এর মাসখানেক পরে এক বিকেলে বাঁধে গিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছি। দেখি, স্বাধীনবালা আসছে। চোখমুখে পাগলাটে ভাব। শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, সেই স্ট্যানলি এসেছে দেবুজ্যাঠার কাছে। শফিদা, আমাকে তুমি একটা পিস্তল জোগাড় করে দিতে পার? পার না শফিদা? কতজনের সঙ্গে তোমার জানাশোনা। সে কেঁদে ফেলল। তোমার পায়ে পড়ি শফিদা! আমাকে একটা পিস্তল জোগাড় করে দাও। আমি বিকেলের গোলাপি রোদে ওর কান্নাটা হয়তো উপভোগ করছিলাম।…
১৫. চান্দ্রমাস জেলহজ্জের দশম দিবসে কেয়ামত
In Heaven a spirit doth dwell
“Whose heart-strings are a lute”
None sing so wildly well
As the angel Israfel…
‘চান্দ্রমাস জেলহজ্জের দশম দিবসে কেয়ামতের (মহাপ্রলয়) নিদর্শন প্রকাশ পাইবে। সেই দিবস সূর্য উঠিবে না। দুনিয়া অন্ধকার থাকিবে। মানুষসকল ভাবিবে, ইহা কী হইল? তাহারা সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িবে। অতঃপর তাহারা আশ্চর্যান্বিত হইয়া দেখিবে, পশ্চিমদিকে সূর্য উঠিতেছে। তখন তাহারা জানিবে, কেয়ামত নিকটবর্তী কিন্তু হায়! তখন তওবার (ক্ষমাপ্রার্থনা) দুয়ার আল্লাহ বন্ধ করিয়াছেন। তাহারা পবিত্র কেতাব খুলিয়া দেখিতে পাইবে, হরফসকল অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে। আর এই সময় আরবদেশের সাফাপর্বত বিদীর্ণ করিয়া দাব্বাতুল আরদ বাহির হইবে। ইহার মুখের চেহারা মানুষের মতন। কিন্তু গর্দান ঘোড়ার মতন। পা উটের মতন। লেজ গোরুর মতন। পশ্চাদ্দেশ হরিণসদৃশ। শিং দুইটি বলদের তুল্য। আর হস্ত দুইটি বাঁদরের। ইহার এক হস্তে থাকিবে পয়গম্বর সোলেমানের আংটি, অপর হস্তে থাকিবে পয়গম্বর মুসার লাঠি। দাব্বাতুল আরদ অবিশ্বাসীদের ললাটে ওই আংটি দ্বারা কালো চিহ্ন এবং বিশ্বাসীদের ললাটে ওই লাঠি দ্বারা শাদা চিহ্ন দাগিয়া দিবে। তাহার পর জুম্মাবার প্রত্যুষকালে আল্লাহ ফেরেস্তা ইস্রাফিলকে শিঙায় ফুঁ দিতে বলিবেন। প্রথমে অতিক্ষীণ ধ্বনি বাড়িতে থাকিবে! মানুষসকল ভাবিবে, ইহা কিসের শব্দ? ক্রমে ক্রমে ইস্রাফিলের শিঙার ধ্বনি কানে তালা ধরাইবে দিবে। দুনিয়া কাঁপিতে থাকিবে! পর্বতসকলও মাটি পেঁজা তুলার মতন উৎক্ষিপ্ত হইবে। প্রাণিসকল মৃত ও নিশ্চিহ্ন হইবে। সমস্ত নিরাকার শূন্যে পরিণত হইবে। শুধু থাকিবেন আল্লাহ এবং তাঁহার বান্দা ফেরেশতাবৃন্দ। আর আল্লাহ তখন ইস্রাফিলকে দ্বিতীয়বার শিঙায় ফুঁ দিতে বলিবেন। এক্ষণে মৃত সকল প্রাণী, সকল মানুষ ও জিন পুনরায় জীবিত হইবে।’
খোকা ।। দাদিজি, এই গুলতাপ্পি কে ঝেড়েছে বলে তো?
দিলরুখ বেগম ॥ তওবা! আস্তাগফিরুল্লাহ! খোকা, জবান সামলে কথা বল! তুই বুজুর্গ পিরের খানদান!
