‘লা এলাহা ইল্লাল্লাহ মহম্মদর রসুলাল্লাহ’
আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নেই, মহম্মদ তাঁর প্রেরিত পুরুষ। আশ্চর্য, আশ্চর্য এবং আশ্চর্য! সে চমৎকার আবৃত্তি করল কান্নাজড়ানো গলায়। বললাম, মারহাবা! শাবাশ! এত সুন্দর তোর লবজ! সে আস্তে বলল, রুকু আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল। আমার মেজবউবিবি? জি হ্যাঁ। মারহাবা! মারহাবা! অ্যাই লেড়কি! তোর নামের মানে কী জানিস? যে আউরত মুখস্ত বলতে পারে। কী মুখস্ত বলতে পারে– আল্লাহর কথা, রসুলের কথা। আর ইকুরাতনন্নেসা! তোর কি মনে পড়ে, আমার সঙ্গে নদীর ধারে তকরার করেছিলি?…জি হ্যাঁ।…এইসময় আলি বখশ হাঁফাতে হাঁফাতে এসে পড়ল। তাকে চাপাস্বরে বললাম, আমার জ্বেন (জিন) মেয়েটাকে ধরে এনে বেঁধে রেখেছে, আলি বখশ! তার হাত থেকে কাপড়টা নিয়ে অন্ধকারে ঘরের ভেতর ছুঁড়ে ফেললাম। দরজা বন্ধ করে জেনদের উদ্দেশে বললাম, ওকে তোমরা কাপড় পরিয়ে দাও। আলি বখশ জড়োসড়ো হয়ে বারান্দায় বসে রইল। কিছুক্ষণ পরে আপনমনে বলল, সবই হুজুরের কেরামতি!
.
আরও একটি ব্যর্থতা
‘হুশিয়ারনামাহ’ কেতাবে যেমতো লিপিবদ্ধ ছিল। ইকরার চোখ দুটি সত্যিই ছিল পিঙ্গলবর্ণ, গ্রামে যাদের ‘কয়রাচোখি’ মেয়ে বলা হত, বেড়ালের মতো চোখ। চঞ্চলও ছিল সে। আর তার ঠোঁটে সত্যিই তিল ছিল। কথা কম বলত। দ্রুত স্থান পরিবর্তন করত। সেরাত্রে হরিণমারা যাবার পথে বেচারা কমজোর আলি বখশকে ধাক্কা মেরে কাঁদরের জলে ফেলে দিয়ে সে পালিয়ে যায়। আলি বখশ হুজুরের ভয়ে একটা গল্প বানিয়েছিল। কাঁদরের কাছে যেতেই একদল কালা জিন তাকে ঘিরে ধরে। তাকে। প্রহার করে। প্রমাণ হিসেবে সে গায়ের ছেঁড়া ফতুয়া এবং কপালে, হাতে ও পায়ে ছড়ে-যাওয়া ক্ষতচিহ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু আগাগোড়া একটি নাটকীয় ঘটনা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং ‘বদুপিরের এই ছোট্ট পরাজয়ের চেয়ে জিনদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সুসাব্যস্ত হয়। তবে বদিউজ্জামানেব জীবনে এও আরেকটি ব্যর্থতা — তাঁর নিজের কাছে। প্রতি সন্ধ্যায় তিনি ব্রাহ্মণী নদীর সেই প্রাচীন সাঁকোব কাছে দাঁড়িয়ে দুঃখে ব্যর্থতায় ক্রোধে অভিমানে ক্ষিপ্ত হতেন। তারপর সাঁকোর পাথরের থামগুলো খুঁড়িয়ে ফেলাব ফতোয়া জারি করেন। পুরনো সাঁকোটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অথচ এবাদতখানায় বসে, অথবা পুকুরপাড়ে নিশুতি রাতে দাঁড়িয়ে বদিউজ্জামান অবিকল সিঁদুরের ছোপমাখা থাম দেখতে-দেখতে এক নাঙ্গা আউরতকে দেখে চোখ বুজে ফেলতেন। বিড়বিড় করে পাঠ করতেন : আল্লাহ! শয়তানের জাদু থেকে আমাকে বাঁচাও। আসলে জীবনের অনিবার্য স্পষ্টতাগুলো নিজেকে উঁচুতে তুলে রাখার দরুন ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে।
১৪. একটি কথোপকথন
কচি, ঘুমোলি?
