খোরশেদের পায়ের কাছে এক থলি টাকা রাখিয়া যুবতী কহিল–এই নিন সে টাকা। সে আর দাঁড়াইল না। খোরশেদকে বিমূঢ় করিয়া দিয়া সে অন্ধকারে মিশিয়া গেল।
১৬-২০. আমেনা যখন দেখিল
ঘোড়শ পরিচ্ছেদ
আমেনা যখন দেখিল সংসারটা তার বিশ্বাস ও কল্পনাকে একেবারেই ছাই করিয়া দিয়াছে তখন সে একেবারে মৌন হইয়া গেল।
শ্বশুরবাড়িতে আমেনার সঙ্গে ছিল মাত্র একখানা কবিতার বই। বাক্সের মধ্যে কাপড়ের নিচে সেখানাকে সে লুকাইয়া রখিয়াছিল। দুপুররাতে মানুষ যখন চেতনাহীন হইয়া পড়িত তখন সে দরজা-জানালা বন্ধ করিয়া একটা মেটে প্রদীপ জ্বালিয়া করুণ ঝঙ্কারের মধ্যে আপনাকে হারাইয়া ফেলিত। আহা! মানুষের জীবন কী ভয়ানক ও যন্ত্রণাপ্রদ! কেবল আঁখিজল ও বেদনা লইয়া মানুষের জীবন ধারার সৃষ্টি–আমেনা ভাবিত। আমেনা স্বপ্নেও ভাবে নাই তাহাকে এমন করিয়া বিসর্জন দেওয়া হইবে। সীতাকে অরণ্যে ফেলিয়া দেওয়া হইয়াছিল সে কথা আমেনা”সীতার বনবাস’ পড়িয়া জানিয়াছিল। তার ভাই কি তাহাকে সাগরে ফেলিয়া দিয়া মুক্তি লাভ করিলেন? সত্য সত্যই যদি সাগরে ফেলিয়া দেওয়া হইত তাহা হইলে তাহাকে এমন অসম্মানও বেদনার মধ্যে বাচিতে হইত না। আমেনা আপন। মনে এইসব কথা ভাবে।
এমন আশ্চর্য বিবাহ সে কোনোকালে দেখে নাই। সে বুঝিয়াছে তাহার ভাই সত্য সত্যই একটা হৃদয়হীন প্রতারক। সে একটা প্রতারকের ভগ্নি! এ বেদনা-এ অসম্মান তাহাকে মাথা পাতিয়া লইতে হইবেই তো।
বিবাহের পর শ্বশুরবাড়ি আসিয়া যখন গিলিট-করা গহনাগুলির ছলনা ধরা পড়িল তখন বাড়ি সুদ্ধ লোক একেবারে অবাক! কেবল অবাক হইল না তার চাচিশাশুড়ী। শ্বশুর প্রতারণার অপমানে গর্জিয়া পুত্রকে ডাকিয়া কহিল–এই হারামজাদি মাগীকে এখনই তালাক দিয়ে পথে তুলে দাও।
আমেনা বিস্ময়-বেদনা স্তব্ধ হইয়া গেল। অশ্রুহীন দুটি করুণ আঁখি নত করিয়া সে নির্জনে শ্বশুরের পা ধরিয়া স্বরে কহিল–তাহার ভাই ইতর ও ছোটলোক হইলেও সে ভালো হইয়া তাহার শোধ দিবে। তাহার মাথায় যেন বিপুল অসম্মান চাপান না হয়।
দুপুর-রাতে স্বামীর হাত ধরিয়া সে কাঁদিয়া কহিল–স্বামীন! গহনা দিয়া তোমাকে যতটুকু না পূজা করিতাম, প্রেমভরা হৃদয় দিয়া তার চেয়ে ভালো করে তোমায় পূজা করবো।
স্বামী হুঁকায় একটা কড়া দম দিয়া তাহাকে ঘর হইতে সেদিন বাহির করিয়া দিয়াছিল। আহা! সারা রাত্রি বারান্দায় শীতের ভিতর আমেনা দাঁড়াইয়া কাঁদিয়াছিল। স্বামী ঘরের ভিতর হইতে কহিতেছিল–ডাক্তারী পড়তে যাচ্ছি। তোর ভাই যদি ওয়াদা মতো মাসে মাসে টাকা না দেয় তবে আর আশা নাই। জানিস, আমি পিতৃভক্ত। পিতার ক্রোধকে উপেক্ষা করে সামান্য নারীকে ভালবাসতে পারি না।
