ওষ্ঠ পূর্বভাগে, স্ফুরিত নাসারন্ধ্রের নিচে সামান্য, অতি সামান্য একটি নীলাঞ্জন রেখা। ভরা ভাদ্রের গোধূলি বেলা আকাশের বায়ু কোণে পুঞ্জে পুঞ্জে জমে ওঠা শ্যামাম্বুদে আমি দেখেছি এই রঙ। গভীর রহস্যে ভরা এই রঙ। তারই উপরে স্ফুরিত হচ্ছে শব্নমের দুটি ক্ষুদ্র নাসারন্ধ্র। নিচে অতি ক্ষীণ কম্পমান স্ফুরণ লেগেছে তার ওষ্ঠাধরে।
এই প্রথম দেখলুম তার চোখ দুটি। এ দুটি থেকে আগুনের ফুলকি বেরুতে দেখেছি, এ আঁখি দুটিতে আচম্বিতে জল ভরে ফেটে পড়তে দেখেছি, কিন্তু এ চোখ দুটিকে আমি কখনও দেখিনি। আজ এই প্রাচীন দিনের ল্যাম্প আমাদের মিলনে শুভলগ্নে ঠিক সেই আলোটি ফেললে যার দাক্ষিণ্যে আমি শব্নমের চোখ দুটি দেখতে পেলুম।
সবুজ না নীল? নীল না সবুজ? অতৃপ্ত নয়নে আমি সে দুটি আঁখির গভীরতম অতলে অনেক্ষণ ধরে তাকালুম তবু বুঝতে পারলুম না সবুজ না নীল। হাঁ, হাঁ, হঠাৎ মনে পড়ে গেল, হাঁ, দেখেছি বটে এই রঙ আসামের হাফুলঙের কাছে! বড় বড় পাথরের মাঝখানে গিরিপ্রস্রবণ কুণ্ডের স্থির নীলজলের অতলে সবুজ শ্যাওলা। সেদিন ঠিক করতে পারি নি, কি রঙ দেখলুম, নীল না সবুজ—আজ বুঝলুম দুয়ের সংমিশ্রণে এমন এক কম্পলোকের রঙ প্রভাসিত হয় যে, সে রঙ ইহভূমের আর্টিস্টের পেলেটে তো নেই-ই, সৃষ্টিকর্তা যে আকাশে রঙ বেরঙের তুলি বোলান তাতেও নেই।
শব্নমের স্মিত হাস্য ফুরোতে চায় না। কী মধুর হাসি!
কাবুলের মেয়েরা কি বিয়ের রাতে গয়না পরে না। শব্নম পরেছে সামান্য দু’তিনটি। তার সেই বিরাট খোঁপা জড়িয়ে একটি মোতির জাল। ঘনকৃষ্ণ কুন্তলদামের উপর স্তরে স্তরে, পাকে পাকে যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিমানীকণা ঝিলিমিলি মেলা লাগিয়েছে।
দু’কানে দুটি মুক্তোলতা ঝুলছে আর তার শেষ প্রান্তে একটি করে রক্তমণি-রুবি। শুভ্র মরাল কন্ঠের বরফের উপর যেন দু ফোঁটা সদ্যঝরা তাজা রক্ত পড়েছে। এই, এখখুনি বুঝি রক্তের ফোঁটা দুটি ছড়াতে চুবসাতে আরম্ভ করবে।
কাবুলী কুর্তা গলা বন্ধ হয়-বিশেষ করে মেয়েদের। আজ দেখি, গলা অনেকখানি নিচে ঘুরিয়ে কাটা হয়েছে। তাই দেখা যাচ্ছে একটি মোতির মালা। তার শেষ প্রান্তে কি, দেখতে পেলুম না। সেটি জামার ভিতরে। সে কি সৌভাগ্যবান। এই এতদিনে বুঝতে পারলুম কালিদাস কোন দুঃখে বলেছিলেন, ‘হে সৌভাগ্যবান মুক্তা, তুমি একবার মাত্র লৌহশলাকায় বিদ্ধ হয়ে তার পর থেকেই প্রিয়ার বক্ষদেশে বিরাজ করছ; আমি মন্দভাগ্য শতবার বিরহ শলাকায় সছিদ্র হয়েও সেখানে স্থান পাই নে।’
শব্নমের পরনে সার্টিনের শিলওয়ার, কুর্তার রঙ ফিকে লাইলেক, ওড়না কচি কলাপাতা রঙের এবং দুধে আলতা সংমিশ্রণের মত সেই কচি কলাপাতা রঙের সঙ্গে দুধ মেশানো। ইতস্তত রূপালি জরির চুমকি। কলাবনে জোনাকির দেয়ালি।
শব্নমের স্মিতহাস্য অন্তহীন। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি।
