আমি খুশী হয়ে বললুম, ‘টেবিল ল্যাম্পের ওই ঠাণ্ডা আলোতে তোমাকে কি অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছিল কি বলব? মাথার চুল থেকে খালি পায়ের নখের ডগাটি পর্যন্ত কী এক অদ্ভুত রহস্যময় অথচ কী এক অনাবিল শান্তিতে ভরপুর হয়ে বিভাসিত হচ্ছিল, কি করে বোঝাই? আচ্ছা, মোজ-ছাড়া পায়ে তোমার ঠাণ্ডা লাগছে না বাইরে যা শীত!’
অবাক হয়ে বললে, বা রে! তুমি যে বলেছ আমার খালি পা দেখতে ভালো লাগে।
আমি আফসোস করে বললাম, তোমার কতটুকু দেখতে পাই।
চোখ পাকিয়ে বললে, চোপ! দুষ্টুমী করো না। চোখ ঝলসে যাবে। সেমেলে যখন জুপিটারের দেবরূপ দেখতে চেয়েছিলেন তখন তার কি হয়েছিল জান না?
আমি শুধালুম, কি হয়েছিল?
‘আলোতে পোকা পড়লে যে রকম ফট করে ফেটে যায়—তাই হয়েছিল?’ প্রত্যেক মানুষই জুপিটার। তার দেবরূপ উন্মোচন করা বিপজ্জনক। জান, তাকাতে গিয়ে আমারই মাঝে মাঝে ভয় হয়।
ফুরুৎ করে উড়ে গিয়ে কোথা থেকে সিগারেট এনে ঠোঁটে চেপে, আনাড়ি ধরনের দেশলাই ধরিয়ে কাশতে কাশতে আমায় দিয়ে বললে, ভালো না লাগলে ফেলে দিয়ে।
এ দুর্দিনে এ রকম সোনামুখী বুশবোদার মিশরী সিগারেট পেল কোথায়?
বললে, জানেমন্ তিন মাস অন্তর অন্তর তিন তিন হাজার করে মিশর থেকে আনায়। আমাকে ধরার চেষ্টা করেছিল—পারে নি। কিন্তু কেউ খেলে সিগারেটের গন্ধ আমার ভালোই লাগে। ন্যাকরা করে ওয়াক থু বলতে পারি নে।
আমি বললুম, ‘সর্বনাশ! এই সুপার স্পেশাল সিগারেট যিনি খান তাঁর জন্যে তুমি এনেছিলে আমার সেই ওঁচা সিগারেট!’
বললে, আমার বন্ধুর সিগারেট। জানেমন্ দুটো ধরিয়ে একটা আমাকে দিয়ে বললে, এ সিগারেট খেতে তো তোর আপত্তি হবে না।
আমি শঙ্কিত হয়ে শুধালুম, “তুমি কি বলেছিলে?”
‘নির্ভয় বলেছিলুম, “লব সুখতে?”—পোড়ার ঠোঁটো, পোড়ার মুখো, যা খুশী বলতে পার। ওই পোড়ার সিগারেট খেয়ে খেয়ে জানেমন্ তার ঠোঁট মভ্ করে ফেলেছে, দেখ নি?”
আমি শুধালুম, ‘তন্ময় হয়ে কি পড়ছিলে? গুড় বাই টু ফ্রীডম?’
বললে, “সে কি? বরঞ্চ তোমার লীলাখেলা বন্ধ হল। কিন্তু আগে বলি, তোমার নিশ্চয় হাসি পাচ্ছে, একই কনেকে দুদু বার বিয়ে করছ বলে? আমারও পাচ্ছিল। হঠাৎ মনে পড়ল, তোমাকে বলেছিলুম, তুমি দ্বিচারী—তুমি বাস্তবে আমাকে আদর কর, আর স্বপ্নে আরেক জনকে। আল্লাতালা তাই একই শব্নমের সঙ্গে তোমার দু’বার বিয়ে দিয়ে তোমাকে দ্বিচারী বদনাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন। স্বপ্নের শব্নম আর বাস্তবের হিমিকা এক হয়ে গেল। না?’
