আলকারিয়াহ্ ত মালকারিয়াহ্….
মহাপ্রলয়! মহাবিপদ! কিসের বিপদ? মহাপ্রলয়ের। শিউরে উঠলাম। বান্দা বদিউজ্জামান। এই দুনিয়ার জন্য তোর এত মায়া, এত স্বপ্ন! প্রচণ্ড হতাশা, তারপর অর্থহীনতা আমাকে পেয়ে বসল। কিন্তু আমি তো কোনদিন মাটির প্রত্যাশী ছিলাম না! আজ কেন মাটির জন্য এ খাহেস? এতিমখানা, মেহমানখানা, এবাদতখানা। কী অদ্ভুত ঘটনার মধ্যে কয়েদি হয়ে গেছি বা হতে চলেছি ক্ৰমে ক্ৰমে। অনিত্য মাটির কথা ভেবেই কি এতদিন মুসাফিরের মতো ঠাঁই বদলে-বদলে ঘুরে বেড়াইনি? অথচ আজ আমি এইসব গাছের মতো শেকড় বিধিয়ে দাঁড়াতে চাইছি। মাটির গুঁড়ো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলাম। একটা কাঠবেড়ালি শুকনো পাতার ভেতর মুখ ঢুকিয়ে কুর-কুর করে কী চিবুচ্ছিল। ওইটুকু আওয়াজে বেচারা দৌড়ে পালিয়ে গেল। তারপর শিরশিরে একটা হাওয়া এল মাঠের দিক থেকে। যেন চারপাশে ফিসফিসিয়ে হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার!….
.
নাঙ্গা আবৃত্তিকারিণী
চোখ বুজে তসবিহ নিয়ে আল্লাহর নাম জপ করছিলাম। তারপর মনে হল আশ্চর্য একটা দৃশ্য আবছা নজর হচ্ছে। একদল ঘোড়সওয়ার, পরনে শাদা পোশাক তাদের, আর ঘোড়াগুলোর গায়ের রঙ নীল, বড় বড় টানা চোখে পুরু সুরমা টানা, আর সওয়ারদের হাতে খোলা তলোয়ার, তারা আমার হুকুমের প্রতীক্ষা করছে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুললাম। এ কিসের নমুদ (নিদর্শন) দেখাচ্ছেন আল্লাহ, ওরা কি আসমান থেকে নেমে আসা জিন, আমার মদতের জন্য দাঁড়িয়ে আছে? এ অবস্থায় তসবিহ নিষ্ফল। লানটিনের দম একটু বাড়িয়ে ‘হুঁশিয়ার নামাহ’ কেতাবটি রেহেলে রেখে পাতা ওলটাতেই দেখি:
‘হুঁশিয়ার পিঙ্গলচক্ষু নারী সম্পর্কে। আর
হুঁশিয়ার ঠোঁটে তার যদি থাকে
তিলচিহ্ন। হুঁশিয়ার যদি সে বারবার
স্থানপরিবর্তন করে। যদি হয় সে
চঞ্চলা মৃদুভাষিণী / উদ্দেশ্যহীন
তার গমনাগমন—’
এই সময়ে বাইরে দূরে আবছা কোলাহল। মুখ তুলে কান পাতলাম। এ রাতে খুব হাওয়া দিচ্ছিল। দুনিয়া জুড়ে একটা অস্থিরতা। গোলমালের আওয়াজ কখনও স্পষ্ট কখনও অস্পষ্ট। তারপর আলি বখশের সাড়া পেলাম বারান্দা থেকে। সে খুকখুক করে কাশছিল। কোনো কথা বলার দরকার হলে তার এই অভ্যাস। বন্ধ দরজার বাইরে তার কাশি শুনে ভেতর থেকে ডাকলাম, আলি বখশ! সে বলল, হজরত! গাঁয়ে ডাকাত পড়েছে মনে হচ্ছে। বললাম, ডর নেই তোমার। চুপচাপ শুয়ে থাকে। সে উত্তেজিতভাবে বলল, হুজুর! আওয়াজ এদিকেই আসছে। হুকুম পেলে আমি একটু দেখে আসি। হুকুম দিলাম। গোলমালটা বাদশাহি সড়কের দিকে এগিয়ে আসছে বটে। আমার ঘরের দেওয়ালে আঁটা গোপন সিন্দুকে টাকাকড়ি সোনাদানা আছে। মুরিদদের (শিষ্য) নজরানা। ওই দিয়ে এতিমখানা মেহমানখানার খরচ চালাব। হুঁশিয়ার থাকা দরকার। প্রেরিত পুরুষ স্বয়ং তলোয়ার ধরে দুশমনদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। ওহোদের লড়াইয়ে তাঁর পবিত্র দাঁতে আঘাত লেগেছিল। মুসলমান সব সময় তো লড়াইয়ের জন্য তৈয়ার। কুতুবগঞ্জের গোমস্তা আবদুল কাদির বহুবছর আগে আমাকে তাঁর মরহুম (প্রয়াত) পিতার একটি ঢাল ও তলোয়ার উপহার দিয়েছিলেন। এবাদতখানার দেওয়ালে তা টাঙিয়ে রেখেছি। একটু ইতস্তত করে দোয়া পাঠ করলাম:
‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাসায়ালুকা ফি নুহুরিহিম অ
নাউজুবিকা মিন শুরুরিহিম…’
দুশমনদের ধ্বংসের দোয়া এটি। ঢাল আর তলোয়ার হাতে নিয়ে দরজা খুলে পা বাড়িয়েছি, কী বা কেউ আমার পাশ দিয়ে ঢুকেই লানটিন বুতিয়ে (নিবিয়ে) দিল। হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। হুঁশ এলে ঘুরে গর্জন করতে গিয়ে গলায় কিছু আটকে গেল। না, আলাহর কসম, উর নয়। অন্ধকার ঘর। বাইরে এতক্ষণে একফালি চাঁদের আবছা হলুদ আলো। গোলমালটা এবার উত্তরে পুকুরের ওপাড়ে জঙ্গলের দিকে শোনা যাচ্ছে। আলি বখশ ফিরে এল। হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, ডাহিন হজরত! ডাহিন! নাঙ্গা হয়ে খোঁড়াপিরের মাজারে মাথায় পিদিম জ্বেলে– বাধা দিয়ে বললাম, ইকরাতন? আলি বখশ বলল, জি হুজুর! আমার শরীরে বিজলির চমক। বললাম, আলি বখশ! পাক কেতাবে লেখা আছে, আল্লাহর ঘর –মসজিদ এবাদতখানা, সবই ‘মসজিদুল হারাম!’ তার মধ্যে বা চারদিকে শও হাত জমিনে মানুষ হোক কী জানোয়ার, তাকে আঘাত নাজায়েজ (অসিদ্ধ)। আলি বখশ কিছু বুঝতে পারল না। শুধু বলল, জি হজরত! তখন বললাম, আলি বখশ! গিয়ে ওদের বলল, আমার হুকুম– সবাই বাড়ি ফিরে নিদ যাক। আর শোনো, তুমি নিজের বাড়ি গিয়ে তোমার বহিনের (আলি বখশের ইবি মারা গেছে। আর নিকাহ করেনি।) একটা শাড়ি নিয়ে এসো। আলি বখশ! কেউ বা তোমার বহিন কিছু শুধোলে বোলো, আমার বারণ আছে জবাব দেওয়া। আর শোনো আলি বখশ। অমি দুজন জ্বেন (জিন) পাঠিয়ে তোমাদের ডাহিনকে পাকড়ে আনছি। তাকে তওবা পাঠ করিয়ে খাঁটি মুসলমান করব। আলি বখশের চোখ চাঁদের আলোয় বিস্ময়ে। ঝলমল করছিল। সে আবার দৌড়ে বেরিয়ে গেল। তখন আমি ঘুরে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়া ‘খান্নাসটিকে আস্তে বললাম, অ্যাই বেশরম লেড়কি! তোর এত সাহস হল কী করে যে তুই আমার ঘরে ঢুকে পড়লি? চাপা ফোঁপানির মধ্যে সে বলল, ওরা আমাকে মেরে ফেলত। একটু হেসে বললাম, তুই ডাহিন আওরত? নাঙ্গা হয়ে মাথায় চেরাগ রেখে নাচ করিছিলি? শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে জবাব এল, আমি থানে ওষুধ তুলতে গিয়েছিলাম…নাঙ্গা হয়ে কেন?….নৈলে ওষুধে ফল হয় না। …বুডুবক খবিস! কিসের ওষুধ তুলে গিয়েছিলি….রুপমারির একটা মেয়ের অসুখ। দুকাঠা চাল দেবে বলেছিল।….হাসতে-হাসতে বললাম, লোককে ঠকিয়ে ধোঁকা দিয়ে রোজগার কবিস! ফুঁপিয়ে উঠে বলল, পোড়। পেটের দায়, পিরসাহেব!…তুই হিন্দু আউরত ছিলিস? এবার না-জবাব হয়ে কাঁদতে শুরু করল। ধমক দিয়ে বললাম, চুপ! নাদান বেশরম কাহেকা। তবু সে কাঁদতে থাকল। একটু ভেবে বললাম, আলি বখশ কাপড় আনতে গেছে। তোকে ওর সঙ্গে হরিণমারায় ছোটোগাজির বাড়ি পাঠিয়ে দেব। সেখানে থাকবি। রাজি?…জি হ্যাঁ।…তোকে তওবা করতে হবে আগে। তুই কলমা জানিস? আবদুল তোকে মুসলমান করেছিল তো? জি হা…বাইরের গোলমাল থেমে গেছে। আলি বখশ আসতে একটু দেরি হবে। বললাম, আমি যা বলছি, বল্। না বললে মুশকিলে পড়বি। বকৰ্মা শাহাদত:
