প্রতি বৎসর শ্রীনাইল ধামে পৌষ মেলা হয়। হাজার হাজার নারী-পুরুষ হৃদয়ে বহুবিধ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এখানে আসে। ধামের বুড়ো নিম গাছের নিচে গড়াগড়ি যায় ধুলো মাখে মুখে বুকে গলায়। এখানে মানত করলে বন্ধ্যা নারী সন্তান পায়, অসুস্থ রুগী সুস্থ হয়, ক্ষেতে ফসল ফলে, ক্ষেত পোকামুক্ত হয় ইত্যাদি। ধামের প্রতিষ্ঠাতা কেশাবাবা সিদ্ধপুরুষ। শ্রীনাইলের দশ বিশ ত্রিশ মাইল পর্যন্ত তাঁর নাম কিংবদন্তির মতো প্রচলিত। পৌষ মেলায় হাজার হাজার লোকজনের উপস্থিতি সে কথাই প্রমাণ করে। তার নামে সোয়া পাঁচ আনার পুটলী ভক্তি ভরে নিম গাছের ডালে বেঁধে রাখলে আকাঙিক্ষত ফল পাওয়া যায়।
নমিতার অসুস্থ স্বামীকে ডাক্তার সারাতে পারেনি। সাধ্যমতো বড় বড় ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল ও। জমি বিক্রি করে টাকা পয়সা খরচ করেছিল, লাভ হয়নি কিছু। হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিয়েছিল ভাল হবে না বলে। বলেছিল, তোমার স্বামী যা যা খেতে চায় তা খাওয়াও গিয়ে। আর কোনো আশা নেই।
এ হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসার পর বুক ভেঙে গিয়েছিল নমিতার। চারদিক অন্ধকার দেখছিল। সামনে বৈধব্যের এক নিরেট শূন্যতা। আর সেই সঙ্গে অভাবের বিরাট হাঁ করা গর্ত। দিশেহারা নমিতার কিছুতেই বিশ্বাস হয়নি যে ধুকে ধুকে মরবে অক্ষয় দাস। ভেঙে না পড়ে মনে মনে শক্তি সঞ্চয় করেছিল কেবল। শেষ পর্যন্ত অনেক আশা নিয়ে শ্রীনাইল ধামে গিয়েছিল। তারপর থেকে আস্তে আস্তে ভালো হতে থাকে অক্ষয় দাস। এখন একদম ভালো। সে সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে নমিতার কণ্ঠ ভক্তিতে গদ্গদ হয়ে ওঠে। অদৃশ্য সে মহান পুরুষের প্রতি প্রণাম জানায়। সেই তাঁর সিথির সিঁদুর হাতের শাঁখা অক্ষয় রেখেছে। আঁচলে চোখের জল মুছে নমিতা বলেছিল, খাওয়াতে পারি না তবু যে ভগবান আমাকে কেননা এতো ছেলেপুলে দেয়।
বুড়ি চমকে নমিতার মুখের দিকে তাকায়।
খাওয়া পরার বড় কষ্ট রে বুড়ি। মানুষটা এতোগুলো পেটের অন্ন জোগাতে পারে। ভগবানকে রাতদিন বলি আর না। তবু আবার এসে গেছে, মাস তিনেক চলছে।
বুড়ি বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকে। নমিতা চলে গেছে অনেকক্ষণ। বুড়ি এসবই ভাবে। সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যায়। নমিতার অক্ষয় দাস বেঁচে গেছে, নমিতা বেঁচে গেছে। ওর মতো গভীর বিশ্বাস না থাকলেও বুড়ি সব কথা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারে না। আশায় আকাঙক্ষায় দুলে ওঠে ওর দুর্বল মন। সত্যি যদি কিছু ঘটে, সত্যি যদি কোনো অলৌকিক শক্তি ওর জীবনের মরুভূমিতে ফুল ফুটিয়ে যায়। নমিতার পরিতৃপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বুড়ি একটা অবলম্বন খুঁজে পায়। নিজের ভিতটা পাকা করে। কিন্তু পরক্ষণেই নমিতার রুগ্ন-দারিদ্র্যে ভরা চেহারার কথা মনে হলে বুক কটু করে ওঠে। খাওয়াতে পারি না তবু যে এত ছেলেপুলে ভগবান কেননা আমাকে দেয়। ওহ্ নমিতারে তোর কষ্ট আমি বুঝি না। আমি তোর মতো হতে চাই নমিতা। শ্রীনাইল ধামের দিকে ছুটে যাওয়ার জন্যে প্রবল তাগিদ অনুভব করে। ছোটবেলা থেকে শুনে আসা সেই পরিচিত প্রবাদটা যেন আজ বুড়ির কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। কিন্তু পৌষ মেলার এখনো আট মাস বাকি। বুড়ি অন্ধকারে খড়ের
তূপের দিকে তাকায়, জমাট অন্ধকার কেমন লেপটে আছে।
ঐ সলীমের মা ঘরে আলো দিসনি কেননা? কি অলুক্ষণে কাজ কারবার যে মেয়েটার। সন্ধ্যা উতরে গেলো তবু সাঁঝের বাতি নেই ঘরে।
বুড়ি পানের বাটা গুটিয়ে নিয়ে উঠে পড়ে। সলীম কলীম দৌড়ে এসে বুড়িকে জড়িয়ে ধরে।
–মা, মাগো–
–আরে ছাড়, ছাড়! অমন করে ধরলে পড়ে যাবো তো?