না একটা কথা ভাবছিলাম! আচ্ছা, দাদিমা?
কীরে?
ছোটোদাদাজি যে বাঘদুটো দেখেছিলেন, তারাই যে তোমার শশুরসাহেবের মাজারে সেলাম করতে আসত, কী করে জানলে?
শুনেছি।
সবই খালি শুনেছ। কিছু দেখনি?
কী করে দেখব বল? হিজরি ১৩১৩ সনে শ্বশুরসাহেব মৌলাহাটে এলেন। সেই থেকে খাঁচায় ঢুকলাম! হিজরি ১৩১৪ সনে আশ্বিন মাসে আমাদের দু বহিনের শাদি হল। খাঁচার দরজায় কুলুপ পড়ল।
দাঁড়াও, পঞ্জিকা দেখে হিসেব করি।
আঃ, আলো জ্বালে না। চোখে লাগে।
হুঁ, এটা হিজরি ১৩৩৩ সন। ইংরিজি ১৯১৩। দাদিমা, বিয়ের সময় তোমার বয়স কত ছিল?
বারো-তেরো বছর হতে পারে। পরের বছর তোর আব্বার জন্ম হল।
ওম্মা! ওই বয়সে বিয়ে, বাচ্চার মা– দাদিমা, তুমি কী বলছ!
সে-আমলে তাই তো হত। তবে জানিস কচি, তোর আব্বার জন্মের খবর গেল শশুরসাহেবের কাছে। খুব জাড় পড়েছিল সেবার আঘুন মাসে। দুখু ফিরে এসে বলল, উনি এবাদতখানায় –মানে এখন যেখানে ওঁর মাজারশরিফ, জিনের মজলিশে আছেন।
ভ্যাট! বাজে গপ্প।
দুখু বলল, জানালার ফাঁক দিয়ে শাদা রোশনি ঠিকরে বেরুচ্ছে। তখন শাশুড়িসাহেব বললেন, নুরুকে খবর দে। এসে বাচ্চার কানে আজান দিক।
নুরু– মানে বড়োদাদাজি?
হুঁ। তো ভাসুরসাহেবও পাশকরা মওলানা। দেওবন্দে পাশ! এসে তোর আব্বার কানে আজান দিলেন। তখন শেষ রাত। আয়মনিখালা কুলকাঠের আগুন জ্বেলে আমার গা সেঁকছে। ধাইবুড়ি লুকিয়ে বিড়ি ফুঁকছে।
দাদিমা, আমার দাদাজি তো ছিলেন। উনি আজান দিলেন না কেন?
ল্যাংড়া বোকাহাবা মানুষ। কষ্টে চলাফেরা করতেন! গলায় আওয়াজ বেরুত না!
আমার দাদাজি তো মেজো?
হুঁ। শশুরসাহেব ইন্তেকাল করার সময় বলে গিয়েছিলেন, সে এই এবাদতখানার মালিক হবে! তারপর যখন মুরিদরা পিরসাহেবের মাজার বানিয়ে দিল, তোর দাদাজি সেখানেই থাকতেন। নজরানাটা সেলামিটা যা পড়ত, আদায় করতেন। বিঘে দশেক ভুই ছিল। তারও ফসল পেতাম আমরা। মায়ের সম্পত্তি এক ছটাক আমি নিইনি।
কেন নাওনি,….ও দাদিমা! বলো না। কেন নাওনি?
সেসব কথা চাপা আছে, চাপা থাক। রাত হয়েছে, নিঁদ যা।
দাদিমা, মাজারে নাকি ডাকাতরা খুন করেছিল দাদাজিকে?
আঃ, চুপ কর তো! খুন কেন করবে? কালা জিন গলা টিপে মেরেছিল।
আচ্ছা, দাদিমা, ছোটোদাদাজি নাকি ডাকাত ছিল?
কচি। ঘুমো।
বলো না দাদিমা, ছোটোদাদাজির কথা। জঙ্গলের ভেতর ভাঙা মসজিদ, চাঁদনি। রাত, দুটো বাঘ– তারপর কী হল?
রাত জাগলে সকালে স্কুল যেতে পারবি নে। ঘুমো।
