ন্যায্যমতো মনে মনে অহঙ্কার থাকা কিন্তু আবার নিতান্ত দরকার। নইলে মনুষ্যত্ব থাকে না। সে জগতে কোনো কাজ করতে পারে না। এই অহঙ্কার হবে বিনয় মধুর এবং অত্যন্ত শান্ত। এটা ঠিক অহঙ্কার নয়, এর নাম আত্মবিশ্বাস।
কখনও সচেতন পদার্থের উপর ক্রোধ প্রকাশ করতে নেই, অথচ মেয়ে মানুষের এ একটা স্বভাব।
হালিমা বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করিলেন–সে কেমন?
কুলসুম বলিলেন–প্রাণহীন বস্তুর উপর রাগ। বদনা, থালা, কাপড় বা খন্তা, কুড়োলের উপর রাগ করা অনেক মেয়ের স্বভাব। যদি দাসী বা নিজের অমনোযোগিতায় টেকিতে হাত কেটে যায়, তা হলে পেঁকিতে গালি দেওয়া ভালো কি? এরূপ করলে বুদ্ধির পরিচয় দেওয়া হয় না, নিজের দোষে কোনো খারাপ করে ফেলে অন্যের উপর রাগ করা নীচতা।
মেয়েমানুষ কারণে অকারণে অনেক সময় শাশুড়ী বা স্বামীর প্রশ্নের উত্তরে বলে থাকেন, আমি কি জানি? আমি কি করবো? সংসারের কেন্দ্র যখন ঘরের বধূ, তখন তার মুখে এরূপ উত্তর শোভা পায় না। কিছু না জানলেও প্রশ্নের উত্তর খুব মোলায়েম করে। দেওয়া ভালো। মনে রাগ থাকলে অনেক সময় এরূপ উত্তর আসে সত্য, কিন্তু স্বামীর যেরূপ স্ত্রীর অপরাধ মনে করে রাখা অবৈধ, স্ত্রীরও তেমনি স্বামীর অপরাধ মনে করে রাখা অবৈধ। অভদ্র ব্যবহার করাও নারী জীবনের একটি গুরুতর অপরাধ।
অনেক নারী স্বামীর শরীর খারাপ হলে তাকে মোটেই গ্রাহ্য করে না। ভদ্রমহিলা কখনোও এমন করে না, দুর্বল ও রুগ্ন হলে তাকে ঔষধ খেতে উপদেশ দেবে। কোনো আনাড়ী মানুষের ঔষধ স্বামী না খান, তাতে বিপরীত ফল ফলবে। স্বামীর শরীর যাতে ভালো থাকে, সে দিকে সর্বদা দৃষ্টি রাখা উচিত। দুগ্ধ ও ঘি শরীর রুক্ষার প্রধান উপকরণ। বিলাসিতার জন্যে পয়সা ব্যয় না করে যাতে স্বাস্থ্যের জন্যে ভালো খাবারের জন্য পয়সা ব্যয় হয় সেদিকে নজর চাই।
আর একটি কথা–বিলাসের কথা বলতে গিয়ে একটা ভালো কথা মনে পড়ে গেল। বিদেশী বিলাস-দ্রব্য কিনে কিনে আমাদের দেশের লোক ক্রমশ দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। দেশী জিনিস পেলে বিদেশী জিনিস ব্যবহার করবে না। নারীরা যদি প্রতিজ্ঞা করে বলেন, আমরা
বিদেশী দ্রব্য হারাম বলে ত্যাগ করলাম, তাহলে অল্প দিনে আমাদের দেশের লোকের। অবস্থা ভালো হয়। আমাদের ভাই, স্বামী ও পিতার অর্থে বিলাত ও জাপানের লোকেরা এত বাহাদুরী করছে, অথচ আমরা দিন দিন না খেয়ে না পরে ক্ষুধায়, শীতে, পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে মরে যাচ্ছি। বলতে পার, আমরা নিজে তো না খেয়ে মরছি না? আমরা না। মরি আমাদের দেশের ভাই-বোন মরে যাচ্ছে। অন্ন-কাঙ্গাল দেশের ভাই-বোনকে ভিখারী। করে নিজেরা কোর্মা-পোলাও খেয়ে লাভ কী? রাস্তায় মোটর গাড়ি হাকিয়ে বাহাদুরী কি? দেশের শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতির জন্যে নারীকে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। সিল্কের শাড়ী পরে ক্ষুধিত পেটে না থেকে, মোটা কাপড়ে খালি পায়ে ঘি-মাংস খাওয়াই ভালো।
