জাহেদা মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না, সে রাতে তার প্যান্টের বোতামগুলো খুলে ফেলেছিল। তখন বাধা দিয়েছিল সে। কিন্তু বাধা মানেনি। কী ভীষণ লজ্জা করছিল তার। মরা একটা মাছের মত পড়েছিল সে। উন্মুক্ত ঊরু হঠাৎ কাঁটা দিয়ে উঠেছিল তার। খুব ঠাণ্ডা লাগছিল। গলার কাছে দম একটা ছিপির মত আটকে ছিল তার। কিন্তু ছেলেটা কিছুই করেনি। একমুহূর্ত পর প্যান্টটা টেনে দিয়ে চুমো খেয়েছে তাকে। তারপর সত্যি কোথায় যেন একটা খড়মের আওয়াজ শোনা গিয়েছিল। কিন্তু লাফ দিয়ে পালায়নি ছেলেটা। চট করে পাশে সটান হয়ে শুয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ পর উঠে গেছে আস্তে আস্তে। বাবর বলল, কী ভাবছ? মনে পড়ছে সব?
জাহেদা অস্পষ্ট করে হাসল।
বাবর জিগ্যেস করল, ছেলেটা কোথায়?
এখন ফাইনাল ইয়ারে আছে।
ঢাকায়?
হ্যাঁ, ঢাকায়।
দেখা হয় না?
না। জানেন? হঠাৎ জাহেদা খুব স্বচ্ছন্দ হবার চেষ্টা করল। ঝরঝরে গলায় বলল, জানেন ও এখন প্রেম করছে ওরই ক্লাশে পড়ে। পাশ করে বেরুলেই বিয়ে হবে। বিলেতে যাবে।
যাক, যারা বিলেতে যেতে চায়, যাক কী বল?
দুজনে একসঙ্গে হেসে উঠল।
জাহেদা বলল, আপনি সিগারেট কিন্তু বেশি খাচ্ছেন!
তাই নাকি? আর খাব না।
সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিল বাবর। পথের ওপর ঘুরতে ঘুরতে পড়ে দ্রুত পেছনে সরে গোল ধিকি ধিকি আগুনটা। বাবর হাসল।
কী, হাসছেন যে?
না, এমনি। হাসি কান্না এসব শরীরের একেকটা অবস্থা। মনের অবস্থা অনুযায়ী লোকে কাঁদে হাসে, আবার কখনো কখনো শরীরের অসংখ্য কোষে হঠাৎ সাড়া জাগে, পেশিগুলো নিজে নিজেই এমন বিন্যাসে হঠাৎ পড়ে যায় যে তখন হাসি হয়, কান্না পায়। বুঝেছি? কিছু ভেবে হাসছি না।
আপনার কথা আমি একটুও বুঝতে পারি না।
বলে জাহেদা সীটে মাথা এলিয়ে চোখ বুঝল। হঠাৎ চোখ খুলে একবার দেখে নিল বাবরকে। না, এখন আর সে হাসছে না। একটু পর বাবর তার দিকে চোখ ফেরাল। তার ভীষণ ইচ্ছে করতে লাগল জাহেদার দুচোখে চুমো দেয় সে। জিভের ডগা দিয়ে তার সাদা দাঁতগুলো মেজে দেয়। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে একটু একটু চোখ পড়ছে। ঠোঁটে খাড়া কয়েকটা ভাঁজ। সোনালি রোমগুলো চিকচিক করছে আলোয়; বাবর জানে যখন চুমো খাবে তখন ঐ রোমগুলো তার শরীরে তুলবে শিহরণ।
গাড়ির গতিবেগ বাড়িয়ে দিল বাবর।
এক সময়ে জাহেদা হঠাৎ চোখ মেলল।
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
হ্যাঁ, অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছ।
এটা কোথায় এলাম?
এই তো বগুড়া। একটু পরেই সাতমাথা আসবে। সাতটা রাস্তা এক জায়গায় এসে মিলেছে। ছেলে ছোঁকড়ারা খুব আড্ডা দেয় এখানে।
এই যে।
সত্যি তো।
গলা বাড়িয়ে জাহেদা সাতমাথার মোড় দেখল। তারপর গাড়ি এগিয়ে গেলে পেছন দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখল।
বাবার বলল, কিছু খেয়ে নেবে?
কত খাব?