কচি ॥ খোকা, তুই হাফ-এজুকেটেড। গুলতাপ্পি বলছিস? পৃথিবী বুঝি ধ্বংস হবে না? বিজ্ঞানের বইতে কী লেখা আছে জানিস? আর চারশো কোটি বছর পরে সৌরজগৎ ধ্বংস হবে।
খোকা ॥ কচি, আমাকে জ্ঞান দেবার চেষ্টা করবি নে বলে দিচ্ছি। থাপ্পড় খাবি।
দি বেগম ॥ কাজিয়া করে না ভাই-বোনে। ওই কেতাব আমার শশুরসাহেবের লেখা। হরিণমারার বড়োগাজিসাহেব কলিকাতা থেকে ছেপে এনেছিলেন। দে, সিন্দুকে তুলে রাখি। আর একটা কথা বলি, কক্ষনো নাপাক হাতে সিন্দুক খুলবি নে! দে কেতাবখানা!
কচি ॥ দাদিমা, আমি পড়ব। আমার কাছে থাক। প্লিজ দাদিমা!
খোকা ॥ এই মেয়েপণ্ডিত! তুই জানিস ইস্রাফিল কে? বল্ তো কে সে?
কচি ॥ খোকা, বিদ্যে ফলাবি নে আমার কাছে। ক্লাস নাইনে ফেল করা ছেলের মুখে ‘ইস্রাফিল কে’ এ প্রশ্ন মানায় না।
খোকা ।৷ তুই জানিসই না, ইস্রাফিলকে মুসলমানরা বাইবেল থেকে চুরি করেছে। প্যাটপ্যাট করে তাকাস নে। আমার কাছে জেনে নে। ইস্রাফিল স্বর্গের মিউজিশিয়ান।
কচি ।। বাজে বকিস নে। খোকা ॥ বাজে? দাঁড়া, তোকে ছোটোদাদাজির একটা বই দেখাচ্ছি।
দি বেগম ।। খোকা! সিন্দুক খুলিস নে আর। ও কচি, ওকে বারণ কর।
কচি ।। দাদিমা, একটু চুপ করো না! ওর বিদ্যের দৌড়টা দেখি।
খোকা ।। এই দ্যাখ। ছোটদাদাজি আনডারলাইন করে রেখেছেন।
কচি ।। এ তো ইংরিজি পদ্যের বই! এডগার অ্যালেন পো। কী অবাক। নামকরা কবি বুঝি?
খোকা ॥ ছোটোদাদাজি পণ্ডিত লোক ছিলেন। একগাদা ইংরেজি বই ভরা আছে সিন্দুকে।
দি বেগম। ওই কেতাবগুলো জেহেলখানা (জেল) থেকে ওঁর ফাঁসির পর পাঠিয়ে দিয়েছিল। আমি সিন্দুকে তুলে রেখেছিলাম। যেদিন খবর এল—হা খোদা!
খোকা ॥ আঃ দাদিজি! কান্নাকাটি থামাও। ইংরেজরা অসংখ্য লোককে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। তাদের জন্য কাঁদবার লোক নেই।
কচি ।। আছে রে! শহিদ বলে স্টাচু গড়েছে। মালা দিচ্ছে বার্থডেতে। শুধু ছোটোদাদাজির জন্য কিছু হয় না। হয়তো মুসলমান বলেই হয় না।
খোকা ॥ ভ্যাট! ছোটেদাদাজি আমার ধারণা, ফ্রিডম ফাইর ছিলেন না, বুঝলি কচি? উনি ছিলেন অ্যানারকি। বুঝিস কাদের অ্যানারকি বলে? যারা রাষ্ট্র বলে সরকার বলে কিছু মানে না। যারা বলে মানুষ বর্ন্-ফ্রি।
কচি ।। বুঝেছি। তুই পাঁচুবাবুর পাল্লায় পড়েছিস! খোকা, সাবধান কিন্তু। কামাল স্যার বলছিলেন, লোকটা এখানে এসে জুটেছে কোনো মতলবে। ওকে শিগগির পুলিশে ধরবে।
খোকা ।। তোদের কামালস্যারকে বলবি, প্রি-পার্টিশন পিরিয়ডে তো লিগের লিডার ছিল। এখন ভোল বদলে কংগ্রেস কেন? গিরগিটির বাচ্চা! বহুরূপীর দল গাছেরও খাবে, তলারও কুড়ুবে।
