মহেন্দ্রনগরের থানা হইতে প্রায় এক মাইল দূরে ঠাকুর জমিদারদের কাছারী। আজিজ তাহাদের এক প্রজা। সে হুগলীতে কিছুদিন পড়িয়া ছিল এবং এবং ইসলাম-প্রচারক মৌলবী হালিমুদ্দীন সাহেবের সঙ্গে সঙ্গে বহু দেশ ঘুরিয়া বহুলোকের সহিত মিশিয়া এবং বহু কথা শুনিয়া বিলক্ষণ জ্ঞান অর্জন করিয়াছিল। সামান্য লোকের পুত্র হইলেও আজিজের আত্মসম্মান জ্ঞান জন্মিয়াছিল। শ্রেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের সদ্ব্যবহার ও স্পর্শে মন উন্নত হইয়া গিয়াছিল।
জমির খাজনা দিবার জন্য আজিজ কাছারীতে নায়েব গণেশ মুখার্জির কাছে গিয়াছিল। নায়েব মহাশয় আলবোলাটা নিতেছিল, তখন অজিজ মিঞা যাইয়া সেখানে উপস্থিত হইল। নয়েব আজিজের বেপরোয়া ভাব দেখিয়া জ্বলিয়া গেল। কারণ আজিজ আভূমি নত হইয়া নায়েবকে সেলাম করিয়া ছিলেন না।
নায়েব সম্মান নষ্ট হইবার ভয়ে অজিজের দিকে চাহিল না। একখানা চেয়ার ছিল। আজিজ কাহারও অনুমতি না লইয়া সেখানে বসিয়া পড়িল।
নায়েব অগ্নিশর্মা হইয়া কহিল–ছোটলোক, নেড়ে!–কাল তোর বাবা কাছারীর মেজে ঝট দিয়ে গেল, আজ তুই সেই কাছারীর কুরসিতে এসে বসেছিস।
আজিজ বলিল–তা ঠিক নায়েব মশায়। কাল তোমার বাবাও দুর্লভ তিলির ভাত বেঁধে আর মাঠে ধান কুড়িয়ে ফিরত। তার বেটা তুমি ও নায়েব হয়ে বড় মানুষ হয়েছ। তুমি না একটু চিটে গুড়ের জন্য বেদনগাছির বাজারে নারকেলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে? বেশি দিনের কথা নয়!
নায়েব ক্রোধে আজিজের কান ধরিয়া মাথায় হস্তস্থিত রুল দিয়া এক প্রচণ্ড আঘাত করিল।
আজিজ মাথার কাপড় জড়াইয়া কাছারিগৃহ পরিত্যাগ করিয়া আসিবার সময় বলিয়া আসিল–কাফের, ইসলামের অর্থ তুমি কী বুঝবে! এ গণ্ডিতে ব্রাহ্মণ-শূদ্র বলে কোনো কথা নেই–আশরাফ-আতরাফ বলে কোনো কিছু নেই-ইসলাম শুধু আত্মাকে চিনে–আত্মার গৌরব-বলে বড়। ইসলাম বড়-ছোট বলে কোনো সার্টিফিকেট কাহারো গলায় বেঁধে দেয় না। চরিত্র, মনুষ্যত্ব ও জ্ঞানের ঐশ্বর্যে সে মহারাজা। যে ইসলামের এ-কথা মানে না সে অন্ধ মানুষের কাছে যত আসনই পাক না কেন, সে হীন। হিন্দু মানুষের মনষ্যত্বকে অবহেলা করতে সঙ্কোচ বোধ করে না। ইসলাম সৌধ মনুষ্যত্বের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ঊর্ধ্ব দিকে অঙ্গুলি তুলিয়া অধিকতর দৃপ্তকণ্ঠে কহিল–নায়েব, যদি বেঁচে থাকি তোমার একজনের পাপের জন্য সমস্ত হিন্দুসমাজকে ধ্বংস করতে চেষ্টা করব।
আজিজ আর দাঁড়াইতে পাড়িল না। চাঁদর দিয়া মাথায় রক্তস্রোত রুদ্ধ করিয়া কোনো রকমে সে বাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইল। তার একই স্ত্রী যুবতী ও সুন্দরী–নাম তার গুল।
গুল স্বামীর কণ্ঠের কাছে মুখ লইয়া কহিল–কী সর্বনাশ! এ দশা কে করিল? তাহার পর উচ্চঃস্বরে চিৎকার করিল। তাহার পর পাগলিনীর ন্যায় এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরিয়া কাহাকেও না পাইয়া স্বামীকে আসিয়া কহিল–কেউ তো বাড়ি নেই। ওগো বসো, আমিই না হয় ডাক্তার আনতে যাই।
আজিজ কহিল–না প্রিয়ে, হাদীস শরীফে আছে স্ত্রীলোকের বাড়ির বের হতে নেই, তা ছাড়া হিন্দু আমাকে মেরেছে–একথা লোকসমাজে জানান অপমানজনক।
সেই রাত্রিতেই আজিজের মৃত্যু হইল। প্রতিবেশী কলিমুদ্দীন, হাফেজ এবং বেদার মৌলবী আসিয়া কহিল–হিন্দুর অত্যাচার অসহ্য হয়ে পড়েছে। খোদার মরজি কালবশে গোলাম বাদশাহ্ হয়েছে। বাদশাহ্ গোলাম হয়েছে। সবুর!