আমেনা বলিয়াছিল স্ত্রীলোক তো কর্তব্যানুরোধে স্বামীর কথাকে মায়ের কথা অপেক্ষা অধিক মূল্যবান মনে করে।
এনায়েতুল্লা লেপ ফেলিয়া কথার উপর কথা বলার অপরাধে আমেনাকে প্রহার করিয়াছিল।
যাহা হউক, বিবাহের পর খোরশেদ এনায়েতুল্লাকে এক পয়সাও দেয় নাই। জমি বিক্রয় ও স্ত্রীর গহনা বন্ধকের কথা বলিয়া আমেনার শ্বশুর নজির মিঞা পুত্রের কাছে মাসে মাসে ৫০ টাকা করিয়া পাঠাইতেছিল।
পিতার সুপুত্র এনায়েত কলিকাতায় কী করিতেছিল তাহা বলিতে লজ্জা করে। দুঃখ, বেদনা, অপমান, অসম্মানে শ্বশুরবাড়িতে আমেনার প্রায় এক বছর কটিয়া গেল।
বৈশাখ মাসে অনবরত কয়েকদিন ধরিয়া প্রকৃতি বাদল কুক্কটিকা সমাচ্ছন্ন। একখানি পত্র হাতে লইয়া আমেনাকে চমকিত করিয়া সহসা নজির মিঞা পুত্রের ঘরে প্রবেশ করিয়া বধুকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন–“দেখ মেয়েটি! তোমার উপর আমরা বিশেষ অসন্তুষ্ট না। হইলেও, এই জুয়াচুরির প্রতিশোধ নেবার জন্য তোমাকে কষ্ট দিব। আজ হতে তুমি ঐ ঘোড়ার ঘরে থাকবে। ছালা পেতে শোবে। খাপরায় খাবে, হাঁড়িতে পানি ঢেলে মুখ হাত ধোবে। বুঝলে?”
আমেনা মাথা নত করিয়া মৃদুস্বরে অতি দুঃখ কহিল,–“বুঝলাম।”
“শুধু বুঝলে হবে না–আমার কথা বেদের কথা!” আমেনা চোখের জল ঘোমটার আবরণে ঢাকিয়া রাখিয়া মাটির দিকে চাহিয়া কহিল–“আপনার আজ্ঞা শিরোধার্য। ভাই প্রতারণা করেছেন–জামাইকে আদনা চিজ থালাখানাও দেওয়া হয় নাই। আমাকে মেটে বাসনে খেতে দেবেন তাতেই আমার চলবে।”
“তোমার ধৈর্য-সহিষ্ণুতায় আমার পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। আমার এইসব কথায় তুমি একটুও কাঁদছ না। আমি চাই প্রতিশোধ–তোমার বুকে আগুন জ্বালাতে। আমার কথা ও ব্যবহারে একটুও বেদনা বোধ করো না। এতে যে বেশি করে আমি প্রতিহিংসাপরায়ণ হবো তা তুমি জান?”
“তা জানি না, বুঝতে চেষ্টা করেও বুঝতে পাচ্ছি না।”
“দেখ, তুমি থিয়েটারি কথা সাধারণত বলে থাক। ভালো মানুষের তো এ লক্ষণ নয়? তোমার কথাগুলি পরিষ্কার বাধুনি দেওয়া। আমার সন্দেহ হয়, তুমি বেহায়া। যা তোমরা জবানি দিয়ে তোমার দুর্গতির কথা তোমার ভাই ও মায়ের কাছে লিখবো–আজই লিখবো।”
“আমি নিজের হাতেই এসব কথা লিখে দিতে রাজি আছি।”
নজির বিস্ময়বিমূঢ় হইয়া কহিল–“কী ভয়ানক! হায়, আমার বাপ দাদার জাতি গেল! তুমি কি লেখাপড়া জান? জুয়াচোর শাহাদত না বলে ছিল–মেয়ে লিখতে-পড়তে জানে না–একেবারে শরীফজাদি! এতকাল এ কথা গোপন রেখেছো? এ কথা লোকে শুনলে কী বলবে! বেশ! লেখ। তোমার দুঃখময় কাহিনী নিজ হাতে লিখে দাও, চিঠিখানা আজই তোমার ভায়ের কাছে পাঠাব।
