এবাদ তাড়াতাড়ি পুরোহিতের পদধূলি লইয়া কহিল–আজ্ঞা করুন! কী করিতে হইবে?
পুরোহিত আশীর্বাদ করিয়া কহিলেন–মিস ফিনির জন্য উপযুক্ত পাত্র হইয়াছে। বৎস, তোমাকে প্রথমত স্নান করিয়া দেবতার পায়ে আপনাকে উৎসর্গ করিতে হইবে। এবাদ ইতস্তত করিতেছিল। সে যে মুসলমান, দেবতার পায়ে সে নিজেকে উৎসর্গ করিবে?
এমন সময় মিস্ ফিনি কহিলেন–প্রয়তম আর দেরি কেন? দূরাগত বাঁশির সুরের ন্যায় এবাদের কানে সে স্বর প্রবেশ করিল। কীসের ধর্ম?
এবাদ তাড়াতাড়ি তাহার আসন্ন প্রিয়তমার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করিরয়া নর্তকীদিগকে ইঙ্গিত করিল।
পার্শ্বের বেদির উপর বসাইয়া অতঃপর তাহারা এবাদকে স্নান করাইল। তিনটা অপ্সরার কোমল হস্তের মধুর স্পর্শে এবাদ ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানের সকল কথা ভূলিয়া গেল।
তারপর বিবাহ। পুরোহিত পবিত্র জল’ এবাদের মাথার উপর ছিটাইয়া দিলেন। অসংখ্য দেবদেবীকে সাক্ষ্য করিয়া মন্ত্র পাঠ করাইয়া পুরোহিত মিস্ ফিনিকে মিস্টার এবাদের সহিত বাঁধিয়া দিলেন।
বাসরঘরে ফুলশয্যা রচনা করিয়া নর্তকীত্রয় দম্পতিযুগলকে দুর্বা দিয়া আশীর্বাদ করিল। অতঃপর তাহারা দেবতার নামে গান করিতে করিতে দরজা বন্ধ করিয়া বাহির হইয়া পড়িল।
.
অষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ
মধুপুরে যাইয়াই রহমানের, শরীর আবার খারাপ হইয়া পড়িল। মি. আবু রহমানের মায়ের কাছে তার করিয়া দিলেন–বন্ধু রহমানের অসুখ বাড়িয়াছে। সত্বর কয়েকজন আপনার লোক লইয়া এখানে আসা চাই।
তিনদিন পরেই মৌলবী এমদাদ আলী সাহেব তাঁহার স্ত্রী ও কন্যা, আবদুর রহমানের মাতা ও ভগ্নি আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
ডাক্তার বলিলেন–কোনো আকস্মিক মানসিক উত্তেজনায় ব্যাধি ফিরিয়া আসিয়াছে। আবদুর রহমানের মাতা দিবারাত্র ক্রন্দন করিতে আরম্ভ করিলেন।
এমদাদ মিঞার কন্যা আমেনা এবং রহমানের ভগ্নি হামিদার উপর সেবার ভার পড়িল। এমদাদ মিঞার স্ত্রী পথ্যের ও আহারের ভার লইলেন। রোগীর তত্ত্বাবধান আবু সাইদ প্রাণপণে করিতে লাগিলেন।
গাড়ির ভিতর কী কাণ্ড হইয়া গিয়াছে তাহা রহমান কাহাকেও জানায় নাই। সেই ঘটনার পর কয়েকদিন রহমান কাহারো সহিত কথা বলে নাই। চিন্তায় তাহার রাত্রিতে ঘুম পর্যন্ত হইত না। আবু সাইদ একবার কারণ জিজ্ঞাসা করায় রহমান বলিয়াছিল, “মন খারাপ হইয়া উঠিয়াছে। কারণ বুঝিতে পারিতেছি না।”
প্রায় একমাস অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। ডাক্তারের ঔষধে এবং তিনটি প্রাণী অক্লান্ত সেবায় রহমান এবার সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করিল।