স্বামীর ভালবাসায় অনেক সময় নারীরা দাম্ভিক হয়ে পড়েন। বাড়ির বধূ সকলের ভালবাসার পাত্রী, সুতরাং সকলের সঙ্গে তার সদ্ব্যবহার থাকা চাই। আসলে অহঙ্কার খারাপ জিনিস। লোকে অহঙ্কারীর স্পর্শে আসতে ঘৃণা বোধ করে। সকলের সঙ্গে স্নেহ-মধুর ব্যবহার করা কর্তব্য।
মোটে কথা না বলা ভালো নয়। মাঝে মাঝে লোকের সঙ্গে আলাপ করা উচিত। আবার প্রয়োজনে বাচালতার পরিচয় দেওয়া ভালো নয়। অনেক মেয়ের গরম বলে গায়ে জামা দেবার অভ্যাস নাই.। স্বামী ছাড়া অন্য কারো সামনে খালি গা হয়ে না বেরোনো উচিত। অন্তঃপুর ছাড়া মেয়েদের সব সময় শরীরে জামা ব্লাউজ থাকা দরকার।
মাঝে মাঝে পাড়ার মেয়েদের ডেকে যদি ভালো কথার আলোচনা করা যায়, তাহলে তাদের বড়ই উপকার করা হয়। মেয়েমানুষ অমানুষতার গভীরে আঁধারে পড়ে আছে। মানুষ কি এত ছোট হতে পারে, তা ভেবে ঠিক পাই নে। অবরোধ এর এক গুরুতর কারণ হতে পারে।
রাত্রিতে ছোট ছোট মেয়েদের একটু একটু যদি পড়াতে পার, চেষ্টা করো। না বুঝে মাথা কুটে কোরান পড়তে পারলেই কাজ হল, এরূপ মনে করা ভুল। ইংরেজি না হোক। বাংলা সাহিত্যের বিলক্ষণ জ্ঞানলাভ করতে হবে, নইলে চরিত্র ও স্বভাবের কোনো উন্নতি হবে না। রুচি মার্জিত হওয়াও অসম্ভব। বর্তমান শিক্ষা ও সভ্যতার সঙ্গে যোগ না রাখলে মেয়েদের ভালো বিয়ে হওয়া সুকঠিন। বধূর শিক্ষা চরিত্র ও মানের উন্নতির উপর ভবিষ্যৎ বংশের উন্নতি নির্ভর করে। অশিক্ষিতা, অমার্জিতা হৃদয়, চরিত্র ও মানের উন্নতির উপর ভবিষ্যৎ বংশের উন্নতি নির্ভর করে। অশিক্ষিতা, অমার্জিতা হৃদয়, নীচ প্রকৃতির মেয়ের ছেলে কখনও বড় হয় না। অশিক্ষিত মাতৃদলের জন্য আমাদের পুরুষ সমাজের জীবন মিথ্যা ও ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। নারীর শক্তিতে জাতি অল্প সময় মহা জাতিতে পরিণত হয়।
বিশেষ গুরুতর কারণ না থাকলেও সর্বদা স্বামীর দোষ ধরতে চেষ্টা করো না। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাই অনুরাগের ভিত্তি। কলহ ও দোষ অনুসন্ধান করলে একে অন্যকে ঘৃণা করে।
সংসারে নিরানন্দের ছায়া আসতে দিতে নেই; দুঃখের মধ্যেও আশার কথা বলা উচিত। পরিবারে কেউ কোনো ভুল করছে–করুক না, কিছুই হয় নাই বলে দাঁড়াতে হবে, এতেই জয়ী হওয়া যায়। বসে বসে কাঁদাকাদি করে দরকার নেই। আশা, উৎসাহ ও আনন্দই উন্নতি ও জীবনের মূল।