আমি বললাম, অতি সূক্ষ্ম যুক্তিজাল। কিংবা বলব হৃদয়ের ন্যায় শাস্ত্র-নব্য ‘নব-ন্যায়’। তোমাকে তো বলেছি, হৃদয়ের যুক্তি তর্কশাস্ত্রের বিধি-বিধানের অনুশাসন মানে না। আকাশের জল আর চোখের জল একই যুক্তি কারণে ঝরে না।
আশ্চর্য হয়ে বললে, এ কথাটা তুমি আমাকে কখনো বল নি। এ ভারী নূতন কথা।
আমি বললুম, হবেও বা, কারণ কোনটা তোমাকে বলি আর কোনটা নিজেকে বলি এ দুটোতে আমার আকছারই ঘুলিয়ে যায়।
আমার হাঁটুর উপর চিবুক রেখে শব্নম অনেকক্ষণ ধরে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি আশ্চর্য হয়ে চিন্তা করতে লাগলুম, শব্নম কি গিরিগিটি? সে যেমন দেহের রঙ বদলায় সেই রকম শব্নম চোখের রঙ ঘড়ি ঘড়ি বদলাতে পারে। আলোর ফেরফারে তো এত বেশী অদলবদল হওয়ার কথা নয়। এখন তো দেখছি, শ্যাওলার ঘন সবুজ, অথচ এই অল্প কিছুক্ষণ হল দেখেছি, একেবারে স্বচ্ছ নীল। তবে কি ওর হৃদয়াবেগ, চিন্তাধারার সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখের রঙও বদলায়। স্থির করলুম, লক্ষ্য করে দেখতে হবে।
আমি মাথা নিচু করে, দুহাত দিয়ে তার মাথা তুলে, তার ঠোঁটের উপর ঠোঁট রাখলাম। আমার চোখ দুটি তার চোখের অতি কাছে এসে নিবিড় দৃষ্টিতে তার চোখের অতলে পৌঁছে গিয়েছে। শব্নম অজানা আবেশে চোখ দুটি বন্ধ করলে।
কতক্ষণ চলে গেল কে জানে? বুকের ঘড়ি যেন প্রতি মুহূর্তে প্রহরের ঘণ্টা বাজাচ্ছে। হিমিকাকে এই আমার প্রথম চুম্বন।
অনেকক্ষণ পরে, বোধ হয় একশ বছর পরে, শব্নম তার ঠোঁট যতখানি সামান্যতম সরালে কথা বলা যায় সেটুকু সরিয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে, ‘চুমো খাওয়া তোমাকেই সাজে। সেই নদীপারে প্রথম হার মানার পর আমি মনস্থির করেছিলাম, সব জিনিস আমি দেব, আর তুমি নেবে। চুমো খাব আমি, অলিঙ্গন করব আমি, আর তোমাকে যে তোমার ছেলেমেয়ে দেব আমি, সে তো জানা কথা। এখন দেখছি, তা হয় না। চুমো খাওয়া পুরুষেরই সাজে।’
আমি বললুম। কিন্তু আমি যদি বলি, তুমি যখন আমাকে চুমো খাও তখন আমার কাছে সেটা অনন্তগুণ মধুময় বলে মনে হয়?
‘বাঁচালে’ বলে ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চাপ দিলে নিবিড় আবেশে।
জানি নে, কতক্ষণ, বহুক্ষণ পরে দেখি, শব্নম আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমুচ্ছে। বললে, আমার খোঁপাটা খুলে দাও।
তারপর হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে আবার উড়ে গিয়ে ফিরে এল ফিরোজা রঙের চীনা কাচের একটি ডিকেণ্টার হাতে করে। কাচের ফিকে রঙের ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে কড়া লালের বেগুনী আভা।
বললে, ‘পার্দনে মোয়া, মঁশের-মাপ কর দোস্ত-একদম ভুলে গিয়েছিলুম, তুমি আমার গালের টোল ভরে সিরাজী খেতে চেয়েছিলে।’
আমি রীতিমত ভয় পেয়ে বললুম, করেছ কি? এটা জোগাড় করতে গিয়ে জানাজানি হয় নি?
শব্নম হেসে ফেটে আটখানা। বললে,
তুমি কি ভেবেছ, তুমি মোল্লাবাড়িতে বিয়ে করেছ? রাজা তিমুর থেকে আরম্ভ করে বাবুর, হুমায়ুন-কে শরাব খেয়ে টং হয় নি বল তো? এ বাড়িতে আমার ঠাকুর্দা পর্যন্ত। তাঁর জমানো মাল এখনও নিচে যা আছে তা দিয়ে তিন পুরুষ চলবে।