কিছুইতো খাওনি?
তবু। আর কিছু খাব না। চমচম খেয়ে পেট ভরে গেছে।
স্যাণ্ডউচ্চ তো ছুঁলেই না। আচ্ছা, একটু চা খাও। চা কিনে নিই। রংপুর এখনো অনেক দূরে। গাড়ি থামিয়ে চায়ের খোঁজ করল বাবর। চা পাওয়া গেল না। বগুড়ায় বিকেলে নাকি চা হয়। না। পাঁচটা বাজবে, তখন চায়ের কেতলি বসবে উনুনে। অনেক খোঁজাখোঁজি করে এক দোকান পাওয়া গেল। সেখান থেকে চা কিনে গাড়িতে বসে খেল ওরা। তারপর বগুড়া ছাড়ল।
ফেরার সময় এখান থেকে রসকদম নিয়ে যাব।
রসকদম কী? জাহেদা জিগ্যেস করল।
এক ধরনের মিষ্টি।
মিষ্টি বুঝি খুব ভালবাসেন আপনি?
হ্যাঁ! এবারে ছাড়তে হবে। বয়স হচ্ছে। ডায়বেটিসের ভয় আছে। এই যে বাঁয়ে মহাস্থানগড়। ফেরার পথে থেমে তোমাকে দেখাব।
জাহেদা হেসে উঠল।
হাসির কী হলো?
আপনি সেই সকাল থেকে সব কিছু ফেরার পথে দেখাবেন বলে রাখছেন। যাওয়ার পথে কিছু দেখার নেই নাকি?
বাবর একটু লজ্জিত হলো। কথাটা একবারও তার মনে হয়নি। কিন্তু হেরে যাবে না সে। মিষ্টি হেসে বলল, যাওয়াটাই বাঁ কম কীসে? এই চলা, তুমি সঙ্গে আছ, কথা বলছি; ঢাকায় থাকলে হতো? নতুন লাগছে না।
তা লাগছে। কিন্তু আমরা দেখতে যাচ্ছি কী তাও তো বললেন না?
অনেক কিছু।
কী, অনেক কিছু?
গেলেই বুঝবে।
বাবর প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাবার প্রাণপণ চেষ্টা করে। কিন্তু কথা খুঁজে পায় না। এ-বকম সচরাচর হয় না তার। নিজের ওপর, বিশ্বের ওপর, সময়ের ওপর ক্ৰোধ হয় তার। কী ক্লান্তিকর অভিনয় তার করতে হচ্ছে। কী দীর্ঘ প্ৰস্তৃতি নিতে হচ্ছে তাকে। মাথার ভেতরে জুলন্ত বর্ণে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে জাহেদার সাথে সঙ্গমরত তার ছবিটা। সে গাড়ির গতি আরো বাড়িয়ে দেয়। জাহেদা কি এখনো বুঝতে পারছে না, সে কী চায় তার কাছে? এতই সে নাবালিকা যে তার সঙ্গে ওভাবে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে এতদূর এসেছে অথচ একবারও মনে হয়নি যা বাবরের মনে মনে আছে?
বাবরের ভেতরে তীব্র ইচ্ছে ফণা তুলে দুলতে লাগল–এখন, এই পথের ওপর আর কিছু না হোক জাহেদাকে একটু স্পর্শ করতে।
ইচ্ছে করে হঠাৎ ব্রেক করল সে। যা চেয়েছিল তাই হলো। জাহেদার মাথা ঠুকে গোল সামনের কাচে। সামলে নিয়েছে মেয়েটা, জোরে লাগেনি।
বাবর বলল, দ্যাখ, দ্যাখ, লোকটাকে পাশ কাটাতে কী হয়ে গেল। বলে সে গাড়ি একেবারে থামিয়ে জাহেদার কপাল, দুহাতে ধরল।
দেখি, কোনখানে লেগেছে। ইস।
জাহেদা হেসে মাথা নাড়ল। না, লাগেনি তেমন।
লেগেছে, শব্দ পেলাম যে।
বলে সে তার কপালে করতাল রাখল। আস্তে আস্তে ঘষে দিতে লাগল। জাহেদা চেষ্টা করল মুক্তি পেতে। কিন্তু পারল না। বাবর বলল, ছেলেমানুষি কর না। একটু বুলিয়ে দেই। নইলে মাথা ধরবে।