–ক্ষিধে পেয়েছে মা?
–চল খেতে দিচ্ছি।
বুড়ি ঘরে আলো জ্বালে। কুপির সেই শিখার দিকে তাকিয়ে বুড়ির কেবলই মনে হয়, পৌষ মেলার এখনো আট মাস বাকি। এই দীর্ঘ সময়ের কথা ভেবে ও ক্লান্তি অনুভব করে।
এর মাঝে একদিন দোতরা বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে নীতা বৈরাগিণী এসে উপস্থিত হয়। বুড়ির সঙ্গে ওর অনেকদিনের হৃদ্যতা। গফুরের সঙ্গে বিয়ের আগে থেকেই। নীতাকে দেখলেই ওর পিছু নিত বুড়ি। হাঁটতে হাঁটতে নীতার সঙ্গে অনেক দূরে যেতো। এক সময় নীতা ওকে ভাগিয়ে দিতো।
–ঘরে যা বুড়ি?
–না। আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও।
নীতা হা হা করে হাসতো। বুড়ির মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো, পাগল। ঘরে যা। তোর জন্যে ঘর আছে। আমার তো ঘর নেই রে।
বুড়ি নীতার কথা বুঝতো না। কেন ওর ঘর নেই এ কথাও বুঝতো না। কিন্তু নীতা ওকে গাঁয়ের ঐ শিমুল গাছ পর্যন্ত আসতে দিত, তারপর আর না। ঐ গাছের পর আর কিছুতেই যেতে পারত না বুড়ি। ঐটুকুই ছিল ওর সীমানা। নীতা বৈরাগিণী সোজা রাস্তায় না গিয়ে মেঠো পথে অন্য গায়ে যেত। বুড়ি সেদিকে চেয়ে থাকত। নীতা গাছ গাছালির আড়ালে হারিয়ে যাবার পরও শিমুল গাছের গোড়ায় বসে থাকত ও। ঘরে ফিরতে পারত না।
এখনো এ গাঁয়ে এলে বুড়ির সঙ্গে দেখা না করে ফিরে যায় না নীতা। বয়সের বেশ একটা ব্যবধান সত্ত্বেও বুড়ির সঙ্গে ওর সখিভাব। আজও উঠোনে পা ছড়িয়ে বসে দোতরার টুংটাং বাজনার সঙ্গে নীতার কণ্ঠ এক চমৎকার মিড় রচনা করে–
কঠিন বন্ধুরে–
সুখে না রহিতে দিলা ঘরে
সাজাইয়া পাগলের বেশ
ঘুরাইলে দেশ দেশান্তরে
সুখে না রহিতে দিলা ঘরে–
নীতার উপস্থিতি টের পেয়ে বুড়ি চুলোর তরকারীর হাঁড়ি নামিয়ে হাসিমুখে বেরিয়ে আসে উঠোনে। সজনে গাছের নিচে বসা ক্লান্ত শ্রান্ত ধুলোমাখা নীতার চেহারা দেখে বুড়ি থমকে দাঁড়ায়। নীতাকে কেমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে, তেলহীন রুক্ষ চুলে জটা ধরেছে। বুড়িকে দেখেই বলে, জল দে সই?
