কিন্তু জাহেদা এতসব বুঝবে না। কিম্বা সে বোঝাতে পারবে না। লোকে যতই বলুক, সে সুন্দর করে কথা বলতে পারে, সে নিজে জানে অনেক কথাই সে গুছিয়ে বলতে জানে না, এবং তাদের সংখ্যাই অধিক। তাই আর দশজনের মত সে বলল এবং মিথ্যে হলেও বলল, তোমাকে সত্যি কথা বলতে কী? একজনকে ভালবাসতাম। তার ভালবাসা পাইনি, তাই একা আছি।
জাহেদা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
বাবর প্রীত হলো একটি অনবদ্য মিথ্যা কথা সুন্দর করে বলতে পেরেছে ভেবে।
সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি।
কোনোদিন বলেননি তো?
কোনোদিন তো জিগ্যেস করনি।
কে সে?
বাবর একটু হাসল। এইভাবে অবকাশ নিল দ্বিতীয় মিথ্যে রচনার। বলল, তাকে তুমি চিনবে না। সে এখানে নেই। বিলোতে আছে এখন।
বিলেতে?
হ্যাঁ, ওর স্বামী ওখানে এমব্যাসিতে আছে।
কবে বিয়ে হয়েছে?
সে পনের বছর আগে। তুমি তখন বোধ হয়। টলমল করে হাঁট। কত বয়েস হবে তখন তোমার? তিন? চার।
জাহেদা তার জবাব না দিয়ে বলল, আপনার সঙ্গে আর দেখা হয় না?
হবে কী করে? সে বিলোতে, আমি ঢাকায়। হ্যাঁ, মাঝখানে একবার দেশে এসেছিল। এয়ারপোটো হঠাৎ দেখা। ব্যাগেজের জন্যে অপেক্ষা করছে। আমি কী একটা কাজে ভেতরে ঢুকেছিলাম। বাবর থেমে থেমে বানিয়ে বানিয়ে বলে যেতে লাগল, যেন সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে এখন। দেখি ওর পায়ের কাছে ছোট্ট ফুটফুটে একটা বাচ্চা মেয়ে।
কথা হলো না?
না।
না? প্রায় আর্তনাদ করে উঠল। বলল, কেন?
ও বলল না। আমাকে দেখেও দেখল না। আমি চলে এলাম।
জাহেদা উদাস হয়ে গেল। যেন কল্পনা করতে লাগল এয়ারপোর্টের ছবিটা। বাবর আপনি মনেই হাসল। কত সহজে বিশ্বাস করে ওরা। তার চমৎকার মিথ্যেটাকে সত্যি মনে করে বুকের ভেতর ভাঙ্গন অনুভব করছে মেয়েটা।
জাহেদা অফুট স্বরে জিগ্যেস করল, আচ্ছা, ভালবাসা তবে কী?
মনে মনে বাবর বলল, খুব ভাল কথা তুলেছি। তোমাকে বলব। তাহলে তোমাকে পাওয়া সহজ হবে। পাজামা খুলতে এতটুকু গ্লানি বোধ করবে না তুমি।
কিন্তু সরাসরি তার জবাব না দিয়ে সে একটু খেলা করতে চাইল। বলল, কোনোদিন তুমি ভালবেসেছ জাহেদা?
না।
মুখে বলল, এবং একই সঙ্গে মাথা নাড়ল জাহেদা। পরে হেসে ফেলল। কোলের উপর আসা কামিজটাকে নামিয়ে দিয়ে মসৃণ করতে লাগল ভাজগুলো।
বিশ্বাস করি না।
সত্যি বলছি।
হতেই পারে না। আমাকে বলতে কী? বল?
জাহেদার মুখ থেকে হাসিটা হঠাৎ নিভে গেল। তারপর দপ করেজ্বলে উঠল বাতিটা। মাথাটা কাৎ করে দরোজার হাতল বাঁ হাতে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, কী শুনবেন? সে অনেক আগের কথা।
তবু শুনব। বল তুমি।
না।
বল। ছেলেটা তোমার কাজিন ছিল, না?
কী করে জানলেন?
