কচি ॥ খোকা, যা-তা বলবি নে বলে দিচ্ছি। কামালস্যার না থাকলে আমার পড়াশুনো হত না।
দি বেগম খোকা? আবার কোথায় বেরুচ্ছিস এই বরাদুরে?
খোকা ॥ আসছি।
কচি ।। দাদিমা!
দি বেগম ।। উঁ?
কচি ।। তুমি আমাক বলনি সিন্দুকে এত কি আছে! গুপ্তধনের মতো আগলে রেখেছ! ভাগ্যিস খোকা সিন্দুক খুলল, তাই জানতে পারলাম। দাদাজির আব্বা বই লিখতেন, ছোটোদাদাজি ইংরেজি পদ্য পড়তেন! ভাবা যায় না!
দি বেগম ।। তোরা বুজুর্গ আলেমের খানদান, ভাই! কেতাবই তোদের সম্পত্তি। শ্বশুরসাহেব বলতেন, তুচ্ছ মাটির ওপর কেন লোভ মানুষের? বলতেন, মাটি আমার। সয় না। তাই যা পেতেন, দুহাত ভরে বিলিয়ে দিতেন। ইচ্ছে করলে কত জমিজমার মালিক হতে পারতেন। হননি। ওঁর কাছেই শিখেছিলাম মাটির কোনো দাম নেই।
কচি ৷ কিন্তু বড়োদাদাজি? উনি তো সাত পুরুষের সম্পত্তি করে গেছেন সেটা বললো!
দি বেগম ॥ ভাসুরসাহেব বাপের এলেম কিছু পাননি। অন্য ধাতের মানুষ।
কচি ।। তোমাকে ফাঁকি দিয়ে পথে বসিয়ে –আর তোমার নিজের মায়ের পেটের বোনটিও বাবা আচ্ছা!
দি বেগম ॥ ছিঃ কচি! মু বন্ধ্ কর্। বলতে নেই।
.
Whose heart-strings are a lute
স্বাধীনবালা তার বাবা খুনীকে খুন করতে চায় এবং আমার কাছে একটা পিস্তল চাইতে এসেছিল! এই কথাটা যখনই ভেবেছি, বুকের ভেতর কী একটা নড়ে উঠেছে। মেয়েরা কেন আমার কাছে নালিশ জানাতে আসে ভেবে পাইনি। কাল্লু সাতমারের বউ সিতারা বেগমও এক জ্যোৎস্না রাতে অন্য ভাষায় এমন একটা নালিশ তুলেছিল। কী আছে আমার মধ্যে, বুঝি না। যেন তারা ভাবে, এই অর্থহীন উদ্দেশ্যহীন পৃথিবীকে অর্থপুর্ণ আর উদ্দেশ্যময় করার জন্য দু-একটা মানুষ দরকার। তাই হয়তো পিরবুজুর্গ-পয়গম্বর-সাধুসন্ত-মহাত্মা-নেতাদের দরকার হয়। কথাটা পরে খুঁটিয়ে ভেবে দেখেছি। দেবনারায়ণদার এই নয়া আবাদের প্রায় শুরু থেকে আমি আছি। প্রথম-প্রথম স্পষ্ট বুঝতে পারতাম, এখানে যত-সব মানুষ এসে জুটেছে, বা জুটছে, তারা নিছক মাটির লোভে লোভী। ক্রমশ একটা আমূল রদবদল ঘটতে থাকল ওদের মধ্যে। মাটি পাওয়ার পর ওরা যেন এই বেঁচে থাকার — এই জীবনের এবং তার পারিপার্শ্বস্বরূপ এই পৃথিবীর ওপর কোনো একটা অর্থ আরোপ করতে চাইল। বাঁধ আর উঁচু ঢিবির ওপর দু বছরের মধ্যে যেসব বসতি গড়ে উঠল, দেবনারায়ণদা সেগুলোর নাম রাখলেন কেশবপল্লী, শিবনাথপল্লী, দেবেন্দ্রপল্লী, বিজয়পল্লী, আনন্দপল্লী। এসব নাম কেন? জিজ্ঞেস করলে দেবনারায়ণদা আমাকে দু ঘণ্টা অথবা। তিন ঘণ্টা কিংবা চার ঘণ্টা ধরে নিরাকার ব্রহ্মের স্বরূপ, ব্রহ্মজ্ঞান অর্জনের পন্থা, তারপর এই পথে যারা ব্ৰহ্মজ্ঞানের পিদিম হাতে (যেহেতু পৃথিবী ‘অজ্ঞানতার তিমিরে আচ্ছন্ন) হেঁটে চলেছেন, তাঁদের নামগুলো জেনে রাখতে বললেন। শুধু বললেন না, কাগজে সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখেও দিলেও দিলেনঃ “কেশবচন্দ্র সেনের নামে কেশবপল্লী, শিবনাথ শাস্ত্রীর নামে শিবনাথপল্লী, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে দেবেন্দ্রপল্লী, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর নামে বিজয়পল্লী এবং আনন্দমোহন বসুর নামে আনন্দপল্লী। তারপর মিটিমিট হেসে বললেন, কিন্তু তুমি লক্ষ করছ নিশ্চয়, আমাদের আদি পথপ্রদর্শক ও পরম গুরু রাজা রামমোহন রায়ের নামে কোনো পল্লী স্থাপন করি নাই। বিস্মিত হয়ো না। নুপুর রেশমকুঠির নিকট অনাবাদি ত্রিশ বিঘা ডাঙ্গা জমি স্ট্যানলি সায়েবের কাছেই শীঘ্র বন্দোবস্ত নিচ্ছি। ওই স্থানে রামমোহনপল্লীর অঙ্কুরোদগম হবে। পাশেই বাদশাহি সড়ক। কাজেই একটা হাটও স্থাপন করব। এই ব্রহ্মপুরের কিছু সমস্যা আছে। স্থানটি নিম্নভূমি হওয়ায় বন্যার আশঙ্কা প্রবল। পশ্চিমে তিন ক্রোশ দূরে বাদশাহি সড়ক। তুমি জান, সড়ক জাতীয় সম্পদের তুল্য, যেহেতু অধিকসংখ্যক লোকালয় ও মনুষ্যগণের মধ্যে সড়ক যোগসূত্র স্থাপন করে। শফি, যাত্রার জন্য প্রস্তুত হও। দেবনারায়ণদা কথায়-কথায় সংস্কৃত শ্লোক বা ফারসি বয়েৎ আওড়ান। কথার শেষে এই ফার্সি বয়েৎ মৃদুস্বরে আবৃত্তি করলেন:
কিশতি শিকস্ত্ গাঁয়েম অ্যায় বাদ্-এ শুর্তা বরখেজ
বাশদ্কে ওয়জ্ বিন্য়েম দিদার-এ আশনারা…
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ওহে পিরজাদা! কিছু বুঝলে? আস্তে বললাম, আমি ফারসি জানি না। দেবনারায়ণদা উদাত্তস্বরে বললেন, কবি হাফিজ বলছেন? ‘নৌকায় উঠে বসেছি। হে অনুকূল বায়ু! প্রবাহিত হও। সেই প্রিয় বন্ধু দর্শন পেতে পারি যাতে।’
বাদশাহি সড়ক! কথাটা যতবার শুনেছি, বারিচাচাজির সেই কালো ঘোড়াটার হ্রেষা আর খুরের শব্দে আক্রান্ত হয়েছি। ইচ্ছে করেছে, এখনই ছুটে যাই, ফিরে যাই মৌলাহাটে। মায়ের জন্য ছটফট করেছি। আয়মনি খালার জন্য মন কেমন করেছে। অথচ তারপর অনিবার্যভাবে রুকুর কথা মনে পড়েছে। অর্ধমানব অর্ধপশু এক উদ্ভট প্রাণীর কবলে হরিণের মতো কিশোরী। হোক না আমার সহোদর ভাই, ঘৃণা আমাকে তেতো করে ফেলেছে। পালিয়ে যেতে পারেনি রুকু? পারেনি তার মায়ের মতো ঝুলে পড়তে?…এইসব চিন্তার মধ্যে একদিন স্বাধীনবালা এসে বলল, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন, শফিদা?
একটু হেসে বললাম, কিছু না। তুমি—
থামলে যে? কী?
তুমি ইদানীং উপাসনাসভায় যাওয়া ছেড়ে দিয়েছ কেন, স্বাধীন?