এই বিপদের সুযোগে আবুর সহিত এমদাদ মিঞার কন্যার যথেষ্ট পরিচয় হইয়া গিয়াছে। মাথার উপর বিপদ লইয়া আমেনার পানে একবারও আবু অন্যভাবে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিতে পারে নাই। যখন সেবার পরিশ্রম করিয়া গেল, তখন সহসা একদিন আমেনার মনে হইল–এই একমাস ধরিয়া সে আবুর সহিত কী আশ্চর্য রকমে মিশিয়াছে। লজ্জায় সঙ্কোচে তাহার মন ও মুখ লাল হইয়া উঠিল। যে দিন সে রহমানের কঠিন ব্যাধির সংবাদ শুনিতে পায় সেদিন তাহার বালি-হৃদয়ে একটা গভীর বেদনা জাগিয়া উঠিয়াছিল। সেইদিন আমেনা বুঝিয়াছিল, আপন ভাই না হইলেও সে রহমানকে কতখানি ভালবাসে ও শ্রদ্ধা করে। রহমানকে সেবা করিবার একটা লিপ্সা তাহার প্রাণের মধ্যে জাগিয়া উঠে। সুতরাং রহমানের মাতার সামান্য অনুরোধেই নিজের মায়ের সহিত বিপুল উৎসাহে সে মধুপুরে চলিয়া আসিয়াছে। কিন্তু আজ যখন সকল বিপদ কাটিয়া গেল, তখন সে তার গত মাসের সমস্ত ঘটনা, সমস্ত কথার সমালোচনা আরম্ভ করিল।
অস্তগমনোমুখ সূর্যের সমালোচনা আরম্ভ করিল।
অন্তগমনোম্মুখ সূর্যের রক্তরাগ তাহার পেলব গণ্ডে পড়িয়া এক অভিনব দৃশ্য সৃষ্টি করিয়াছিল। রাকের থাকের ঈষৎ ঠেস দিয়া সে ইত্ৰময় এটঠফ-এর ছবির দিকে তাকাইয়াছিল। এক বর্ণও সে বুঝিতেছিল না।
মনে মনে সে প্রশ্ন করিল,–“সেদিন এত ঘণ্টা করিয়া কেন এখানে আসিলাম? রহমান ভাইয়ের মা হয়তো মনে করিতেছিল, মিস্টার আবুর করুণা ভিক্ষা করিতেই, এখানে আমার আসিয়াছি? সে মানুষ, আমি মানুষী, তাহার করুণা কেন আমি ভিক্ষা করিতে যাইব? আমি কী একটা মর্যাদা নাই। তাহার পা ধরিয়া বলিতে হইবে কী, দয়া করিয়া আমায় গ্রহণ কর। ছিঃ ছিঃ ছিঃ কি ঘৃণা! মিস্টার আবু কি মনে করিতেছেন? তিনি হয়তো কত ঘৃণার . সহিত ভাবিতেছেন, আমেনা সেবার ভানে আমার করুণা ভিক্ষা করিতে আসিয়াছে।”
তারপর এই দীর্ঘ একমাস কত ভাবে কত রকমে সে আবু সাহেবের সঙ্গে মিশিয়াছে। সেদিন কামরার ভিতর ঈষৎ অন্ধকারে ডাক্তারের ঔষধটা তাড়াতাড়ি ধরিতে গিয়া সে মিস্টার আবুর গায়ে উপর যাইয়া পড়িয়াছিল। তখন তাহার মনে কিছুমাত্র সঙ্কোচ বা লজ্জাবোধ হয় নাই। কিন্তু আজ যখন সেই ভয়ানক দৃশ্যটি তাহার চোখের সামনে আসিয়া উঠিল। তখন সে দারুণ আত্মগ্লানিতে একেবারে মুহ্যমান হইয়া পড়িল। আমেনা ভাবিল–ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এমন করিয়া নিজেকে ছোট করিয়া ফেলিয়াছে! মিস্টার আবু কী মনে করিয়াছিলেন? তিনি হয়তো ভাবিয়াছেন–এই বেহায়া মেয়েটি কেমন করিয়া উঠিতে বসিতে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করিতে ব্যস্ত। আমেনার ধৃষ্টতা অসহ্য।
আমেনার সহসা ইচ্ছা হইল, সে তার দেহটাকে মাথা হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলে। একটা দুর্জয় উত্তেজনায় সে বহিখানি মেঝের উপর ফেলিয়া দিল।