সে রাত্রে বা পর দিন আজিজকে মাটি দিতে কেহ সাহস পাইল না।
আজিজের মুত্যু যে একটু দোষের মৃত্যু!
আজিজের পত্নীর কাছে যাইয়া খোরশেদ যথাসময়ে শুনিল দুপুর রাতে তার স্বামীর মৃতদেহ তার বিছানার পার্শ্বে পড়ে ছিল। সে আর কিছু বলিল না।
চৌকিদার, দফাদার, গ্রামের লোক সকলেই কহিল, তাহারা আর নূতন কিছু জানে না।
খোরশেদ গোপনে চৌকিদারের নিকট হইতে যাহা শুনিল তাহাতে সে একেবার স্তম্ভিত হইয়া গেল। তদারক হইতে ফিরিয়া আসিয়া সে ভারিতেছিল মুসলমান বিশেষ দীনদার লোকের পত্নী যে অসতী হইতে পারে তা এই জানিলাম। এমন কিছু যে সম্ভব তা সে কখনও ইহার পূর্বে ভাবিতে পারে নাই। সে ইচ্ছা করিল রিপোর্টে এইসব কলঙ্কের কথা লিখিয়া উপরিস্থ কর্মচারীকে যা–তা একটা স্বজাতির বিরুদ্ধে মন্তব্য লিখে মাথা হেঁট করিব না; ব্যাপরটা চাপা দিতে হইবে।
তখন দুপুর রাত। খোরশেদের ঘুম হইতেছিল না। সে ভাবিতেছিল, ছিঃ মুসলমানের ঘরেও অসতী স্ত্রীলোক সম্ভব! এখানে তালাক নেকাহ্ সবেরই তো ব্যবস্থা আছে।
তখন থানায় সকলেই সুপ্ত। গ্রামখানি নিথর নিস্তব্ধতায় সাড়াহীন। দুই একটি পাখি আর্তচিৎকারে মৌন বিশ্বের কাছে বেদনা জানাইতেছিল।
সহসা খোরশেদ শুনিল তাহারই জানালা পার্শ্বে রমণীকণ্ঠে মৃদু ভগ্ন স্বরে কে যেন ডাকিতেছে–ছোট বাবু! ছোট বাবু! স্বর বড় করুণ ও বেদনাব্যঞ্জক।
অন্ধকারে তাড়াতাড়ি দরজা খুলিয়া খোরশেদ সহানুভূতি-মাখাস্বরে কহিল–কে কে, ভিতরে এস।
টেবিলের উপরকার মোমের বাতিটি জ্বালাইয়া খোরশেদ বিস্ময়ে দেখিল–একটি মুসলমান যুবতী তাহারই সম্মুখে দণ্ডায়মান। চক্ষু, তার জল সিক্ত। মুখে একটা আশ্চর্য গৌরব ও লালিত্য।
যুবতী খোরশেদের প্রশ্নের বা অনুমতির অপেক্ষায় রহিল না। করুণ ভাষায় সে কহিল–দারোগা সাহেব! মুসলমানই মুসলমানের বেদনা বুঝে। নায়েব আমার স্বামীকে তার কাছারির ভিতর হত্যা করেছে।