হাসতে হাসতে আমাকে গভীর আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে আমার ঠোঁটের উপর তার স্ফুরিতাধরোষ্ঠ চেপে ধরে যেন অতৃপ্ত আবেগে আমার পাণ্ডুর অধরের শেষ রক্তবিন্দু শুষে নিতে লাগল।
আমি মুহ্যমান, কম্প্ৰবক্ষ, বেপথুমান। আমার দৈহিক স্পর্শকাতরতা অস্তমিত! আমার সর্বসত্ত্বা শব্নমে বিলীন।
কোন্ দিগন্তে সে আমায় উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল, কোন তারা নির্ঝরের ছায়াপথে সে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে, কোন্ সপ্তর্ষির তারা জাল ছিন্ন করে কোন লোকে নিয়ে গিয়েছিল জানি নে। অচৈতন্য অবস্থায় দেখি, আমি শব্নমের সিংহাসনে বসে আছি, সে আমার কোলে আড়াআড়ি হয়ে বসে, তার বুক আমার বুকের উপর রেখে, ডান হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে, বাঁ হাত দিয়ে আমার গাল বুলোতে বুলোতে, তার মুখ আমার কানের উপর চেপে ধরে শুধোচ্ছে, খুশী? খুশী? খুশী? খু…..???
আমি আলিঙ্গন ঘনতর করে বলেছিলুম, “আমি তোমার গোলাম। আমাকে তোমার সেবার কাজ দাও।”
শুধিয়ে চলেছে, ‘খুশী? খুশী? খুশী-?
আমি বললুম, ‘আল্লা সাক্ষী, আমি প্রথম যেদিন তোমাকে ভালবেসেছি সেদিন থেকে শত বিরহ-বেদনার পিছনেও খুশী। তুমি জান না, তুমি আছ, এতেই আমি খুশী। প্রথম দিনের প্রথম খুশীর প্রথম নবীনতা বারে বারে ফিরে আসছে।
শব্নম গুণগুণ করে ফরাসীতে গাইলে,
‘করেছি আবিষ্কার।
তোমারে ভালবাসিবার
প্রথম যেমন বেসেছি ভালো, সেই বাসি প্রতিবার।’
নয় কি?
আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই বললে, দাঁড়াও! আলো জ্বালি।
আমার কথায় কান না দিয়ে ঘরের প্রায়ান্ধকার কোণ থেকে নিয়ে এল আঁকশি। তার ডগার ন্যাকরায় কি মাখানো জানি নে। শব্নম আনাড়ি হতে দেশলাই জ্বালিয়ে সেটার কাছে নিতেই দপ করে জ্বলে উঠল। সেই জ্বলন্ত আঁকশি দিয়ে সে ঝাড়বাতির অগুনতি মোমবাতি জ্বালালে। ঘরের দেয়ালে দামী ফরাসী সিল্কের ওয়ালপেপারে সে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিলে।
আমার পায়ের কাছে পাদপীঠে বসে বললে, “তুমি নূতন রাজা এসেছ, তোমাকে বরণ করার জন্য সব কটা আলো জ্বালাতে হয়। যে বেশ পড়েছ, তার জন্য এ আলোর প্রয়োজন। কি সুন্দরই না তোমাকে-”
‘থাক।’
‘চুপ!-দেখাচ্ছে। আমার ওস্তাদের মেয়ের রুচি আছে।’
আমি বললুম, তোমাদের কবি হাফিজই তো বলেছেন।
‘বলে দাও বাতি না জ্বালায় আজি, আমাদের নাহি সীমা,
আজ প্রেয়সীর মুখ চন্দ্রের আনন্দ-পূর্ণিমা’
-(সত্যেন দত্ত)
শব্নম বললে, “ওঃ, হাফিজ। তিনি তো বলেছেন আজ বাতি জ্বালিয়ে না”—অর্থাৎ তার পর মাত্র একদিনের তরে। আমাদের পরব হবে প্রতি রাত্রি। তাই আজ রাত্রের আনুষ্ঠানিক আলো মাত্র একবারের তরে জ্বালিয়ে দিলুম। ভয় করো না, তাও নিবিয়ে দিচ্ছি এখখুনি।