আমি জানি।
ইস, অন্ধকারে একটা ঢিল লেগে গেছে, বুঝি, বুঝি।
বাবর হাসল। নীরবে অপেক্ষা করতে লাগল। সে জানে, জাহেদা না বলে পারবে না। শুধু একটু সময় নিচ্ছে।
জাহেদা বলল, একদিন, আমার এখনো মনে আছে, ছাদের ওপর আমরা সন্ধেবেলায় হাত ধরাধরি করে বসেছিলাম।
তোমাদের বাসায় থাকত?
না। বেড়াতে এসেছিল। একটা ছাই রংয়ের সুটকেশ ছিল ওর। টিনের ( একদিন ওর জামার পকেট থেকে টুক করে পড়ে গেল চাবিটা। আমি পা দিয়ে চেপে লুকিয়ে রেখেছিলাম। আমার সামনেই সারা ঘর তোলপাড় করল চাবির জন্যে। তারপর হঠাৎ আমার দিকে চোখ পড়তেই আমি আর হাসি রাখতে পারিনি। হেসে ফেলেছি।
খুব চালাক তো?
ভীষণ চালাক ছেলে। আমাকে ও মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখল। চোখে যেন আগুন। আমাকে পুড়িয়ে ফেলবে। ভয়ে আমার বুকও শুকিয়ে এসেছিল। হঠাৎ ও হেসে ফেলল। হাসলে ওকে ভারি সুন্দর দেখাত জানেন?
কল্পনা করছি। বল।
তারপর একটি কথা না বলে আস্তে আস্তে আমার পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসল। একটা হাত রাখল ঠিক যে পায়ের নিচে চাবি ছিল তার ওপর। আমার কী হলো আমি পা সরিয়ে নিতে পারলাম না। ও সরিয়ে দিয়ে চাবিটা নিয়ে মাথা নিচু করে ঘর থেকে দৌড়ে চলে গেল। আর আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম তো থাকলামই।
তারপর?
তারপর আর কিছু নেই। এখন কেন বলছি কে জানে? হঠাৎ মনে পড়ল। আপনি জিগ্যেস করলেন, তাই।
তারপর?
বললাম তো, আর কিছুই নেই। বলে জাহেদা হাসল, ঠিক যেমন ঘুমের মধ্যে বাচ্চার হাসে নিঃশব্দে। সেই হাসিটা অস্পষ্ট হতে হতে যখন মিলিয়ে গেল, তখন চকিতে বাবরের দিকে তাকাল। বাবর বলল, তারপর কী হয়েছিল আমি জানি।
ইস।
সত্যি জানি। বলব?
বলুন তো।
তারপর রাতে তুমি ঘুমিয়েছিলে। হঠাৎ জেগে উঠে দ্যাখ তোমার পায়ে চুমো খাচ্ছে সে। জাহেদার চোখ হঠাৎ উদ্বেগে ভরে উঠল।
তুমি কিছু বলতে পারলে না। তোমার শরীরের ভেতরে আরেকটা শরীর যেন তৈরি হতে লাগল। সে এবার সাহস পেয়ে তোমার গালে চুমো দিল। ছেলেমানুষ তো, তাই জানে না, ঠোঁটে চুমো দিতে হয়।
যাহ।
লাল হয়ে উঠল জাহেদা।
তারপর অনেকক্ষণ শুয়ে থেকে আবার চুমো খেল সে। হঠাৎ একটা কীসের শব্দ হলো কোথাও। লাফ দিয়ে পালিয়ে গোল ঘর থেকে।
কি ঠিক বলিনি?
জবাব দিল না জাহেদা।
মিলে গেছে? বল না। আমার কাছে লজ্জা কী?
না।
কাউকে না কাউকে বলতে হয় বল।
প্ৰায় ঠিক বলেছেন। জাহেদা ফিসফিস করে বলল। কী করে বললেন?
তোমার চেয়ে আমার বয়স যে অনেক বড়। আমার মত বয়স হলে তুমিও বলতে পারতে।
বাবর নিজেও অবাক হয়ে গিয়েছিল আর অনুমানটা সত্যি হয়ে যেতে দেখে। কী করে বলল সে। এ-রকম যোগাযোগ সাধারণত হয় না। হঠাৎ খুশি কাটিয়ে মনে পড়ল তার জাহেদা বলেছে, প্রায় ঠিক বলেছেন। সে জিগ্যেস করল, প্ৰায় ঠিক বলেছি, না? আসলে আর কী হয়েছিল?
