েছিলাম, তোমাকে বলতে মিনিট পনেরো আমার দেরি হবে। এস এন বি-যে কখন ক্লাস থেকে বেরোবে কেউ জানে না। হঠাৎ বাণীকে যে মনে পড়ল?”
”এমনিই। এক একটা জায়গায় এলে অদ্ভুত সব ঘটনা, দৃশ্য, মানুষের কথা মনে পড়ে। তোমার মনে পড়ে না?”
রুনু মাথাটা হেলাল।
গিরি অপেক্ষা করল রুনু কিছু বলবে মনে-পড়া সম্পর্কে। কিন্তু রুনু নীরবে চলেছে মনে পড়ার মতো ঘটনা বা মানুষের কথা হয়তো বলতে চায় না। কিংবা এখন যা দেখেছে তা তাকে কিছু মনে পড়াচ্ছে না।
